রাতে ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসিকে’ সাদরে ডেকে এনে নিজের ‘চোখের পাতায় বসানোর’ জন্য মানুষ নানা চেষ্টা-তদবির করেন। শোওয়ার আগে কেউ গরম পানিতে গোসল করেন। কেউবা করেন যোগ ব্যায়াম। কেউ আবার উষ্ণ বা কুসুম কুসুম গরম এক কাপ দুধ খেয়ে নেন। নিদ্রার রাতভর সাধনায় সফল হতে দুধ খেয়ে নেওয়ার চল অনেক পুরানো। হয়তো ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি’ ছড়ার চেয়েও পুরানো এ রেওয়াজ। এবারে বলুন তো সত্যিই কী রাতে শোওয়ার আগে এক কাপ দুধ খেলে ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ নেমে আসে চোখে? বিজ্ঞান কি বলে?
এমন প্রশ্নের একটামাত্র জবাব নেই। আমরা অনেকেই জানি, আমিষের ভিত্তি অ্যামিনো এসিড। দুধে রয়েছে কয়েক পদের অ্যামিনো এসিড। এ সব অ্যামিনো এসিড হয়তো নানাভাবে ঘুম ডেকে আনে। এছাড়া, রাতে শোওয়ার আগে এক কাপ দুধ খাওয়ার সাথে অনেক সময়ই জড়িয়ে আছে মায়ের স্নেহউথলে পড়া হাসিমাখা মুখের মিষ্টি স্মৃতি। স্মৃতির এই স্নিগ্ধ পরশে মনে নেমে আসে প্রশান্তি। শেষ অবধি, এই প্রশান্ত চিত্তই সেই ছড়ায় বর্ণিত ঘুমের ‘খালামণি ফুফুমণি’দের সাদরে ডেকে এনে খুকুমণির নয় বরং নিজের চোখেই রাতভর বসে থাকার আসন যত্ন করে পেতে দেয়। ঘুম নিয়ে মতামত দিতে গিয়ে এমন কথাই বলেন ঘুম বিশেষজ্ঞরা। হ্যাঁ, লাইভ সায়েন্সের এক নিবন্ধে মুক্ত (ফ্রিল্যান্স) সাংবাদিক জ্যাকলিন ওয়ান বিষয়টি নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেন।
এক কাপ গরম দুধের এই প্রশান্তিদায়ক গুণটির কথা বলেন মার্কিন ঘুম বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট এবং “গুড নাইট স্লিপ: দ্যা স্লিপ ডক্টরস 4 উইক প্রোগ্রাম টু বেটার স্লিপ অ্যান্ড বেটার হেলথ” এর লেখক মাইকেল ব্রেউস।
দুধের ঘুম পাড়ানি উপাদান :
দুধের আণবিক পর্যায়ে তাকালে দেখতে পাবো, এতে রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড ট্রিপটোফ্যান। নিদ্রায় সহায়তা করাই এই অ্যামিনো অ্যাসিডের অন্যতম ধর্ম। ট্রিপটোফ্যান অপরিহার্য অ্যামিনো এসিড হিসেবে বিবেচিত হলেও তা নিজে তৈরি করতে পারে না শরীর। তা হলে এটি কোথা থেকে পায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন বলছে, এর জন্য শরীরকে খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। দুধ, ডিম, মাছ, সয়া বা চিনাবাদামের মতো খাবার খেলে শরীর পেয়ে যায় তার প্রয়োজনীয় ট্রিপটোফ্যান। অন্যান্য খাদ্য-উপাদানের মতোই ট্রিপটোফ্যান গ্রহণ করতেই শরীর তৎপর হয়ে ওঠে। অন্যান্য অনেক উপাদানের মতোই একেও মস্তিষ্কের রাসায়নিক সেরোটোনিনে রূপান্তর করে শরীর। পরে এটি রূপ বদল করে হয় নিদ্রাবান্ধব হরমোন মেলাটোনিনে।
