র্যাবের কাছে একটি ফোন আসে মালয়েশিয়া থেকে, তাতে বেড়ে যায় উত্তেজনার পারদ। বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দরে শুরু হয়ে যায় নিরাপত্তা প্রস্তুতি; ডাক পড়ে বিমান বাহিনীরবম ডিসপোজাল ইউনিট, সন্ত্রাস দমন ইউনিট, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যদের। সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যরা বাইরে অবস্থান নেন।
খবর ছিল, বুধবার রাতে কুয়ালালামপুর থেকে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের যে ফ্লাইট ঢাকায় আসছে, সেখানে দুই যাত্রীর কাছে আছে বোমা!
মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কথা বলে কিংবা গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে ওই তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। তারপরও বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখে কর্তৃপক্ষ।খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
১৩৫ জন যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইটটি রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে শাহজালালে নামে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে প্রত্যেক যাত্রী ও মালামাল তল্লাশি করা হয়। শেষ পর্যন্ত স্বস্ত্বির শ্বাস ফেলেন নিরাপত্তাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার প্রথম প্রহরে সংবাদ সম্মেলন এসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদুল আহসান জানান, ওই উড়োজাহাজে বোমা বা বিপদজনক কিছু মেলেনি।
তিনি জানান, মালেয়েশিয়ার একটি ফোন নম্বর থেকে বার্তা এসেছিল, পাকিস্তানি দুই যাত্রীর সঙ্গে বোমা রয়েছে। তবে ফ্লাইটে পাকিস্তানি কোনো যাত্রী ছিলেন না।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে র্যাবকে মালয়েশিয়ার একটি নম্বর থেকে ওই বার্তাটি দেওয়া হয়। সঙ্গত কারণেই তার নামটি বলছি না। র্যাব থেকে জানানো হয়, মালয়েশিয়া থেকে একটি বিমান আসবে, সেটির কিছু যাত্রীর সঙ্গে বম থ্রেট আছে।
বিমানটি পরে স্বাভাবিকভাবেই অবতরণ করে। তখন আমরা মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা জানায় আমাদের তথ্যের সঙ্গে মিল আছে এমন কোনো যাত্রী উড়োজাহাজে নেই।
শাহজালালের পরিচালক তৌহিদুল আহসান জানান, বিমানের ১৩৫ জন যাত্রীর মধ্যে ১৩৪ জন ছিলেন বাংলাদেশি। বাকি একজন মালয়েশিয়ার নাগরিক ছিলেন।
নিশ্চিত না হওয়ার পরও এত আয়োজনের কারণ ব্যাখ্যা করে তৌহিদুল আহসান বলেন, বিমানবন্দরে বোমার হুমকি দেখা দিলে কী করতে হবে, তা আগেই নির্ধারণ থাকে। সে কারণে বিষয়টি হালকাভাবে না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা।
আমরা প্রথমে মিটিং করি। সিভিল এভিয়েশনের সদস্যসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও বাহিনীর সদস্যরা সেখানে ছিলেন। মিটিংয়েও মালয়েশিয়া থেকে আসা তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানান গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
তারপরেও সবার পরামর্শ মতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আমরা এটাকে হালকাভাবে নেব না। এরপর এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত হই। আমরা ঘোষণা করি যে আমরা অ্যাকশনে যাব, আমরা তল্লাশি চালাব।
বিমানবন্দরের পরিচালক জানান, কুয়ালালামপুর থেকে ছেড়ে আসা নিয়মিত ফ্লাইটটি রাত ৯টা ৩৮ মিনিটে শাহজালালে নামার পর সেটাকে একটু দূরে ট্যাক্সিওয়েতে পার্ক করে শুরু হয় তল্লাশি।
এয়ারক্রাফট ল্যান্ডিংয়ের পর চেকলিস্ট অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিমান বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সবাইকে খবর দেওয়া হয়।
