রমজান, ক্বাসিদা ও পুরনো ঢাকা


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: May 17, 2022 16:59:26 | Updated: May 18, 2022 16:02:25


পুরান ঢাকার ক্বাসিদা দল,  ছবি: একুশে টিভি

আল্লাহকা বান্দেকো হাম আয়ো জাগানেকো/হার দিলমে রমজানকি পয়গাম পাওচায়েঙ্গে- সেহরির সময় পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে শোনা যেত এই গান।

-৮ জনের একটি দল হারমোনিয়াম, খোল, ঢোল এর মতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে মহল্লায়-মহল্লায় ঘুরে গাইতেন এমন গান। বেশিরভাগ সময় গানের ভাষা হতো উর্দু বা ফার্সি। রমজানের শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত তিন বা পাঁচ ধাপে এই গান গাওয়ার পালা চলত। এই গানগুলোই পুরান ঢাকার সেই ঐতিহ্যবাহী ক্বাসিদা।

ক্বাসিদা মূলত প্রশংসা বা প্রশস্তিসূচক কবিতা। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের প্রথম পর্যায়েই আরবি সাহিত্যে ক্বাসিদার বিশাল ভান্ডার গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ফারসিউর্দু-তুর্কিসহ অন্যান্য ভাষায়ও প্রসার লাভ করে। ক্বাসিদার মূল অর্থ কবিতার ছন্দে প্রিয়জনদের প্রশংসা করা। ক্বাসিদা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে আরবি 'ক্বাসাদ' থেকে। ক্বাসাদ শব্দের অর্থ পরিপূর্ণ । ক্বাসাদ বিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত হয়েছে ক্বাসিদায়- যা মূলত ফারসি শব্দ।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে যে কবিতায় প্রিয়জনের প্রশংসা করা হয় তাকে ক্বাসিদা বলা হয়। ইবনে কুতাইলা রচিত নবম শতকের বই 'আন-শিরা ওয়া আন শুয়ারা'-তে ক্বাসিদার গঠনতন্ত্র উল্লেখ করা হয়েছে।

এই বই অনুযায়ী ক্বাসিদার রয়েছে তিনটি অংশ।

নসিব - এটি প্রথম অংশ। এখানে স্মৃতিকাতরতা বা অতীতের সুখস্মৃতির রোমন্থনের প্রাধান্য থাকে।

তাখাল্লাস - এটি দ্বিতীয় অংশ। এখানে নিত্য-নৈমিত্তিক জীবনযাত্রার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হয়।

হিজা - তৃতীয় অংশকে বলা হয় হিজা। এই অংশ মূলত সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরতে ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করা হয়।

ক্বাসিদা বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। দর্শনতত্ত্ব প্রভাবিত ,প্রশস্তিমূলক, ভক্তিমূলক, রমজানের ক্বাসিদা ও ঈদের ক্বাসিদা।

একেক ক্বাসিদা গাওয়ার জন্য রয়েছে একেক রকম সুর। শাহেদি, মর্সিয়া, নাত--রাসুল এর মতো বিভিন্ন ভাবধারায় ক্বাসিদা গাওয়া হয়। শাহেদি বা মর্সিয়া ধারা মূলত সুফিদর্শন প্রভাবিত। আবার, নাত--রাসুল হলো রাসুল (সাঃ) প্রতি সম্মান বা প্রশংসাসূচক গান। এছাড়া ভৈরবী, মালকোষ, বাগেশ্রীর মত বিভিন্ন রাগে এর সুর প্রয়োগ করা হয়।

অধিকাংশ ক্বাসিদার সুর সেই সময়ের বিভিন্ন উর্দু ছায়াছবির গান থেকে নেওয়া হতো। ক্বাসিদা মূলত কোরাস সহকারে গাওয়া হয়। যেখানে সাত থেকে আটজন প্রশিক্ষিত গায়ক সম্মিলিতভাবে অংশ নেন। এদের ভেতর সঙ্গীত রচনা, পরিচালনা ও দলীয় সমন্বয়ের কাজ যিনি করে থাকেন, তাকে বলা হয় 'সালার--কাফেলা' বা কাফেলার বাহক। যারা ক্বাসিদার গান রচনা করেন, তাদের বলা হয় ক্বাসেদ বা ক্বাসিদ।

