Loading...

মানুষ কেন মিথ্যে বলে?

| Updated: March 15, 2021 21:40:56


মানুষ কেন মিথ্যে বলে?

কিশোর সাহিত্যের বিশ্ববিখ্যাত চরিত্র পিনোকিও’র কথা জানেন তো? মিথ্যে বলার অভ্যাস ছিল তার মজ্জাগত। এর শাস্তিও জুটে গিয়েছিল তার কপালে। মিথ্যে বললে কাঠের পুতুল সেই পিনোকিও’র নাক লম্বা হতে থাকত, এতটাই লম্বা যে নানা ধরনের পাখি এসে তাতে বসে থাকত। সে রূপকথার কাঠের পুতুল, তার এমনটা হতেই পারে। কিন্তু, মানুষ হওয়ায় আমরা বেঁচে গিয়েছি এমন কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি থেকে। মানুষের ক্ষেত্রে মিথ্যে বলার ক্ষমতা পিনোকিও’র চেয়ে হাজারগুণ বেশি। ব্যক্তিভেদে প্রতিদিনই ঘটে চলছে এর ব্যবহার বা অপব্যবহার।

আজ এই ‘মিথ্যের পাঁচালী’তে কথা হবে। তবে মিথ্যে কথা নয়, বরং মানুষ কেন মিথ্যে বলে থাকে, মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সে বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়েই হবে হালকা ব্যবচ্ছেদ। কাউকে বুঝতে হলে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে বোঝাটা বেশি কার্যকর। তাই মিথ্যে বলার সময় ব্যক্তিটির মনে কী চলছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।

নৈতিকতার দৃষ্টিতে সোজা করে দেখলে ‘মিথ্যে বলা অনুচিত’, বিভিন্ন ধর্মে একে ‘পাপ’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু সে জন্য বাস্তবজীবনে কখনোই মিথ্যে বলেননি, এমন মানুষ পাওয়ার আশায় গুঁড়েবালি। মিথ্যে বলার পরিমাণে পার্থক্য থাকে, আর তা দিয়ে পরিমাপ করা হয়, কে কতটা কম কিংবা বেশি মিথ্যেবাদী। আবার নিজের বলা মিথ্যে সামলে নেবার দক্ষতা এবং সে মিথ্যের অন্যের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, এ মানদণ্ডও বেশ ভেবে দেখার মতো। ভাষা ও সামাজিক মনোবিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা ‘কয়েকজন দক্ষ মিথ্যেবাদী: মিথ্যে বলার প্রবণতায় বৈচিত্র্য’ থেকে জানা গিয়েছে, সাধারণ মিথ্যেবাদী আর দক্ষ মিথ্যেবাদীর মধ্যে পরিসংখ্যান দিয়ে পার্থক্য করা যায় এভাবে—সাধারণ মিথ্যেবাদী দিনে গড়ে একটি করে মিথ্যে বললে দক্ষ মিথ্যেবাদী বলেন সাড়ে পাঁচটি বা তারও বেশি।

বিজনেস ইনসাইডারের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাধারণত তিন থেকে চার বছর বয়সে মানুষ মিথ্যে বলা শিখে যায় এবং তার প্রয়োগ ঘটানো শুরু করে। একজন শিশুর কাছে এটি নতুন একটি খেলার মতো। শুধুমাত্র ভাষার ভিন্ন প্রয়োগের মাধ্যমে অন্যকে কিছু একটা বিশ্বাস করানো যায়, এই ভাবনাটিই শিশুদের মিথ্যের পেছনে ইন্ধন জোগায়। তার কিছুদিন পর যখন তারা স্কুলে যাওয়া শুরু করে এবং পরিবার ও স্কুল দু জায়গা থেকেই নৈতিকতার শিক্ষা পাওয়া শুরু করে, তখন তারা জানতে পায় যে ‘মিথ্যে বলা খারাপ’। সে কথা তারা মেনেও নেয়, কিন্তু তত দিনে একটা অভ্যাসের বীজ বোনা হয়ে গিয়েছে। সে বীজ পরবর্তী সময়ে কারও ক্ষেত্রে চারাগাছ, তো কারও ক্ষেত্রে রূপ নেয় বিশাল বটবৃক্ষে।

 ‘প্যাথোলজিকাল লাইং’-এই প্রত্যয়টি ঠিক আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রোগ নয়, কিন্তু এর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে বহু মানসিক রোগের। কারণে মিথ্যে বলাটাকে যদি ধরে নেওয়া হয়ে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে, তখন মাথা চুলকাতে হয় অকারণে মিথ্যে বলা নিয়ে। মানুষ সব সময় শুধু উপযুক্ত কারণেই মিথ্যে বলে না, অকারণেও বলে এবং একসময় কারও কারও জন্য তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। তাদের সেই ‘অকারণ’ এর পেছনের কারণগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক সাইকোলজি টুডে’র একটি প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী—