তল্লাশি অভিযানে মূল ভূমিকা পালন করে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বঙ্গবন্ধুর বম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। তাদের সহায়তা করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। বাইরের প্রস্তুত ছিল সেনাবাহিনী ও র্যাব।
এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ছিলেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এজেন্টের কর্মীরা যাত্রীদের নামানো ও লাগেজ নামানোর কাজটি করেন। ডগ স্কোয়াডের কুকুরগুলোকেও তল্লাশিতে কাজে লাগানো হয়।
গ্রুপ ক্যাপ্টেন তৌহিদুল বলেন, প্রথমে আমরা যাত্রীদের নামিয়ে দিই। এরপর যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি করা হয়। বিমান বাহিনীর বম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা তাদের সরঞ্জাম নিয়ে তল্লাশি চালায়।
যাত্রীদের কাছে সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে তাদের টার্মিনাল ভবনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।তারপর উড়োজাহাজটির সামনের ও পেছনের দুটি চেম্বার থেকে মালামাল (কার্গো) নামানো হয়। নামানোর সময় মালামালগুলোতেও তল্লাশি করা হয়।
শাহজালাল পরিচালক বলেন, একটি একটি করে লাগেজ স্ক্যান করে ট্রলিতে ভরে বে এরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লাগেজগুলো ডগ স্কোয়াডের কুকুর দিয়েও স্ক্যান করা হয়। তবে বিপদজনক বা বোমাসদৃশ কিছু পাওয়া যায়নি।
তার আগে বম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা উড়োজাহাজের ভেতরে তল্লাশি চালান। সেখানেও কিছু পাওয়া যায়নি। প্রত্যেক যাত্রী এবং লাগেজ একটি একটি করে তল্লাশি করতে অনেক সময় লেগে যায় বলে তৌহিদুল আহসান জানান।
রাত ১টার দিকে সর্বশেষ লাগেজ স্ক্যান করার পর অভিযানের নেতৃত্বে থাকা এয়ারফোর্সের কর্মকর্তারা বিমানটিকে নিরাপদ ঘোষণা করেন।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, যেহেতু উড়োজাহাজটিতে কিছু পাওয়া যায়নি, তাই কাউকে আটক করা হয়নি। এরপর উড়োজাহাজটিকে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে আসা হয় এবং পরবর্তী যাত্রার জন্য সেটি প্রস্তুত বলে ঘোষণা করা হয়।
যাত্রীর ক্ষোভ
সংবাদ সম্মেলন চলার সময় সেখানে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ওই ফ্লাইটের এক যাত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, চার ঘণ্টা ধরে আটকে পড়া যাত্রীদের পানিও দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, স্যার আমরা সাড়ে ৯টার দিকে এখানে নামছি। এখন রাত দেড়টা বাজে। সবাই আটকে আছি। কিন্তু এই চার ঘণ্টায় কেউ আমাদের এক বোতল পানিও দেয়নি।
১৫ টাকা করে একটা পানির বোতল যে কেউ দিতে পারত। আমরা কতদূর থেকে ট্র্যাভেল করে এসেছি। কিন্তু আপনারা এ বিষয়ে কোনো ভূমিকাই রাখছেন না।
এসময় গ্রুপ ক্যাপ্টেন তৌহিদুল আহসান বলেন, আমরা আসলে একটা জরুরি অবস্থার মধ্যে কাজ করছিলাম।
ওই যাত্রী বলেন, আপনি তো একা নন। আপনার অধীনে অনেকগুলো সংস্থা ও ব্যক্তি রয়েছে। যে কাউকে বললেই হত।
শাহজালাল পরিচালক বলেন, এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণের সঙ্গে কথা হচ্ছে।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ওই যাত্রী বলেন, এখানে প্রবাসী কল্যাণকে টানার দরকারটা কী? এক বোতল পানি তো যে কেউই দিতে পারত। আপনারা এয়ারলাইন্সকে বলতে পারতেন।
আর মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স এখনো দেউলিয়া হয়ে যায়নি যে যাত্রীদের এক বোতল করে পানি দিতে পারবে না। আর যদি কেউ না দেয়, আপনি সুযোগ করে দিন, আমি প্রত্যেক যাত্রীকে এক বোতল করে পানি কিনে দিতে চাই।
পরে এ ধরনের ভুল যাতে না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে ব্রিফ করা হবে জানিয়ে আশ্বস্ত করা হলে ওই যাত্রী পরে সংবাদ সম্মেলন থেকে চলে যান।