রমজান মাসে মূলত ক্বাসিদা গেয়ে ঘুম ভাঙানো হতো পাড়া-মহল্লার অধিবাসীদের। রমজানের এই ক্বাসিদার আবার রয়েছে পাঁচটি পর্যায়।

এগুলো হলো :

চানরাতি আমাদ - রমজান মাস শুরুর পর রোজার ফজিলত বর্ণনা করে গাওয়া হতো চানরাতি আমাদ৷ মূলত রমজানের চাঁদ দেখা যাওয়ার খুশিতেই শুরু হতো এই ক্বাসিদা গেয়ে উদযাপন।

খোশ আমদিদ- রমজানের শুরু থেকে ১৫ রোজা পর্যন্ত চলত এই ক্বাসিদা। মূলত রোজার মাহাত্ম্য, ত্যাগের কথা বর্ণিত হতো এর মাধ্যমে। পাশাপাশি থাকতো একরকম উৎসবের আমেজ। ইফতারের পর থেকে তারাবিহর আগপর্যন্ত সাধারণত এভাবে ক্বাসিদা গাওয়া হতো।

আলবিদা- ১৬ রোজা থেকে ২৭ রোজা পর্যন্ত ছিলো 'আলবিদা' পর্ব। এর অর্থ 'বিদায়।' এ সময়ের ক্বাসিদায় থাকত বিদায়ের বিষণ্ণ সুর। রমজান মাস চলে যাচ্ছে, আবার আসবে বছরখানেক পর। এই বিদায়ের কথাই বলা হতো গানে গানে।

ঈদ মোবারক - ২৮ রোজা থেকে ঈদের পরদিন পর্যন্ত গাওয়া হতো ঈদ মোবারক ক্বাসিদা। বিভিন্ন জনপ্রিয় ছায়াছবির গানের সুরও নেয়া হতো এখানে। ঈদ উৎসবে মেতে ওঠার অন্যতম বড় উপলক্ষ ছিলো এই ক্বাসিদা।

(পাড়া-মহল্লা এক সময় মাতিয়ে রাখতো ক্বাসিদা, ছবি: রাইজিংবিডি ডট কম)

বিশেষ ক্বাসিদা - এটিও ঈদ উদযাপনেরই অংশ। ঈদ উপলক্ষে আলাদাভাবে কিছু ক্বাসিদা তৈরি হতো- যা ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতো। প্রতিবছর এরকম আলাদা আলাদা বিশেষ ক্বাসিদা হতো ঈদ বিনোদন হিসেবে। এখানেও জনপ্রিয় বিভিন্ন সিনেমার গান বা রেডিওর গানেরই সুর নেয়া হতো।

বিভিন্ন রকম ক্বাসিদার কিছু নমুনা -

রমজানের ক্বাসিদা

আল্লাহ্ কা বান্দেকো হাম আয়ে জাগানে কো/ হার দিল মে রামজান কি পায়গাম পওচায়েঙ্গে হোযায়েগি ইয়ে দুনিয়া রামজান মুবারাককি /আল্লাহ্ কা রাহমাত কি হাম তুফান উঠায়েঙ্গে...

খোশ আমদিদ

খোশ আমদিদ খোশকে লাব পার আবরে রাহমাত খোদ নিসাওয়ার হো গায়া

মারাতাবে মাহে কারামসে দেকতেহি আজ হাম

(রচয়িতা: মুনসেফ, কণ্ঠ: মো. জুম্মন মিয়া)

আলবিদা

অ্যায় মাহে মোবারাক মাহে কারাম

যানেকা আভি সামান না কার

(রচয়িতা: এজাজ, কাওয়ালির সুরে, কণ্ঠ: মো. জুম্মন মিয়া)

সেহরির ক্বাসিদা

আল্লাহকা বান্দেকো হাম আয়ো জাগানেকো

হার দিলমে রামজানকি পায়গাম পাওচায়ঙ্গে

(রচয়িতা: আনোয়ার হোসেন, সুর: 'দার্দ' সিনেমার গানের সুরে, কণ্ঠ: আনোয়ার হোসেন)

