করোনাভাইরাসের মহামারি এবং তা মোকাবেলায় কয়েক দফায় জারি করা লকডাউনের প্রভাবে মালয়েশিয়ায় চাকরি হারিয়ে খাদ্য সংকটে ভুগছেন অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক।
শ্রমিক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ২০২০ সালের শুরুর দিকে মালয়েশিয়ায় যখন করোনাভাইরাস হানা দেয়, তখনই সে দেশে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ চাকরি হারান। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি কোভিড-১৯ এর তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছে।
জানুয়ারিতে লকডাউন উঠে যাওয়ার পর কিছু শ্রমিক চাকরির ব্যবস্থা করতে পারলেও মালয়েশিয়ান সরকার জুনে তৃতীয়বারের মতো লকডাউনের ঘোষণা দেয়।
চাকরি হারিয়ে বর্তমানে সে দেশে থাকা অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকদের দুর্দশার মাত্রা এত বেড়েছে যে, তাদের মধ্যে অনেকের বাসায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার নেই।
কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করলেও সবাই এ সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য গঠিত মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন (এমবিএফএ) ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য একটি তহবিল গঠন করেছে।
এমবিএফএ’র সহযোগী সদস্য আহমাদুল কবির বলেন যে, “কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমাতে লকডাউন জারি হওয়ার কারণে কয়েকমাস ধরে শ্রমিকদের কোনো আয় নেই। যে কারণে বর্তমানে তারা খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।”
তিনি জানান, “এখন পর্যন্ত আমরা ১২,০০০ শ্রমিকের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছি।”
বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মালয়েশিয়ায় একটি গাড়ির দোকানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জুন মাসে লকডাউন শুরু হওয়ার পর দোকানের মালিক ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ায় তিনি চাকরি হারান।
চাকরি থাকাকালীন তার মাসিক আয় ছিলো ১,৬০০ রিঙ্গিত, অর্থাৎ ৩২,০০০ টাকা।
তিনি বলেন, “লকডাউন পুরোপুরি শিথিল হলে আমাকে নতুন চাকরির সন্ধান করতে হবে।”
জসীমউদ্দীন আরো বলেন যে, তার মতো তার বন্ধুদেরও গত তিনমাস ধরে চাকরি নেই। তাছাড়া, অনেক শ্রমিকের মজুরিও কমিয়ে দিয়েছেন নিয়োগকর্তারা।
এ ব্যাপারে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাথে কথা হলে মালয়েশিয়া-ভিত্তিক ফ্রিল্যান্স গবেষক আবু হায়াৎ জানান, “অনেক কোম্পানি তাদের প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার কারণে নির্মাণখাতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।”
“গাড়ির দোকান, ছোট সুপারশপ, পাইকারি বাজার এবং ছোট ছোট ফার্মে যেসব শ্রমিক কাজ করতেন, তারাও কর্মস্থান থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন।”
তিনি আরো জানান, “আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে যেসব শ্রমিক চাকরি পেয়েছিলেন, তাদের ছাঁটাই হয়েছে আরো বেশি। বৈধ কাগজপত্র সহ এবং ছাড়া উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত শ্রমিকরা অতিমারীর সময়ে বেকার ছিল।”
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৭ লক্ষ বাংলাদেশি বসবাস করছে। তাদের মধ্যে সিংহভাগই নির্মাণ ক্ষেত্র ও অন্যান্য ছোট উদ্যোগের সাথে জড়িত।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরাসহ মানবাধিকার কর্মীরা কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুবিধাবঞ্চিত প্রবাসী শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা সরবারহ নিশ্চিত করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছে।
মালয়েশিয়া ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ করা শুরু করে। কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে ছাড়পত্র নিয়ে এখনো পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ডোমিটার্স ওয়েবসাইটের হিসাব অনুযায়ী, আগস্টের ২৩ তারিখ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৫,৭২,৭৬৫ এবং ১৪,৩৪২।
arafataradhaka@gmail.com
