মুক্তাগাছার মিষ্টি মন্ডা: স্বাদে, ঐতিহ্যে অনন্য

'হাওর, জঙ্গল, মহীষের শিং; এ নিয়ে ময়মনসিং'


লাবণ্য ভৌমিক | Published: March 19, 2022 16:59:29 | Updated: March 20, 2022 11:12:21


মুক্তাগাছার মিষ্টি মন্ডা: স্বাদে, ঐতিহ্যে অনন্য

ময়মনসিংহ নিয়ে এই প্রবাদটির চল বহুকাল ধরেই আছে বাংলাদেশে। দর্শনীয় স্থান থেকে শুরু করে মিষ্টিজাতীয় খাবারের জন্য প্রাচীন এই নগরী সবার কাছে প্রিয়।

ময়মনসিংহ শহরে কেউ বেড়াতে এলে শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন - ইংরেজ আমলের বহু বনেদি পরিবারের বাড়ি, শশীলজ, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি দেখে যেতে পারেন। শুধু এসব নিদর্শন দেখতেই নয়, এর পাশাপাশি জনপ্রিয় যে খাবারটির টানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসে তা হলো মুক্তাগাছার বিখ্যাত মন্ডা।

বিখ্যাত এই মিষ্টান্নের জন্ম ময়মনসিংহ শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছায়। বিখ্যাত মন্ডার দোকান ও কারখানাটি মুক্তাগাছা উপজেলার জগৎকিশোর রোডে অবস্থিত।

মুক্তাগাছায় পৌঁছানোর পর যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই একনামে চিনিয়ে দেবেন মন্ডার বিখ্যাত দোকানটি। দোকানে ঢুকেই দেখতে পাওয়া যায় একপাশে দোকানটির প্রতিষ্ঠাতা গোপাল পালের কাঠখোদাই করা মূর্তি। ১৯০২ সালে এটি নির্মাণ করা হয়।

দোকানের দেয়ালে বিভিন্ন রাজা, রাষ্ট্রদূত ও রাজনীতিবিদদের প্রশংসাপত্র সুন্দর করে বাঁধাই করা আছে। দোকানে কাঠের চেয়ার টেবিলগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো। ক্রেতাদের কেউ কেউ দোকানেই বসে চেখে দেখছেন ধবধবে সাদা নরম মন্ডা আবার কেউ কেউ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন - এটাই এখানকার পরিচিত এক দৃশ্য।

নরম ছানা আর চিনির মিশ্রণে তৈরি মন্ডার স্বাদ একবার চেখে দেখলে তার রেশ মুখে রয়ে যায় অনেকদিন।

সময়ের সাথে সাথে এখন দোকানের চেহারাও বদলে গেছে। আগে ছোট দোকানটিতে ১৫-২০ জনের মতো বসার জায়গা ছিল, এখন তা-ই কালক্রমে ইট, সিমেন্টে গড়া বিশাল এক দোকানে পরিণত হয়েছে।

দোকানটি যিনি বর্তমানে পরিচালনা করছেন তার নাম রবীন্দ্রনাথ পাল। মুক্তাগাছার মন্ডার প্রথম কারিগর গোপাল পালের পঞ্চম প্রজন্মের বংশধরদের একজন হলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ পাল জানান, বাংলা ১২০৬ সালে তৎকালীন ভারতবর্ষের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন গোপাল পাল। নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর ভারতবর্ষ থেকে মাতৃভূমি রাজশাহীতে চলে আসেন। এরপর বাংলা ১২৩০ সালে তিনি মুক্তাগাছায় ভিটে গড়েন।

বাংলা ১২৩১ সালে প্রথম মন্ডা তৈরি হয় বলে জানান তিনি। এই মন্ডা তৈরির পেছনের ইতিহাসটা একটু ব্যতিক্রমধর্মী। ভারতের দিল্লির লাড্ডু, লাল মোহন, রসমালঞ্চ, ছানার টোস্ট, পাকিস্তানের সোনা মিয়ার মিষ্টি, গোলাপজামুন, নেপাল ও শ্রীলংকার গোলাপ জাম ও লাল মোহন যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে আছে মুক্তাগাছার গোপাল পালের মন্ডা, কুমিল্লার রসমালাই, পোড়াবাড়ির চমচম, বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি।

এই মন্ডার সঙ্গে বৃহৎ কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং একটি পরিবারের কৃতিত্ব জড়িয়ে রয়েছে। গোপাল পাল ইংরেজি সাল ১৮২৪-এ দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২০০ বছর। মন্ডা তৈরির ব্যবসা চলছে বংশানুক্রমে, এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষে। সে হিসাবে এখন পঞ্চম পুরুষের ব্যবসা চলছে।

