লিওনেল মেসি যতটা না আর্জেন্টিনার, তারচেয়ে বেশি বার্সেলোনার- এমন সমালোচনা শুনতে শুনতে ক্লান্ত ইমরান হোসাইন এবার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
কোপা আমেরিকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ঘরের মাঠে হারিয়ে শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা। আর এই জয়ের মধ্য দিয়েই লিও মেসি নিন্দুকের মুখে ছাই ঢেলে দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে ইমরানের।
আর্জেন্টিনার এই পাঁড় সমর্থক বললেন, মেসি যে শুধু ক্লাবের নয়, তা তিনি কোপার শিরোপা জিতে প্রমাণ করে দিয়েছেন।
মহামারীর কারণে বাংলাদেশে চলছে লকডাউনের বিধিনিষেধ। তার মধ্যেও ১৫ হাজার দূরের মারাকানা স্টেডিয়ামের খেলার আঁচ এসে লেগেছিল বাংলাদেশে। আর্জেন্টিনার জয়ের পর সমর্থকরা উল্লাসে মেতেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে।
আগে বিশ্বের কোথাও বড় কোনো খেলার আসর বসলে দেশের বিভিন্নস্থানে বড়পর্দায় তা দেখার আয়োজন হত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা হয়ে উঠত মিনি স্টেডিয়াম।
তবে মহামারীর কারণে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বড় পর্দায় খেলা দেখার কোনো আয়োজন হয়নি । তবে গলির চায়ের দোকানে কয়েকজন বসে খেলা দেখার আড্ডার সুযোগ করে নিয়েছেন কেউ কেউ।
বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন না থাকলেও ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে রাতেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে টিএসসিতে জড়ো হয়েছিলেন অনেকে। ভোরে সেখানে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কক্ষে বসে টেলিভিশনে খেলা উপভোগ করেন তারা।
আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি কিংবা ব্রাজিলের নেইমার যখনই বল নিয়ে প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকে ছুটেছিলেন, সমর্থকদের স্লোগান আর চিৎকারে মনেই হচ্ছিল না দেশে মহামারী চলছে।
খেলা শেষ হতেই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে টিএসসি চত্বর। বন্ধুদের নিয়ে জলকেলি আর সেলফি তোলাও চলে।
প্রিয় দলের শিরোপা জয়ের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমার রুহান বলেন, মেসির হাতে ট্রফি দেখার যে আক্ষেপ ছিল, সেটা অবশেষে মিটল। আজকের দিনটা আমার মত আর্জেন্টাইন সমর্থকদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ওবায়দুর রহমান সোহানের প্রিয় দল ব্রাজিল হেরে গেছে, তবে তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন অন্যভাবে।
খেলায় হার জিত থাকবেই। এবার ট্রফিটা আর্জেন্টিনার দরকার ছিল। ২৮ বছরে ব্রাজিলের ঝুড়িতে ১১টি মেজর ট্রফি এসেছে, সেখানে আর্জেন্টিনার তো শূন্য। এই ছোট সেক্রিফাইস করাটায় কোনো ক্ষতি দেখছি না।
আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফির খরা কাটায় আবেগ ভাব প্রকাশের ভাষাই যেন হারিয়ে ফেলেছেন শাকির আহমেদ।
তিনি বললেন, সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়ারকে চারটা ফাইনালে কাঁদতে দেখেছি; নিজে কেঁদেছি। সে একটা আন্তর্জাতিক ট্রফি ডিজার্ভ করত এবং সেটা সে অর্জন করেছে। মেসির খুশিতে আমরা খুশি।
করোনাভাইরাসের কারণে এবার পাহাড়ি এলাকা রাঙামাটিতেও বড় পর্দার আয়োজন নেই। খেলা উপভোগ করতে হয়েছে ঘরে বসেই। তবে ঘরে বসে খেলা দেখলেও উল্লাসে উৎসবের আমেজ ছিল সেখানে।
আর্জেন্টিনার সমর্থক সাইফুল হাসান বলেন, ব্রাজিল ভালো খেলেছে, তবে আর্জেন্টিনার খেলা অসাধারণ ছিল। বাড়ির বাকিরা ব্রাজিল সমর্থক হওয়ায় জয়টা আরো উপভোগ্য হয়েছে। তাদের ক্ষ্যাপানোর মজাটাই আলাদা।
