Loading...

যে দেশে নেই কোনো মশা

| Updated: May 16, 2022 17:22:38


১৯৮০ সালে পাওয়া আইসল্যান্ডের একমাত্র মশা /  ছবি: বিজনেসইনসাইডার ডট কময়    ১৯৮০ সালে পাওয়া আইসল্যান্ডের একমাত্র মশা /  ছবি: বিজনেসইনসাইডার ডট কময়   

মশার ভনভন গানের সুরে ঘুম ভাঙার পর কিংবা মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে মশার অস্তিত্ব না থাকলে কতো ভালো হতো এরকম চিন্তা করেনি এমন কেউ নেই। কেমন আজব প্রাণী যে রক্ত খাওয়ার পর পেট ফুলে নিজেই আবার মারা যায়! মানুষের রক্ত খাওয়ার দরকারটাই বা কী! না খেলে নিজেও বেঁচে থাকতো আবার মানুষও কষ্ট পেতো না।

কিন্তু ছোটো আকৃতির এ মশা যে কি পরিমাণ ভয়ংকর তা নিয়ে অনেকেই চিন্তা করেনা হয়তো। অনেকে এ কথা শোনার পর আবার ভ্রূ কুচকে চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করতে পারে মশা আবার ভয়ংকর প্রাণী কীভাবে হয়? পৃথিবীতে কত শত হিংস্র প্রাণী আছে! সেগুলোকে ছেড়ে মশা কেন ভয়ংকর হবে বাপু! 

কিন্তু অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর মতো নখ কিংবা দাতের আচড় না দিলেও অথবা বিষ ঢেলে না দিলেও মশা প্রতি বছর পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর পুরো বিশ্বজুড়ে প্রায় দশ লক্ষের মতো মানুষ মৃত্যুবরণ করে মশার কামড়ে। ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাস, হলুদ জ্বরসহ অসংখ্য প্রাণঘাতী রোগের জীবাণু বহন করে মশা। মশা যখন কামড় দেয় তখন মানুষের শরীরে এসব জীবাণু প্রবেশ করে। বিশ্ব সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ মশাবাহিত রোগগুলোতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

কিন্তু রক্তপিপাসু এ ভয়ংকর প্রাণী নেই একটি দেশে। অনেকে মনে করতে পারে এ কীভাবে সম্ভব! মশা ছাড়া কোনো দেশ আছে নাকি আবার! 

কিন্তু আইসল্যান্ডে গেলে একটি মশাও পাওয়া যাবে না। আর এটিই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে কোনো মশা নেই। 

কিন্তু আইসল্যান্ডে কি কখনোই মশা ছিলো না? হ্যাঁ অবশ্যই ছিলো। পুরো আস্ত একটা মশা এখনো আইসল্যান্ডের ইন্সটিটিউট অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে একটি অ্যালকোহলের বোতলের মধ্যে সংরক্ষিত আছে। 

কিন্ত মশার মতো প্রাণী কী কেউ এত যত্নে সংরক্ষণ করে নাকি? হরহামেশা আশেপাশে ঘুরাঘুরি করা এ প্রাণী তো চাইলেই পাওয়া যায়। 

তা অন্য যেকোনো দেশের জন্য সত্য হলেও আইসল্যান্ডের জন্য তা না। ইন্সটিটিউট অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে সংরক্ষিত মশাটিই হলো আইসল্যান্ডে পাওয়া একমাত্র মশা। এর আগে পরে কেউ কখনো কোনো মশা দেখতে পেয়েছে বলে জানা যায়নি। 

আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক জিলাসন ১৯৮৬ সালে কেফলাভিক বিমানবন্দরে থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি বিমানে এ মশাটি খুঁজে পান। দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি কেবিন পর্যন্ত দৌড়ে এটার পেছনে গিয়েছিলাম, পরে এটাকে ধরতে পারি। এটিই আইসল্যান্ডে পাওয়া আমার একমাত্র মশা। এরপর আর কোনো মশা আমি খুঁজে পাইনি। অন্য কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি।”

কিন্তু কেনো আইসল্যান্ডে কোনো মশা পাওয়া যায় না। আইসল্যান্ডের আইস কী মশা কে আঁকড়ে ধরে যার কারণে কোনো মশা বাঁচতে পারে না কিংবা বংশবৃদ্ধি করতে পারেনা?

