মনের ভাব প্রকাশের ধরন-ধারণা পাল্টাতে পাল্টাতে এখন আমরা বেশিরভাগ সময় যোগাযোগটা সেরে নিই ফোনের পর্দায়।
কেউ কাউকে দেখছে না হয়তো, তবু সবটা কথা বলা হয়ে যাচ্ছে কিবোর্ডে আঙুল বুলিয়ে। শব্দ বা সংখ্যার ব্যবহারই শুধু নয়, এই যোগাযোগে ভূমিকা রাখা ছবিচরিত্রদের অংশটাও বেশ জোরালো। কারো কথায় হাসি পেলো? হাহা ইমো চেপে ধরলেই হবে।
এমনকি সত্যি যদি ঠোঁটের কোণে হাসি উঁকি নাও দেয়, হাসি যে পাচ্ছে এই ইঙ্গিতটি দিতেও সাহায্য করবে ইমোজিটি। একইভাবে রাগ, দুঃখ, আশ্চর্য হওয়া, ভালোবাসা বা পছন্দের প্রকাশ ঘটানোর জন্য কিছু মৌলিক ইমোজি রয়েছে। এর বাইরেও নিয়মিতভাবে যোগ হয়েছে সম্ভাব্য আরো অনেক ইমোজিই।
বিভিন্ন বর্ণ, লিঙ্গ, গোত্র, জাতি ইত্যাদিকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করা হয় ইমোজি কিবোর্ডে। সে চেষ্টা প্রতিদিনই নতুন করে সমৃদ্ধ হচ্ছে। তবে ইমোজির ইতিবৃত্ত ঠিক আজকের লেখার মূল বিষয় নয়। প্রশ্নটা বরং এসব ইমোজির কার্যকারিতা নিয়ে।
আমাদের নিত্যদিনের সামাজিক মাধ্যম যাপন, সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইমোজি ব্যবহারে কীভাবে সহজ হয়েছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজব।
ব্যক্তিজীবনে
সামনাসামনি কথোপকথনের ক্ষেত্রে কথার সাথে বিভিন্ন অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি, বাচনিক যোগাযোগও সমান ভূমিকা রাখে। তবে টেক্সটিং বা লিখিত বার্তার যোগাযোগে এগুলো শুধু শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, এর জন্য প্রয়োজন হয় সমান্তরাল কোনো একটি মাধ্যমের।
এখানেই ইমোজি কাজে লাগে। একটি বাক্য ঠিক কোন মেজাজে বা কোনভাবে বলা হচ্ছে, তা আজকাল নির্ধারণ করে দেয় ইমোজি। অনেকসময় ইমোজি ব্যবহার করলে আলাপের আবহটা হালকা হয়, ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা কম থাকে।
কার্ল স্যাগানের একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যক্তি সাধারণত কোনো আগন্তুকের হাসি বা ভ্রূ কুঁচকানো দেখেই বুঝে যান যে তিনি তার বন্ধু না শত্রু। তবে ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেটি হবার সম্ভাবনা কম, কেননা তাতে লুকোছাপার সুযোগ থেকেই যায়। চোখের ভাষা তো কিছু গ্রাফিক্স দিয়ে বোঝানো যায় না।
তবে হ্যাঁ, মানব অনুভূতি আর অভিব্যক্তির একটা উদ্দীপনা নিশ্চয়ই দেয়া যায় ইমোজির মাধ্যমে। তা অনেকটা হয়ে ওঠে বাস্তবতার অনুলিপি আরেক বাস্তবতার মতোই যাকে আমরা এখন জানি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বলে।
কর্মক্ষেত্রে
লিনপ্লাম ও অ্যাপ অ্যানির একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, ইমোজিসহ পুশ নোটিফিকেশন বার্তা খুলে দেখার সম্ভাবনা ৮৫ ভাগ বেড়ে যায়। ইমেইলের সাবজেক্ট লাইনে মানানসই ইমোজি ব্যবহার করলে তা পড়ার হারও আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পায়।
যেহেতু ইমোজির মাধ্যমে মানুষের আবেগীয় মনোভাব প্রকাশ করা হয়, এর ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বার্তার পেছনের অভিপ্রায়টা সহজে ব্যক্ত করা যায়। যদিও সবধরনের কাজের ক্ষেত্রে ইমোজি ব্যবহার উপযুক্ত হবে না, তবু যেসব জায়গায় সেমি-ফর্মাল যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে, সেখানে ইমোজি ব্যবহার ভালো ফলই বয়ে আনে।
শুধু কাস্টমার বা ক্লায়েন্টদের ক্ষেত্রেই নয়, ইমোজি সাহায্য করে সহকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করে তুলতেও। ডিজিটাল বার্তায় একটি হাইফাইভ ইমোজির মাধ্যমে কাজের আমেজটা আনন্দময় করে তোলা যায়, মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাধ্যমে নিজেদের একতা বোঝানো যায়।
ইমোজি কর্মক্ষেত্রে ঝামেলা এড়াতেও সাহায্য করে। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল গোল্ডম্যান বলেন, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে একটি লিখিত বার্তার ক্ষেত্রে প্রেরক ও গ্রাহকের মধ্যে আবেগের তারতম্য ঘটে। যদি প্রেরক ইতিবাচকভাবে একটি ইমেইল পাঠিয়ে থাকেন, তবে তা গ্রাহকের কাছে নিরপেক্ষ বা মাঝামাঝি অবস্থানের মনে হবে।
আবার যদি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ইমেইলটি পাঠানো হয়, তবে তা গ্রাহকের কাছে নেতিবাচক মনে হবার সম্ভাবনাও ব্যাপক। তাই এক্ষেত্রে বার্তার শেষে একটি ইতিবাচক ইমোজি সহায়ক হতেই পারে, যদি না প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিতে ব্যাঘাত না ঘটে।
দিন দিন আমরা যত এগোচ্ছি, এই এগোনোর সময়টাতে কিছুক্ষেত্রে পিছিয়েও হয়তো যাচ্ছি। আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে এই বাধাটি বেশ উল্লেখযোগ্য। অন্তত ডিজিটাল মাধ্যমে তো বটেই, আর যোগাযোগ যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই মাধ্যমের মুখাপেক্ষী হয়ে উঠছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সেক্ষেত্রে ইমোজি ব্যবহার কিছুটা হলেও বাফার স্টেটের কাজ করতে পারে। কিন্তু কারো ইমোজির অতিরিক্ত ব্যবহার যাতে বার্তার মূল ভাবটিকে লঘু না করে দেয় এবং অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়ে ওঠে, সেক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। নয়তো হিতে বিপরীত হতেই পারে।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com