‘কারেন্ট নিউরোফার্মাকোলজি’ সাময়িকীর ২০১৭’এ প্রকাশিত এক গবেষণা-সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণত অন্ধকারের প্রতিক্রিয়ায় মস্তিষ্কে মেলাটোনিন সৃষ্টি হয়। দেহের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি হিসেবে পরিচিত প্রাকৃতিক সার্কেডিয়ান ছন্দকে ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত রয়েছে এটি। অন্যদিকে ২০০২ সালের ‘স্লিপ মেডিসিন রিভিউজ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, “সুখী হরমোন” হিসাবে পরিচিত সেরোটোনিন নিদ্রা এবং জাগরণ উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয় থাকে।
খাতা-কলমের হিসেবে ট্রিপটোফ্যান সমৃদ্ধ খাবার-দাবার খেলে বা দুধ পান করলে তাকে শরীর ঘুমদায়ী হরমোনরাজিতে রূপান্তরিত করবে। ফলে, আমাদের ঘুম ঘুম লাগতে পারে। এজন্য ভরপেট ভোজের পর চোখে নেমে আসে তন্দ্রা। তবে বাস্তবে বিষয়টা অতো সহজ নয়। তন্দ্রা সৃষ্টির জন্য পরিমাণে বেশি ট্রিপটোফ্যানের প্রয়োজন পড়বে। এক গ্লাস দুধ বা মাছের কয়েকটা টুকরায় মোটেও মিলবে না সে মাত্রার ট্রিপটোফ্যান ।
উপাদানের পরিমাণ কতোটা হলে চোখে নামে ঘুম?

ঘুম ডেকে আনতে হলে, ২ গ্যালন বা ৭.৬ লিটার দুধ একবারে খেতে হবে। মুশকিল হলো, ওই পরিমাণ দুধ গলধারণ করতে পারলেও হজম করা যাবে না। বরং অসুস্থ হয়ে পড়তে হবে বলেই জানান ব্রেউস। একজন প্রাপ্ত বয়সী ব্যক্তিকে যে পরিমাণ ক্যালোরি খেতে বলা হয় পূর্ণ ননীযুক্ত ৭.৬ লিটার দুধে রয়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি ক্যালোরি। তিনি জানান, অতো দুধ একবারে খেতে পারলে “ঘুম তো আসবেই না বরং বমি বমি লাগতে পারে।”
তবে দুধে অতিমাত্রায় ট্রিপটোফ্যান থাকার পরও আরামের ঘুম বসতে পারবে না ‘চোখের পাতায়।’ দুধে কেবল ট্রিপটোফ্যানই থাকবে না বরং আরো যোগ বা উপাদান রয়েছে। দুধ খাওয়ার পর রক্তের মধ্য দিয়ে এসব উপাদান আমাদের মস্তিষ্কে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবে। দক্ষিণ চীন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য-বিজ্ঞানী লিন ঝেং এবং মোমিং ঝাও বলেন, দুধের মধ্যে যে মাত্রায় ট্রিপটোফ্যান রয়েছে তার ঘুম পাড়ানোর ক্ষমতা সত্যিই বেশ সীমিত। এছাড়াও, দুধে রয়েছে আকারে বড় কিন্তু ধর্মে নিরপেক্ষ অ্যামিনো এসিড লুসিন, আইসোলুসিন, টাইরোসিন, ফেনেলালাইন এবং ভ্যালাইন। (প্রবাহিত রক্তের সব উপাদানই সরাসরি মস্তিষ্কে ঢুকতে পারে না। মস্তিষ্কে ঢোকার জন্য একটি প্রতিবন্ধকতা পার হতে হয়। এটি ব্ল্যাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার নামে পরিচিত।) ট্রিপটোফ্যানকে ব্ল্যাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার পার হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। দুধের অ্যামিনো এসিডে ট্রিপটোফ্যান ব্যাপক মাত্রায় থাকে না। ওই প্রতিবন্ধকতা উতরে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় তাই সহজেই পরাস্ত হতে পারে ট্রিপটোফ্যান।