মন্ডা তৈরির পদ্ধতিটি গোপাল পাল স্বপ্নে পেয়েছিলেনএমন একটি দাবি আছে দোকানে রাখা এক পুস্তিকাতে। সেই পুস্তিকাটি দোকানে গেলে কেউ চাইলে পড়তে পারেন।

সেই পুস্তিকামতে, মন্ডার স্রষ্টা শগোপাল পাল স্বপ্নে দেখা পান এক ঋষির। তার কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন মিষ্টি তৈরির একটি প্রণালি।

স্বপ্নে শিয়রে দাঁড়িয়ে ঋষি তাকে নির্দেশ দিলেন মন্ডা তৈরি করার। পরদিন গোপাল ঋষির আদেশে চুল্লি খনন শুরু করলেন এবং সেখানে দৈবাৎ উদয় হলেন সেই ঋষি। তিনি চুল্লিতে হাত বুলিয়ে দিলেন, সাথে শিখিয়ে দিলেন মন্ডা তৈরির কলাকৌশল। দুধ ও চিনি দিয়ে তৈরি হলো মন্ডা।

গোপাল তার নব উদ্ভাবিত মন্ডা পরিবেশন করলেন তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাজদরবারে। মন্ডা খেয়ে মহারাজা পেলেন পরম তৃপ্তি, আর বাহবা দিলেন গোপালকে। শুরু হলো মন্ডার যাত্রা।

তখন থেকেই মন্ডা দিয়ে রাজদরবারে অতিথিদের আপ্যায়ন করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ালো। আবার জমিদারেরা উপহার হিসেবে বিশিষ্টজনদের কাছে মন্ডা পাঠাতেন। এভাবেই মুক্তাগাছার ছোট্ট গণ্ডি পার হয়ে মন্ডার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তিনি মিষ্টি তৈরিকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করলেন। তার উত্তরসূরিরা আজও এই মন্ডা তৈরির ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছেন দায়িত্বের সাথে।

মন্ডা বিষয়ে যে পুস্তিকাটি রয়েছে সেখানে মন্ডা কিভাবে তৈরি হয় তা লেখা আছে। মুলত মন্ডা এক প্রকারের সন্দেশ। শুধু ছানা ও চিনি দিয়ে এটি বানানো হয়। তবে স্বাদের রহস্যটা তৈরির ধরনের মধ্যে লুকিয়ে আছে, যা বছরের পর বছর ধরে গোপন রেখেছেন গোপাল পালের বংশধরেরা।

মন্ডার প্রস্তুত প্রণালি কখনোই পরিবারের বাইরে যায়নি। তারা দাবি করেন মন্ডা তৈরির মূল রেসিপিটা তাদের পারিবারিক, গোপনীয় এই কৌশলটা শুধু তারাই জানেন। ফলে মন্ডার নামে এখানে-সেখানে যা বিক্রি হয়, তা আসল না।

সময়ের সাথে সাথে সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মন্ডার দামও তাই আগের মতো নেই। আগে এক কেজি মন্ডা ৪০০-৪৫০ টাকা দরে বিক্রি হতো। বর্তমানে এক পিস মন্ডার দাম ৩৩-৩৫ টাকা করে প্রতি কেজি মন্ডার দাম পড়ে ৬৬০-৭০০ টাকা। বর্তমানে খেজুরের গুড়ে তৈরি মন্ডাও বিক্রি হয় কিন্তু তার জন্য গুনতে হবে আরেকটু বেশি দাম।

স্বাদের ভিন্নতা, তৈরির প্রক্রিয়া ও ঐতিহ্যের কারণে একেক এলাকার মিষ্টি একেক এলাকায় জনপ্রিয়। তবে গুন ও মানে মুক্তাগাছার মন্ডা সবার থেকে যোজন-যোজন এগিয়ে। যে কারণে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার নাম নিলেই চলে আসে মন্ডার কথা।

এখানকার মন্ডার সুখ্যাতি শোনেননি, এমন মানুষ বোধ হয় কম পাওয়া যাবে। একারণেই এই এলাকায় ভ্রমণরত মানুষ মন্ডার নাম শুনে কিনতে আর দেরি করেন না।

শুধু দেশ নয়, আগেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ থেকে মন্ডার সুনাম শুনে পর্যটকরা এখানে চলে আসতেন, এখনো আসেন।

লাবণ্য ভৌমিক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ৪র্থ বর্ষে অধ্যয়নরত রয়েছেন।

labanyabhowmik1777@gmail.com

Share if you like