ঈদ মোবারক

লুটলো অ্যায় সাযয়োমো মারাকানা ইল্লাল্লাহাকা

ঈদকি দিন হ্যায় পিও পায়মানা ইল্লাল্লাহাকা

(রচয়িতা: মুনসেফ, সুর: কাওয়ালি থেকে সংগৃহিত , কণ্ঠ: মো. জুম্মন মিয়া)

ক্বাসিদার এমন আরো অনেক চমৎকার সব উদাহরণ ছড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার বাঁকে-বাঁকে। সেই উনিশ শতক থেকে এমন অনেকেই ক্বাসিদার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- মুনসেফ, এজাজ, হামিদ--জার, হাফিজ, দেহলভি, জামাল মাশরেকি, তালিব কবির, মুজিব আশরাফি, সারওয়ার, শওকত প্রমুখ।

পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় এখনো স্বল্প পরিসরে ক্বাসিদা গাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এক্ষেত্রে মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে থাকেন শিল্পপতি আনোয়ার হোসেন। তার উদ্যোগে প্রতিবছর ১৯ রমজানে ক্বাসিদার প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। কিংবদন্তি ঐতিহাসিক নাজির হোসেন তার বড় ভাই। ঢাকার ইতিহাস নিয়ে নাজির হোসেনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ। আনোয়ার হোসেন ছোট থেকেই পুরান ঢাকার এদিকে বড় হয়েছেন। সে সময় ছিলো ক্বাসিদার ব্যাপক প্রচলন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘড়ি, এলার্ম বা আরো অনেককিছুর ফলে এখন ঘুম থেকে তোলার জন্য ক্বাসিদার চল কমই দেখা যায়।

আবার রোজার শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত যেসব ক্বাসিদা হতো, সেসবও এখন কমে গেছে, এর একটা বড় কারণ - আগের উর্দু গান বা সিনেমার জায়গায় বলিউড গান চলে আসা। তবে পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছেন ক্বাসিদার।

তবে এর বাইরেও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্বল্পপরিসরে হলেও বিভিন্ন গানের দল ক্বাসিদা গেয়ে থাকে। যেমন- পুরান ঢাকার ভাট মসজিদের সামাদের ক্বাসিদা দল, খাজে দেওয়ান ক্বাসিদা দল, হোসেনি দালানের ক্বাসিদা দল, মিরপুরের ক্বাসিদা দল, বকশিবাজারের সুবিখ্যাত জুম্মন মিয়ার দল ও বংশালের ক্বাসিদা দল।

জুম্মন মিয়ার জন্ম ১৯৩৭-এ। ১০-১১ বছর বয়স থেকেই ক্বাসিদা গাইতেন তিনি। ১৯৪৮ সালে প্রখ্যাত ক্বাসিদা রচয়িতা মো.এজাজ এর কথায় গেয়েছিলেন রমজানের ক্বাসিদা-

গায়া অ্যায় সামোয়া মাহে মোবারক গায়া/

ছা গায়া সারি ফিজা পার নূর বানকার ছা গায়া

গানটির সুর নেয়া হয়েছিল কাওয়ালির সুর থেকে। এর বাইরে 'মুনসেফ' নামে আরেকজন পরিচিত ক্বাসিদা লেখকের গানও তিনি গেয়েছেন। এখন তিনি বয়সের কারণে সক্রিয় নন। তবে তার উত্তরসূরিরা বকশিবাজারে ক্বাসিদার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

সময়ের পরিক্রমায় একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ক্বাসিদার প্রচলন এখন অনেকটা কম৷ তবে এখনো যখন পুরান ঢাকার বাসিন্দারা শোনেন -

আল্লাহ কা বান্দেকো হাম আয়ে জাগানে কো হার দিল মে রামজান কি পায়গাম পওচায়েঙ্গে হো যায়েগি ইয়ে দুনিয়া রামজান মুবারাককি আল্লাহ্ কা রাহমাত কি হাম তুফান উঠায়েঙ্গে...- তখন শৈশব-কৈশোরের নস্টালজিয়া, অলি-গলি পাড়া-মহল্লায় মিশে রমজানের ঘ্রাণ ছড়িয়ে যায় ঢাকার হাওয়া-বাতাসে।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক চতুর্থে বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like