 প্রথমত, তাদের কাছে মিথ্যেটি একেবারেই অকারণ নয়, বরং বেশ জরুরি। ছোটখাটো মিথ্যের ক্ষেত্রে শ্রোতাদের কাছে মিথ্যেটি বেশির ভাগ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, কিন্তু বক্তার ক্ষেত্রে সেটি উল্টো।

 দ্বিতীয়ত, সত্য বলে দিলে তারা পরিস্থিতির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে এমনটা মনে হয়। তাই পরিস্থিতিকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে সেটিকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসার জন্য মিথ্যের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প তাদের কাছে থাকে না।

 তৃতীয়ত, তারা অন্যকে হতাশ করতে চায় না। দ্বিতীয় কারণটির সঙ্গে এটি কিছুটা মিলে যায়। এখানেও সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিধা, তবে এ ক্ষেত্রে তা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। অন্য কারও প্রত্যাশার মানদণ্ডে উতরোতে না পারার ভয় থেকে এই মিথ্যে অনেকটা ‘যথাযথ প্রতিক্রিয়া’র মতো হয়ে বেরিয়ে আসে। এই মিথ্যেকে সাধারণত আমরা ‘অজুহাত’ বলে জেনে থাকি।

চতুর্থত, ‘একটি মিথ্যে আরও হাজারটি মিথ্যের জন্ম দেয়’, এ কথার সঙ্গে আমরা সকলেই হয়তো পরিচিত। ইংরেজি পরিভাষায় একে বলে ‘লাই স্নোবল’। অর্থাৎ, ছোট ছোট তুষারকণা একে অন্যের সঙ্গে মিলে যেভাবে স্নোবল তৈরি করে, মিথ্যেগুলো ঠিক তেমনই। একটি মিথ্যে বলার পর, সেটি রক্ষা করার স্বার্থেই শুরু হয় পরের মিথ্যেগুলো।

পঞ্চমত, তাদের কাছে একসময় এটি আর মিথ্যে থাকেই না, একটা নির্দিষ্ট সময় পর মিথ্যে বলার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সমান্তরালভাবে তারা নিজেরাও সেটি বিশ্বাস করতে শুরু করে দেয়। ইংরেজি পরিভাষায় একটি প্রত্যয় আছে-‘উইশফুল থিংকিং’, এর দ্বারা আমরা যেসব বিষয় ঘটুক বলে চাই, সেই ভাবনাটিকে বোঝায়। উইশফুল থিংকিংয়ের কারণে যে মিথ্যেগুলো বলা হয়, তা নিজের কাছে ‘সত্যি’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অন্য মিথ্যের চেয়ে আরও বেশি প্রবল। বলে বলে সত্যি করার একটা প্রবণতা দেখা যায় এসব মিথ্যেবাদীর ক্ষেত্রে, যারা বিশ্বাস রাখে একটি মিথ্যে বারবার বললে তা সত্যের মতো শোনায়।

মিথ্যে বলার পর মিথ্যেবাদীর মনস্তত্ত্বে তার প্রভাবটা বেশ গাঢ় হয়। সায়েন্স অফ পিপল-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোনো একটি ঘটনা নিয়ে মিথ্যে বলার পর সেই ঘটনার স্মৃতির জায়গায় ধীরে ধীরে মিথ্যেটি গেঁথে যেতে থাকে। এবং বারবার বলার পর একসময় সত্যি কী হয়েছিল, তার বদলে প্রতিষ্ঠিত মিথ্যেটিই তার স্মৃতিতে রয়ে যায়।

মিথ্যেবাদী তার বলা মিথ্যেগুলোর মাধ্যমে শুধু অন্যকে ঠকাচ্ছে, তা নয়। নিজেকেও সে প্রতিনিয়ত ঠকিয়ে যাচ্ছে। অন্যের সঙ্গে মিথ্যাচারের চাইতেও নিজের সঙ্গে করা মিথ্যাচার বেশি ভুগিয়ে থাকে, তাই মিথ্যের মাধ্যমে একের পর এক ভ্রম সৃষ্টি করে ‘জীবন ভালো চলছে’ এমনটা ভেবে সাময়িক স্বস্তি পাওয়াটা সমাধান নয়। এর চেয়ে বরং নিজেকে সত্য বলার জন্য প্রস্তুত করবার সাহসটুকু জোটানো ভালো হবে, এতে করে বাস্তবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা সহজ হয়ে ধরা দেবে।

জীবনটাকে সত্যের আতশ কাচ দিয়ে দেখা শুরু করলে হয়তো মিথ্যের ধোঁয়াশা একসময় নিজে থেকেই কেটে যাবে।

Share if you like

Filter By Topic