তা হলে দুধ খেলে ঘুম ঘুম লাগে কেনো? এই দুই গবেষকেরই ভিন্ন আরেক গবেষণায় তার জবাব মিলেছে। ২০২১’এর সেপ্টেম্বর মাসে ‘জার্নাল অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড কেমিস্ট্রি’র অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে এ গবেষণাপত্র। ইঁদুরের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে দুধে রয়েছে কেসিন ট্রিপসিন হাইড্রোলাইজেট সংক্ষেপে সিটিএইচ নামের একটি উপাদান। এটি তন্দ্রালু করতে পারে। এই উপাদানে রয়েছে অ্যামিনো এসিডের শত শত তন্তু বা স্ট্রিং। মানবদেহে চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে সিটিএইচ দ্রুত ঘুম আনতে সহায়তা করে। এতে মান সম্পন্ন ঘুম হয়। এছাড়া, এতে ঘুমে সবচেয়ে কম ব্যাঘাতও ঘটে বলে দেখা গেছে।
এই পেপটাইডগুলো জিএবিএ-এ নামের স্পর্শক বা রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে মস্তিষ্কে স্নায়ু যে সংকেত পাঠায় তা আটকে দেওয়া হয়। এতে, স্নায়ুর পাঠানো কোলাহল থেকে মুক্ত হয় মস্তিষ্ক। ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ দেওয়ার অবকাশ পায় দেহ। সিটিএইচ হজম হওয়ার পর যেসব পেপটাইড বের হয়ে আসে ইঁদুরকে তাও দিয়েছেন গবেষকরা। এমনি একটা পেপটাইড ওয়াইপিভিইপিএফ। এর ঘুমপাড়ানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য বলে দেখা গেছে। এটি দেওয়ার পর দেখা গেছে, দ্রুত নিদ্রার কোলে ঢলে পড়া ইঁদুরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে ২৫ শতাংশ। একইভাবে ঘুমানোর সময়ের পরিমাণও বেড়েছে ৪০০শতাংশ! আমেরিকার কেমিক্যাল সোসাইটির বিবৃতিতে দেওয়া হয়েছে এসব তথ্য।
গরম দুধই খেতে হবে কি?
তবে ‘ঘুম পাড়ানি’ মানসিক বা শারীরবৃত্তীয় প্রভাবকে উসকে দেওয়ার জন্য দুধকে কী উষ্ণ বা কুসুম কুসুম গরমই হতেই হবে? – না, এমন কোনো শর্ত গবেষণা-সমীক্ষায় উঠে আসেনি। ঝেং বলেন, উষ্ণ দুধ খেলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে, পাশাপাশি বাড়ে রক্ত সঞ্চালন। এতে শরীর শিথিল হয়ে আসে বলেও জানান তিনি। ঠাণ্ডা বা গরম যে কোনো দুধ খাওয়া হক না কেনো তাতে ঘুম পাড়ানি উপাদানগুলোর তৎপরতার কোনো কমবেশি হয় না।
আপনি চাইলে রাতে ঘুমের আগে এক কাপ দুধ খেতে পারেন। ঠাণ্ডা না গরম দুধ খাবেন তা আপনার রুচি এবং অভ্যাস অনুযায়ী ঠিক করবেন। পাশাপাশি ভালো ঘুমের জন্য বিছানায় যাওয়ার আগে হালকা ব্যায়াম করতে পারেন। ঘুমানোর আগে ক্যাফিনকে পরিষ্কারভাবে না বলুন। চা বা কফি খাবেন না। শুয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন বা এ রকম যন্ত্র দেখার অভ্যাস থাকলে তা দূর করুন। ঘরে নীল এবং সাদা বাতির বদলে হলুদাভ আলো ব্যবহারের অভ্যাস করুন।
সতর্কতা:
যদি চিকিৎসায় থাকেন এবং খাদ্য-পথ্য নিয়ে নিয়ম মানার ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন চিকিৎসক কিংবা খাদ্যবিদ, তাহলে এ ক্ষেত্রে তার পরামর্শ নেয়াটা জরুরি। ফিচার বা খবর পড়ে কখনোই নিজে কোনো খাদ্য বেছে নেওয়ার ভুল করবেন না। এতে পরবররীতে সমস্যা হতে পারে।
সুখ নিদ্রায় সবার রাত, ভোরের আলোর সজীব বন্দরে ভিড়ুক — আসুন পরস্পরের জন্য একান্ত মনে এ কামনা করি।
[লাইভ সায়েন্স অবলম্বনে]
syed.musareza@gmail.com