শুনে অনেকে হাসিঠাট্টা করলেও কারণটা কিন্তু খুব বেশি ব্যতিক্রম না।

সাধারণত গ্রীষ্মকালে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে দেখা যায়। এর পেছনে কারণ হলো উষ্ণ আবহাওয়া মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। আইসল্যান্ডে মশা না থাকার অন্যতম একটি কারণ হিসেবে বলা যায় এর ভয়াবহ শীতের কথা। আইসল্যান্ডে অন্যান্য শীতপ্রধান দেশের মতো নিয়ম করে শীত গ্রীষ্ম স্থায়ী হয়না। এখানে বছরে তিনবার ভয়াবহ শীত নেমে আসে। এ শীতের কবলে পড়ে মানুষের বাঁচা দায় হয়ে উঠে আর মশা!

অর্থাৎ, আইসল্যান্ডের অনিয়মিত শীতের কারণে মশার বংশবৃদ্ধির জন্য প্রচন্ড প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মশা ডিম পাড়ার চেষ্টা করলেও সেখানে সে ডিম পরিস্ফুটনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া যায়না। 

আইসল্যান্ডে মশা না থাকার আরেকটি কারণ আছে। মশার বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হয় বদ্ধ জলাশয়ের। বিজ্ঞানীদের মতে, আইসল্যান্ডের জলাশয়গুলোতে রাসায়নিক পদার্থগুলো যে অনুপাতে থাকে তা মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। এছাড়া সেখানের সব জলাশয়েই অনেক স্রোত থাকে। কিন্তু মশার যে জীবনচক্র অর্থাৎ মশার ডিম থেকে লার্ভা, লার্ভা থেকে মূককীট, মূককীট থেকে পরিণত বাচ্চা - এ সময়ের জন্য স্রোতহীন জলাশয়ের প্রয়োজন হয়। 

কিন্তু অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে পার্শ্ববর্তী দেশ গ্রিনল্যান্ডে এত শীত থাকার পরেও কেনো মশা আছে? ছয় মাসের শীতেই তো মশা মরে সাবার হয়ে যাওয়ার কথা! 

কিন্তু ধারণা করা হয়ে থাকে, শীতের সময় মশা শীতনিদ্রায় চলে যায়। ফলে তখন মশা কোনো ডিম পাড়ে না। যখন গ্রীষ্মে বরফ গলতে শুরু করে তখন মশা ডিম পাড়া শুরু করে। আর আইসল্যান্ডের মতো এখানে হঠাৎ শীত নেমে আসে না। এর কারণে মশার বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়না। 

তবে আইসল্যান্ড কী আজীবন মশাবিহীন দেশের স্বীকৃতি ধরে রাখতে পারবে কি না এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট সন্দিহান। আর এ চিন্তার কারণ হলো ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের কারণে বিভিন্ন ক্ষতিকারক গ্রীনহাউস গ্যাস প্রতিনিয়ত পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলছে। আর পৃথিবীর তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে হয়তো আইসল্যান্ডেও মশার প্রজনন শুরু হবে। 

কিন্তু যদি অদূর ভবিষ্যতে কখনো আপনি আইসল্যান্ডে মশা পান তাহলে যেন অধ্যাপক জিলিকে দিতে ভুলবেন না। তার একা মশার জন্য একটা সঙ্গী বড্ড দরকার। 

মোঃ ওমর ফারুক তপু বর্তমানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

jafinhasan03@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic