প্রতিদিনের জীবনে দেখতে সাধারণ বিষয়গুলো অনেকসময় জটিল কোনো রোগের পূর্ভাবাস দিতে পারে, যেমন মুখের ঘা।
আচমকা মুখে কামড় লাগা বা ভিটামিনের অভাবসহ নানা কারণে অনেক সময় মুখে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এর ফলে অস্বস্তি অনুভূতির পাশাপাশি খাবার খাওয়া বা পানি পান কিছুটা কষ্টকর হয়ে পড়ে।
সাধারণত সর্বোচ্চ ২ সপ্তাহের মধ্যে মুখের আপনা থেকেই সেরে উঠতে পারে। তবে সবসময় এ চিত্র এমনই থাকে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এমন অনেক রোগ রয়েছে যার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে মুখে ঘা।
জ্বর-ঠোসা
হার্পিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে জ্বর-ঠোসা হয়ে থাকে।
মুখে বা ঠোঁটে লাল, তরলযুক্ত ফোস্কার মত দেখা দেয় এবং ব্যথা হয়। ক্ষতস্থানে খচখচ বা জ্বালা করতে পারে। এর সাথে হালকা জ্বর, শরীর ব্যথা বা লিম্ফনোডগুলো ফুলে যেতে পারে।
রক্তশূন্যতা
লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা কমে গেলে দেহের ভেতরে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং এর ফলে দেহে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
রক্তশূন্যতার অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে একটি হচ্ছে মুখের ঘা। দাঁতের মাড়ি ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং জিহ্বায় ঘা দেখা দেয়।
জিঞ্জিভোমাটাইটিস
দাঁতের মাড়ি ও মুখের ইনফেকশন। এটি শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়।
দাঁতের মাড়ি বা গালের ভেতর দিকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। ক্ষতগুলো দেখতে হালকা ধূসর বা হলদেটে হয় এবং ঠিক মাঝখানের অংশটুকু লাল রঙের হয়ে থাকে।
মনোনিউক্লিওসিস
এটি ‘কিসিং ডিজিজ’ নামেও পরিচিত। এপস্টাইন বার ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে এই রোগটি হয়। এটি একটি সংক্রামক ব্যধি। স্কুল, কলেজের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে মনোনিউক্লিওসিসের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
লক্ষণের মধ্যে রয়েছে গলায় ক্ষত, জ্বর, লিম্ফনোড ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।
অ্যাপথাস আলসার
বিষণ্ণতা বা মুখের অভ্যন্তরে কোনো আঘাত পেলে এই ধরনের অসুখ হয়ে থাকে।
মুখের ভেতর নরম টিস্যু আবরণী বিশেষত ঠোঁট, দাঁতের মাড়ি বা গালে ছোট ছোট সাদা, লাল বা হলদেটে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে থাকে।
অ্যাপথাস আলসার সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। তবে বারবার এই আলসার হতে থাকলে তা ক্রনস ডিজিজ, সিলিয়াক ডিজিজ বা এইচআইভি রোগের দিকে ধাবিত হতে পারে।
ফোলেট ডেফিসিয়েন্সি
ভিটামিন বি১২ বা বি৯ স্বল্পতার কারণে অস্বাভাবিক বড় আকৃতির লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় যার ফলে রক্তের স্বাভাবিক ক্রিয়া ব্যহত হয় এবং দেহে রক্তশুন্যতা দেখা দেয়।
অনান্য লক্ষণের পাশাপাশি মুখে ঘা হয় এবং জিহ্বা ফুলে যায়।
ওরাল থ্রাশ
ওরাল থ্রাশকে ক্যান্ডিডোসিসও বলা হয়। মুখের ভেতর এবং জিহ্বাতে ক্যানডিডা অ্যালবিকানস ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে এমনটা হয়ে থাকে। নবজাতক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে ওরাল থ্রাশ প্রায়ই দেখা যায়।
জিহ্বা, গালের ভেতরে, দাঁতের মাড়ি বা টনসিলে সাদা প্রলেপের মত তৈরি হয়। এছাড়াও দুই ঠোঁটের কোণায় ফেটে যায়।
হাত, পা ও মুখের অসুখ
কক্সাকি ভাইরাসের সংক্রমণের ফলে এই ধরনের অসুখ হয়ে থাকে। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই ধরনের সংক্রমণ হয়ে থাকে।
হাত ও পায়ের পাশাপাশি মুখ, জিহ্বা ও দাঁতের মাড়িতে লাল ফোস্কার মত হয়ে থাকে এবং তীব্র ব্যথাদায়ক।
লিউকোপ্লাকিয়া
দীর্ঘদিন যাবত মুখের ভেতরে প্রদাহ বা বারবার আঘাত পেলে লিউকোপ্লাকিয়া হয়। বিশেষত যারা ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে লিউকোপ্লাকিয়া বহুল চিহ্নিত একটি অসুখ।
এর ফলে জিহ্বাতে পুরু, সাদা আস্তর পড়ে এবং মুখের অভ্যন্তরীণ আবরণী উঁচু্ বা শক্ত হয়ে যেতে পারে।
ওরাল লিচেন প্লানাস
মুখের ভেতরে অবস্থিত মিউকাস মেমব্রেনের এক ধরনের প্রদাহের নাম ওরাল লিচেন প্লানাস।
এর ফলে দাঁতের মাড়ি, ঠোঁট, গালের ভেতর এবং জিহ্বাতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। মাকড়সার জালের মত সাদা ছোপ ছোপ ক্ষত তৈরি হয়।
সিলিয়াক ডিজিজ
এটি পরিপাক তন্ত্র ও অটোইমিউন তন্ত্রের এক ধরনের ব্যধি। এর ফলে ক্ষুদ্রান্ত পুরোপুরিভাবে বিকল হয়ে যেতে পারে।
অন্যান্য লক্ষণের পাশাপাশি মুখে ঘা এবং দাঁতের রং হলদেটে হয়ে যায়।
মুখের ক্যান্সার
ঠোঁট, গালের ভেতর, দাঁত, দাঁতের মাড়ি, জিহ্বার সামনের দুই-তৃতীয়াংশ, মুখগহ্বরের উপরিভাগ এবং নিম্নভাগে জায়গায় জায়গায় সাদা বা লাল ক্ষত অনেকসময় মুখের ক্যান্সারের পূর্বলক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
পেমফিগাস ভালগারিস
এটি এক ধরনের বিরল অটোইমিউন ডিজিজ।
এর ফলে দেহের অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি মুখের মিউকাস মেমব্রেনে ফোস্কা তৈরি হয় এবং চুলকায়। খাবার চিবাতে এবং গিলতে প্রচন্ড ব্যথা হয়।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
