[বোলসোনারোর প্রিয় বিষয়গুলো দৃঢ় হাতে রুখে দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট। তাই ব্রাজিলের সুপ্রিমকোর্টের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তাঁর অন্তহীন। এছাড়া, ভড়কে দেওয়া এবং কেলেঙ্কারিকে প্রিয় অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগে দ্বিধাহীন তিনি। সম্প্রতি দেশটির রাজনৈতিক চত্বরে এ অস্ত্রের ঝনঝনানি অনেক বেড়েছে। সাথে বিষফোঁড়ের মতো যোগ হয়েছে তাঁর অন্ধ সমর্থকদের ঘনঘন সমাবেশ ও বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে ব্রাজিলের গণতন্ত্রের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না।]
ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে সবচেয়ে বড় হুমকি দিতে পারে দেশটির প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর সুসংঘবন্ধ সমর্থকগোষ্ঠীরা। ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফল বিপক্ষে চলে গেলে এসব সমর্থকগোষ্ঠীকে হয়ত নিয়ন্ত্রণের লাগামে বেঁধে রাখতে পারবেননা খোদ বোলসোনারোও। এমন আশঙ্কার কথা অহরহ শোনাচ্ছেন ব্রাজিলে কোনো কোনো রাজনৈতিক সমালোচক।
নির্বাচনের জয়ের বাতাস যদি লুলার পক্ষে যায় তবে উগ্র এবং অন্ধ এসব সমর্থনগোষ্ঠীর অপতৎপরতা বেড়ে যাবে বহু গুণে। ২০০৩ এবং ২০১০-এ দু’ মেয়াদে ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুলা ডি সিলভা। ফেডারেল পুলিশ অব ব্রাজিল পরিচালিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অপারেশন লাভা জাতো বা অপারেশন কার ওয়াশের বছরব্যাপী তদন্তে ব্রাজিলের জাতীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসে ঘুষের বিনিময়ে ঠিকাদারি পাওয়ার বিশাল কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস হয়ে যায়। খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ এবং নামকরা নির্মাণ কোম্পানিগুলোর যোগসাজশে দুর্নীতির এ বিশাল চক্র দেশটিতে গড়ে উঠেছিল। দুর্নীতিতে লুলার জড়িত থাকার বিষয়ও প্রকাশ হয় এ তদন্তে। আর এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিলে লুলাকে ঘিরে বাড়ে কলহ।
এদিকে, পরিকল্পিতভাবে “ভুয়া খবর” ছড়ানোর বিরুদ্ধে তদন্তে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর এক ছেলেকেও জড়াতে পিছুপা হয়নি সুপ্রিমকোর্ট। সাও পাওলোতে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। এর মাত্র দুদিন পরই নতুন হাঙ্গামায় নামে সরকারপন্থী ট্রাকচালকরা। ব্রাজিলের ১৫ রাজ্যে জাতীয় সরবরাহ পথগুলোকে আটকে দেয় তারা। বোলসোনারো ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশদানকারী সুপ্রিমকোর্টের নেতৃত্বদানকারী বিচারকের অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) দাবি তোলে। প্রেসিডেন্ট আহ্বান জানানোর পরই তারা এ হাঙ্গামা থেকে সরে আসে। প্রেসিডেন্ট তাঁর আহ্বানে বলেন, ট্রাকচালকদের তৎপরতা ব্রাজিলের মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করছে। দুই সংখ্যার মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে ব্রাজিলের মানুষকে দিশেহারা এবং বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
তবে সাওপাওলোর বিক্ষোভে যোগদানকারী কারলা দ্রাগো ঘোষণা করেন যে জনগণ বলতে বোলসোনারোকেই বোঝায়। আর সাও পাওলোর বিক্ষোভ দেখিয়ে দিয়েছে যে জনগণ মোটেও মশকরা করছে না। একই বিক্ষোভে যোগদানকারী ৭৫ বছর বয়সী রোজালিস ফ্লিউরি নিজেকে ‘৬৪’ এর স্নাতক হিসেবে পরিচয় দেন। এ নারী আরো বলেন যে, সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোয়াও গৌলার্টবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, “'৬৪-তে যেভাবে আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি সেভাবে মানুষ যদি রাস্তায় না নামে তাহলে দুর্নীতি শেষ হবে না।”
রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকদের একটি অংশের ভাবনা, বোলসোনারোর নির্বাচনী খেলার কৌশল ২০ শতাংশ সমর্থকদের ঘিরেই চলছে। ঠাসবুনটের বন্ধনে তাদের ধরে রাখার কৌশল নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তারপর প্রত্যাশা অনুযায়ী নির্বাচন যুদ্ধে একাধিক প্রার্থী নামলে এই সমর্থকরাই হবে তার কিস্তিমাতের শক্তি। এদের জোরেই দ্বিতীয় পর্যায়ের শীর্ষ দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে নির্বাচন-বৈতরণী উৎরে যাবেন বোলসোনারো।
মতামত জরিপ বলছে, নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায় তাঁর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হবেন লুলা। বর্তমানে ৪৪ শতাংশ সমর্থনের বদৌলতে তিনি সবার চেয়েই এগিয়ে আছেন। এ অবস্থায় লুলা ২৫ শতাংশ পয়েন্ট পাবেন বলে হালের মতামত জরিপ বলেছে। তারপরও অন্যান্য প্রার্থীর তুলনায় বোলসোনারোর কাছে লুলা বরং তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য বস্তু হয়ে উঠেছেন। লুলার অল্পদিনের কারাবাসসহ বৈচিত্র্যপূর্ণ আইনি ইতিহাস এবং ব্রাজিলের ভোটারদের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয়তাহীন হওয়ায় এমনটা হয়েছে।
বোলসোনারো এবং লুলার মধ্যে নির্বাচনী লড়াই সরাসরি ডান ও বামের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহাওয়া তৈরি করবে।
ডান রাজনীতিবিদ জোয়েস হ্যাসেলম্যান একসময় বোলসোনারোকে সমর্থন করতেন। তবে এখন তিনি হয়ে উঠেছেন বোলসোনারোর সমালোচক। তাঁর কথায়, “বোলসোনারো নিজের এবং লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির মধ্যে বিরাজমান মেরুকরণকে টিকিয়ে রাখার কাজেই ব্যস্ত থাকবেন। কারণ তাঁর ভালো করেই জানা আছে যে ব্রাজিলের বড় একটি অংশের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টিকে নিয়ে ভীতি রয়েছে। দুর্নীতির কারণে ব্রাজিল যে ভোগান্তিতে পড়েছে তার থেকেই এ ভীতি সৃষ্টি হয়েছে।”
ব্রাজিলের গেটুলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক মাতিয়াস স্পেকটর বলেন, “বোলসোনারো ভালো করেই জানেন, ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিবেশে যদি মেরুকরণ এবং উগ্ররূপ না থাকে তবে তাঁর জয়ের আশা খুবই কম।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]
আরো পড়ুন:
‘ঈশ্বরই শুধু প্রেসিডেন্টের পদ থেকে আমাকে সরাতে পারবেন’
