ঘরের মেঝেতে একটি সুন্দর কার্পেট বিছানো থাকলে একদিকে তা যেমন ঘরে শোভা বাড়িয়ে তোলে অন্যদিকে এর উপর দিয়ে হাঁটার সময় এক আরামদায়ক অনুভূতি পাওয়া যায়। আর কার্পেটের কথা বলতে গেলে ইরানের কার্পেটগুলোই সেরা বলা যায়। কারণ বুনন কৌশল এবং কারুকাজের নান্দনিকতায় এর প্রত্যেকটি কার্পেটই অনন্য।
আকার, উপকরণ আর নকশার ধরনের উপর ভিত্তি করে একেকটি কার্পেটের দাম সাধারণত ২৫০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলার হয়। তবে কার্পেটের বয়স এবং দুষ্প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করে এই দাম বেশি হতে পারে। একটি ইরানিয়ান কার্পেট কিনতে হলে কেন এতগুলো টাকা গুণতে হবে? কী এমন বিশেষত্ব রয়েছে?
২০১৩ সালে এক নিলামে ইতিহাসের সর্বোচ্চ দামে একটি ইরানিয়ান কার্পেটবা পার্সিয়ান রাগ(গালিচা) বিক্রি হয় যার দাম ছিল ৩ কোটি ৩৮ লক্ষ মার্কিন ডলার।
ইরানের প্রত্যেকটি কার্পেটই হাতে বোনা হয় যেটা খুবই সময়সাপেক্ষ। চমৎকার কারুশৈলীর এই কার্পেটগুলো বুনতে কয়েক মাস থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সূক্ষ সুতা যেমন সিল্ক ও কটনের সুতা ব্যবহার করা হয় ফলে নকশাগুলো অনেক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং ওজনেও অনেক হালকা হয়। উলের সুতা দিয়ে বুনতে যতটা সময় লাগে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় লাগে এই সিল্ক আর কটনের সুতা দিয়ে বুনতে। আর তাই এই কার্পেটগুলোর দাম অনেক বেশি হয়।
বিভিন্ন রকম সুতার বুনন
সিল্কের উপর সিল্ক – সিল্কের উপর সিল্কের সুতা দিয়ে বোনা হয়। এই ধরনের কার্পেটে অনেক নিখুঁত ও বিস্তারিত নকশা করা থাকে এবং নকশাগুলো সুস্পষ্ট হয়। এই কার্পেটগুলো বুনতে প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়।
কাম সিল্ক – কাম শহরে এই কার্পেটগুলো তৈরি হয়। এই কার্পেট চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে সিল্কের বুননের উপর হাতের আঙুল দিয়ে ঘষা দিলে ঐ জায়গাটা গরম হয়ে উঠবে। একমাত্র আসল সিল্ক দিয়ে বানানো হয় যা ঘর্ষণের ফলে তাপ উৎপাদন করে।
মিশ্র সিল্ক – এই ধরনের কার্পেটের নীচের দিকটায় থাকে উল বা কটন আর উপরের দিকের বুননের কিছু কিছু জায়গায় থাকে সিল্কের সুতা।
উল ও কটন – ইরানের বেশিরভাগ কার্পেট উল ও কটনের মিশেলে তৈরি। এই কার্পেটগুলো খুবই টেকসই হয় এবং এর উপরের নকশাগুলো খুব সূক্ষভাবে করা হয়।
উল – যে কার্পেটগুলো শতভাগ উল দিয়ে বানানো হয় সেগুলো সাধারণত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বুননশিল্পীরা বুনে থাকেন। এগুলোর দাম অপেক্ষাকৃত কম হয় এবং ওজনে অনেক ভারী হয়।
একেকটি কার্পেট শিল্পীর সুন্দর কল্পনার প্রতিচ্ছবি। ইরানের অঞ্চলভেদে এবং কোন সময়ে সেগুলো বানানো হয়েছে তার উপর নির্ভর করে এর বুনন ভিন্ন ভিন্ন হয়।
ইরানের কোম, তাব্রিজ, নেইন, হেরাত, কারমান – এই শহরগুলোতে হাজার বছর পূর্বে কার্পেট বুননের এই চমৎকার শিল্পকর্মের উৎপত্তি হয়েছিল। এই প্রত্যেকটি অঞ্চলের বুননশৈলীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কার্পেটের বাঁধুনি এবং বুননের ধরন দেখে বোঝা যায় এটি কোন এলাকার। তবে প্রতিটি অঞ্চলের বোনা কার্পেটগুলো নকশার দিক দিয়ে অনন্য এবং রীতিমত চোখ ধাঁধানো সুন্দর।
কার্পেটগুলো এক পিস করে বানানো হয় অর্থাৎ কেউ একজন একটি ইরানিয়ান কার্পেট কিনে নিয়ে গেলেন মানে তার কাছে এমন এক কার্পেট রয়েছে যা পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর একটিও নেই। এই স্বতন্ত্রতার কারণে কার্পেটগুলো দুষ্প্রাপ্য এবং অংকের হিসেবে এর মূল্যও দাঁড়ায় অনেক।
বলা হয়, এই ইরানিয়ান কার্পেটগুলোর কমপক্ষে ৩০ বছর পুরনো হলেই এগুলোকে সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখার জিনিস হিসেবে গণ্য করা হয়। আর কমপক্ষে ৮০ বছর পুরনো হলে এগুলো ‘এন্টিক পিস’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
যত্ন সহকারে এবং সাবধানতার সাথে ব্যবহার করলে এই কার্পেটগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে ব্যবহার করা যায়। পণ্যের গুণগত মান আর ব্যবহারের উপর নির্ভর করে ২০ থেকে ২০০ বছর পর্যন্ত একটি ঘরের শোভাবর্ধনকারী অংশ হিসেবে থেকে যেতে পারে। এমন একটি সুন্দর জিনিস ঘরে থাকলে সেই পরিবার তথা সেই বাড়ির মূল্যও বেড়ে যায় অনেক।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
