চুল মানেই কালো, কালো রঙের আছে এক সহজাত সৌন্দর্য। বাঙালির কালো কেশে মুগ্ধতা ছড়াবে এমনই তো অনুমেয়।
কিন্তু যখন আসে ফ্যাশনের কথা, তখন বাদ দিয়ে তো দেওয়া যায় না রঙিন চুলের কথা। হাল আমলে চুলে হরেক রকম রং করার ধারা নতুন কিছু না। হাজার বছর আগে থেকেই চুল রাঙানোর চল চলে আসছে। সময়ের সাথে শুধু পাল্টেছে রঙের স্টাইল, নিত্যনতুন ঢঙে রাঙানো হয় সাধের চুল।
আধুনিকতার ছোঁয়াতে চুল কালারের পদ্ধতিতেও এসেছে নানাবিধ পরিবর্তন, দিনকে দিন বাড়ছে বৈচিত্র্য।
হেয়ার কালারিং কখন কিংবা কিভাবে শুরু হলো তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম চুলে কালার করার পদ্ধতি চালু করে।
মেহেদী বা হেনা ব্যবহার করে চুলের কালার পরিবর্তন করাকেই চুলের রঙ পরিবর্তনের প্রথম পন্থা। মিশর ছাড়াও প্রাচীন গ্রিসে এবং রোমান ক্যাথলিকদের মধ্যে চুল কালার করার প্রথা চলমান ছিল। সেখান থেকে ইউরোপে চুল কালার করার ট্রেন্ড মূলত মধ্য যুগে শুরু হয়।
প্রাচীন গ্রিসে গাছের নির্যাস থেকে হেয়ার কালার তৈরি করা হতো। সোনালি কিংবা লালচে-সোনালি রঙ তারা চুলে ব্যবহার করতো। প্রথম স্থায়ী চুলের কালার তৈরি করার কৃতিত্ব অবশ্য রোমানদের। জেট ব্ল্যাক নামে গাঢ় কালো রঙ তারা তৈরি করেছিল।
হেয়ার কালার যে শুধুমাত্র ফ্যাশনের কাজেই ব্যবহার করা হতো এমনটি ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের নারী যৌনকর্মীদের আলাদা করে চেনার সুবিধার্থে চুলে সোনালি রং করা হতো। এছাড়া মধ্য যুগে সেনাসদস্যদের মধ্যে পদবী অনুসারেও চুলে বিভিন্ন রং ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এমনকি সাধারণ মানুষদের ভয় দেখানোর জন্য বিভিন্ন অদ্ভুত হেয়ার কালার ব্যবহারের কথাও অনেকের ই জানা।
কয়েক বছর আগ পর্যন্তও হেয়ার কালারিং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদের করতে দেখা গেলেও এখন অনেক পুরুষও বাহারি রঙে সাজাচ্ছেন তাদের চুল।
আগে মূলত প্রাকৃতিকভাবে হেয়ার কালার তৈরি করা হলেও বর্তমানে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি জমকালো উজ্জ্বল বর্ণের রঙগুলোর কদর তুলনামূলকভাবে বেশি।
ধারণা করা হয়ে থাকে রাণী ক্লিওপেট্রার সময়েই সর্বপ্রথম রাসায়নিক মাধ্যম থেকে হেয়ার কালার তৈরি করা হয়েছিল। ব্যবসায়িকভাবে হেয়ার কালার তৈরি প্রথম ১৯০৭ সালে শুরু হয়। আর ব্যবসায়িক চাহিদা থেকেই রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে নিয়মিত হেয়ার কালার উৎপাদন শুরু করা হয়।
বর্তমানে যেসব হেয়ার কালার বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা হচ্ছে গাঢ়, হাইলাইট ও উজ্জ্বল রঙ। গাঢ় রঙ আকর্ষণীয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে ১৯৮০ কিংবা ১৯৯০ থেকে তুমুল জনপ্রিয়তা পেতে থাকে।
হালের প্রচলিত ধারায় অনেকেই পুরো চুল কালার করেন, আবার অনেকে কিছুটা স্টিক করে। মেহগনি কপার, সোনালি, বারগান্ডি, রেডিশ বাদামির মতো কালারগুলো ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলের কাছে তুমুল জনপ্রিয়।
শখের বসে অনেকে চুল রঙ করলেও হেয়ার কালারের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে অনেকের ই জানা নেই। হেয়ার কালারে এরোমেটিক অ্যামাইন ব্যবহার করা হয় যা ব্লাড ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ হেলসিনকির এক গবেষণায় উঠে এসেছে স্থায়ী হেয়ার কালার ব্যবহার ব্লাড ক্যান্সারের সম্ভাবনা ২০-৩০% বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও স্তন ক্যান্সারের পেছনেও হেয়ার কালার দায়ী বলে জানা গিয়েছে। এসব ছাড়াও হেয়ার কালারে থাকা অ্যামোনিয়া চুলের বাইরের স্তরকে নষ্ট করে দিতে পারে।
মোঃ ওমর ফারুক তপু খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
jafinhasan03@gmail.com