আর্জেন্টিনার জয়ে উল্লাস প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিদ্দিক ফারুক বলেন, অনেক অনেক বেশি উচ্ছ্বসিত। বিশেষ করে মেসির জাতীয় দলের হয়ে একটা ট্রফি বড্ড প্রয়োজন ছিল। সেটা অবশেষে ধরা দিয়েছে। তাতে বেশি ভালো লাগছে। পরাজিত দলের প্রতি সহানুভূতি রইল।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। আর যদি দুই দল মুখিমুখি হয়, তখন সমর্থকদের দ্বন্দ্বটা রীতিমত বিস্ফোরক হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনার সমর্থক আমজাদ হোসাইন বলেন, দীর্ঘদিন ব্রাজিল সমর্থকদের চোখ রাঙানিকে আমরা ধুলো দিতে পেরেছি, এটা আমাদের অন্যতম বিজয়। এ শৈল্পিক খেলার উদাহরণে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলের তুলনা হয় না।
"ব্রাজিলের খেলা আজ অন্য দিনের চাইতে বাজে ছিল। মেসির জাদুকরি খেলা, ডি মারিয়ার গোল আর চুম্বকের আকর্ষণশক্তিওয়ালা গোলকিপারের সহায়তায় এ জয় আর্জেন্টিনারই।
মারিয়া মৌসুমি নামের আরেক সমর্থক বললেন, এতদিন ব্রাজিল সমর্থকরা আমাদের ক্ষ্যাপাতো আরজিতেনা বলে। আমাদের কোনো কাপ নাই এসব বলে। তারা বলত ব্রাজিলই সেরা, এবার তাদের দেশেই আর্জেন্টিনা তাদেরকে হারিয়ে দেখাইয়া দিছে কে সেরা।
এদিকে আর্জেন্টিনার জয়ে রেফারির বিরদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের ব্রাজিল সমর্থক কেউ কেউ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন মাহী বলেন, জয়ের আনন্দে লাফানোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উচিত রেফারি এবং ব্রাজিলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। ২০ ফাউল আর ৫ টা হলুদ কার্ডে বর্ণিল ফুটবল আমরা দেখেছি। রেসলিংয়ের জয় হয়েছে, ফুটবলের নয়।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ছিল বেশ উত্তপ্ত।
প্রিয় দলের জয়ে যেমন ছিল উল্লাস ছিল, ছিল পরাজয়ের আক্ষেপও। নানা যুক্তি-তর্ক আর কটাক্ষে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তৎপর ছিলেন অনেকে।
নাহিদা আলম নামে একজন ফেইসবুকে লেখেন, নেইমারের প্যান্ট ছিঁড়ে প্রথমে ব্রাজিলিয়ানদেন খেলার মুড নষ্ট করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা। এত ফাউল কোনো ম্যাচে দেখিনি। মনে হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোপাকুপি দেখছি।
আর্জেন্টিনার সমর্থক রেজাউল করিম আবার লিখেছেন, অবশেষে আর্জেন্টিনার নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হল লিওনেল মেসির হাত ধরে। স্বর্গ থেকে হয়ত এই জয় উপভোগ করেছেন আরেক কিংবদন্তি, ফুটবল ঈশ্বর মারাদোনা। এ ধারা অব্যাহত থাকুক।"
এদিকে লকডাউনে দোকান পাট বন্ধ থাকায় সকাল বেলা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার লড়াই দেখতে পারেননি অনেক রিকশাওয়ালা। সেজন্য আক্ষেপ রয়েছে তাদের।
শহীদ মিনার এলাকায় রিকশাচালক আব্দুল জলিল বললেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলা নিয়ে কয়দিন ধরে অনেক কথা শুনতেছিলাম। দেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু লকডাউনে তো দোকান-পাট বন্ধ, দেখা হইল না।
হাসান মিয়া নামে আরেক রিকশাচালক বললেন, আমার প্রিয় আর্জেন্টিনা। টিভিতে খেলা দেখার সুযোগ পাই নাই। মেসি ট্রফি পাইছে, শুনে ভাল্লাগছে।
ঠিক উল্টো অনুভূতি মিরপুরের রিকশা চালক রুবেল মিয়ার। তিনি বললেন, দোকান-পাট বন্ধ, খেলা দেহাম কেমনে? ব্রাজিল হাইরা গেছে, খারাপ লাগতাছে।