Loading...

মোয়াজ্জেম হোসেন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

| Updated: August 01, 2021 20:48:28


মোয়াজ্জেম হোসেন মোয়াজ্জেম হোসেন

এইচ এম মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার পুরোধা হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত  তাঁর পিতা মরহুম আইউব আলী চট্টগ্রামের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন আদি বাড়ি ফেনীতে সেখানে খ্যাত হয়েছিলেন আইউব ডেপুটি হিসেবে মা রাজিয়া খাতুন ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী যিনি বাঙালি মুসলমান নারী সমাজের অগ্রগতির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেনরা ছিলেন তিন ভাই এক বোন তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ১৯৬৭ সালে বিএ (সন্মান) ১৯৬৮ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন ছাত্রজীবনে যুক্ত হয়েছিলেন বামধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে করতেন ছাত্র ইউনিয়ন

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের -ি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে মোয়াজ্জেম হোসেন তেমন সময় নেননি ১৯৬৯ সালে করাচিতে হাবিব ব্যাংকে প্রশিক্ষণ গবেষণা বিভাগে শিক্ষানবিস কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭০ সালে ইসলামাবাদে পাকিস্তান অর্থ মন্ত্রণালয়ে গবেষক হিসেবে যোগ দেন দেশ তখন স্বাধীনতার আন্দোলনে উত্তাল তিনি কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে আসেন তখন বিশ্ব অর্থনীতিতেও এক বিরাট যুগান্তকারী ঘটনা ঘটতে চলেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থায় স্বর্ণমান প্রথার বিলুপ্তি হতে চলেছে তার বদলে মার্কিন ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করতে যাচ্ছে সারা দুনিয়া বিষয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন একটি নিবন্ধ লিখেন যা অবজারভারে প্রকাশিত হয় এরপরই অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালাম তাঁকে ডেকে নেন এবং সাংবাদিকতায় যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন স্বাধীনতার পর পাকিস্তান অবজারভার রূপ নেয় বাংলাদেশ অবজারভারে এখানে তিনি রিপোর্টিং করতেন আর বেশি জোর দিতেন অর্থনীতি বিষয়ে পরবর্তীতে দ্য ডেইলি স্টারে অর্থনৈতিক সম্পাদক হিসেব যোগদান করেন এছাড়া কাজ করেছেন নিউ নেশন, বার্তা সংস্থা ইউএনবি, ঢাকা কুরিয়ার টেলিগ্রাফে এই সময়কালে (১৯৭৩- ১৯৯৩) তিনি অনিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় হোসেন খসরু ছদ্মনামে অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষণধর্মী বিভিন্ন কলাম লিখেছেন এই লেখালেখি অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর গভীরতা দক্ষতা বাড়াতে বড় একটি ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁর সতীর্থজনেরা মনে করেন

এদিকে দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদেরা অর্থায়নে ইন্টারন্যাশনাল পাবলিকেশন্স লিমিটেড (আইপিএল) থেকে ১৯৯৩ সালের ১০ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করল দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ব্যবসা অর্থনীতি বিষয়ে বাংলাদেশের প্রথম ইংরেজি দৈনিক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ হলেন প্রধান সম্পাদক আর মোয়াজ্জেম হোসেন সম্পাদক এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে নানা রকম চড়াই-উতরাইর মধ্য দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে তিনি পত্রিকাটি সম্পাদনা করে গেছেন পাশাপাশি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে পেশাগত উৎকর্ষ, বস্তুনিষ্ঠতা, সততা দক্ষতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন  লন্ডন থেকে প্রকাশিত দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমসকে এক প্রকার আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি সম্পাদকীয় নীতি মান প্রতিষ্ঠা প্রয়োগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাংবাদিকতা তথা সম্পাদনার পাশাপাশি পত্রিকা ব্যবস্থাপনা প্রকাশনার গুরু দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন এসবের মাধ্যমে পত্রিকাটিকে একাধারে মানসম্মত সংবাদপত্র ব্যবসা সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন

সিকি শতাব্দীকাল নেহায়েত কম সময় নয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক বয়স মোয়াজ্জেম হোসেন এই সময়কালের একজন ধারক তিনি নিজে একটি প্রতিষ্ঠানও বটে আর তাই সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিজেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ব্যপৃত রেখেছেন ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র ফেলো, প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) পর্ষদ সদস্য, রাষ্ট্র মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট সিকিউিরিটিজ অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানি এবং বেসরকারি বে লিজিং-য়ের স্বতন্ত্র পরিচালক সর্বশেষ সাউথইস্ট ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল মূলত একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা যেমন এসব প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা হওয়ার মাধ্যমে তিনি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্দরমহলের অনেককিছু কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন যা আবার তাঁর সাংবাদিকতাকে উন্নততর করায় অবদান রেখেছে কিন্তু তিনি সবকিছুর ওপর সাংবাদিকতাকেই স্থান দিয়েছেন, সবসময় এর পেশাগত দিকের মান রক্ষায় সচেষ্ট থেকেছেন পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূত্রে ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন দেশ, অশংগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আয়োজিত কর্মশালা সেমিনারে

মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁর প্রিয় কর্মস্থল, পছন্দের পেশা ভালবাসার কাজ সব ফেলে চির বিদায় নেন ২০১৮ সালের আগস্ট বুধবার সন্ধ্যায় রেখে যান তাঁর সহধর্মিনী চাঁদ সুলতানা, মেয়ে ফারহানা হোসেন, ছেলে ফাহিম হোসেন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী অসংখ্যা শুভানুধ্যায়ী আর রেখে গেছেন নৈতিকতা সমুন্নত রেখে পেশাদারি সাংবাদিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত

[ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত শোক সভায় ( আগস্ট, ২০১৮) পঠিত নিবন্ধের ঈষৎ সম্পাদিত রূপ]

Share if you like

Filter By Topic