Loading...

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশ

| Updated: August 18, 2021 15:04:43


মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশ

[নিবন্ধের প্রথম অংশ ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বৈশ্বিক প্রবণতা-য় বলা হয়েছে যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন দেশ দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক অথবা বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করছে। এই চুক্তিসমূহের বেশিরভাগই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। এই শেষ অংশে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।]

এটা এখন সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যসুবিধা,  জিএসপি সুবিধা প্রভৃতি গ্রহণ করেছে যা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০২৬ সালে এলডিসির কাতার থেকে উত্তরণের মধ্য দিয়ে এই সুবিধাগুলো হারাতে হবে। তাই বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার তাগিদ বেড়ে গেছে। 

এখানে লেখচিত্রে বাংলাদেশসহ পাঁচটি উন্নয়নশীল দেশের (যারা বিশ্ববাণিজ্যে পরস্পরের প্রতিযোগীও বটে) দেশের মধ্যে মোট ও সক্রিয় এফটিএ/পিটিএ’র তুলনা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার ১৬টি, ভিয়েতনাম ও ভারতের ১৪টি করে এবং ফিলিপাইনের ৯টি এফটিএ সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মাত্র তিনটি এফটিএ/পিটিএ সক্রিয় রয়েছে: এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তি (আপটা), উন্নয়নশীল আট( ডি-৮) আর দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (সাফটা)।

ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের একটি বড় সুবিধা রয়েছে আসিয়ানের (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ও ইউরাশিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে আসিয়ানের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশের-ভুটান দ্বিপাক্ষিক পিটিএ এবং বিমসটেক (দ্য বে অব বেঙ্গল ইনিশয়েটিভ ফর মাল্টি-সেকটরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশ) জোটের সাথে আঞ্চলিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনোটিই সক্রিয় বা কারযকর হয় নি। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ওআইসি’র অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, চীন, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিএফটিএ গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি ( কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট বা সেপা) করার জন্য যৌথ সমীক্ষা চলমান রয়েছে। তাহলে বোঝা যায় যে আমরা বৈশ্বিক প্রবণতা ও প্রতিযোগী দেশসমূহের তুলনায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছি।

অর্থনীতি কতটা মুক্ত ও উদারনীতিতে পরিচালিত হচ্ছে তা পরীক্ষা করা হয় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচক দিয়ে। হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল প্রণীত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সূচক ২০২১ এ ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম । এখানে ৪ টি সূচকে পরিমাপ করা হয়- আইনের শাসন, সরকারের আকার, নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা, বাজার ব্যবস্থার উন্মুক্ততা।

বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলো সমন্বয় করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি এফটিএ উইং রয়েছে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিসমূহ সম্পন্ন করতে ২০১০ সালে এফটিএ পলিসি গাইডলাইনস নামে একটি নির্দেশিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তৈরি করে যেখানে মূলত পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিএফটিসি) বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষিতে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে সে অনুসারে এফটিএ/ পিটিএ গাইডলাইনটি তৈরি করছে। নতুন এই গাইডলাইনে মেধাস্বত্ব, প্রযুক্তি ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের মতো বাংলাদেশকেও সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে দ্রুতবেগে এগোতে হবে। কিন্ত সেজন্য আমাদের বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করতে বাংলাদেশের সামনে চার ধরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন। প্রথমত এই চুক্তি করতে হলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের ৯০ শতাংশ পণ্যের প্রবেশাধিকার শুল্কমুক্ত করতে হবে এবং প্রায় সকল সেবার প্রবেশাধিকার শুল্কমুক্ত করতে হবে। এতে বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ শুল্ক হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি তখনই সুবিধাজনক হয় যখন একটি দেশের বহুমুখী রপ্তানি পণ্য থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের উপর ভূমিকা রাখে একটি পণ্য- তৈরি পোশাক। তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হলে আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও বিদেশি বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, উন্নত দেশসমূহের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে অন্যদিকে তৈরি করে প্রতিযোগিতা, মেধাস্বত্ব, শ্রম অধিকার ও পরিবেশ সংক্রান্ত নানা বাধ্যবাধকতা। বাংলাদেশ এই বাধ্যবাধকতা পূরণ করে প্রতিযোগিতাসক্ষম থাকতে পারবে কিনা তা একটি বড় প্রশ্ন। চতুর্থত, বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ --- ১৫ শতাংশ। এই শুল্ক ব্যবস্থায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করলে ক্ষতির পরিমাণ বেশি দেখাতে পারে। তাই আমরা যদি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে চাই, আমাদের শুল্ক ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে যৌক্তিকীকরণ করা প্রয়োজন। 

আবার দেশের অর্থনীতিতে মুক্ত বাণিজ্যের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন লোকবলের অভাব অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও রয়েছে। এর ফলে এফটিএর সকল দিক বিবেচনায় না নিয়ে এসে, বিশ্লেষণ না করে কিছু অভিজ্ঞতা ও সাধারণ ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রভাব মূল্যায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ রক্ষাই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।

শেষ কথা: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিসরে বাণিজ্য সুবিধাসমূহের প্রধানত গ্রহীতা হিসেবেই এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান নীতি- পারস্পারিক সুবিধা দানের নীতি পালন করেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে আমাদের এগোতে হবে। এই সুবিধার সমঝোতা বা দরকষাকষি ও লেনদেন কতটা ভারসাম্যপূর্ণ হয় তার উপরই নির্ভর করবে আমাদের সাফল্য। তাই, আগামীর উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টেকসই করতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, সর্বোপরি ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ পরিকল্পিতভাবে নিরসনের মধ্য দিয়েই ভারসাম্যপূর্ণ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

মো. জুলফিকার ইসলাম, গবেষক, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই), ঢাকা। julfikar.moon@gmail.com

[রিডিং ক্লাব ট্রাস্টের ৪২৮তম সাপ্তাহিক পাবলিক লেকচারে প্রদত্ত মূল বক্তব্যের লিখিত রূপের শেষ অংশ; ঈষৎ সম্পাদিত]

 

 

Share if you like

Filter By Topic