এক ধরনের তীব্র ও অসহনীয় মাথাব্যথায় চোখমুখ আঁধার হয়ে আসে, মাথা তোলার শক্তিটাও যেন হারিয়ে যায়। নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝে সব কাজ ফেলে অবশ করে দিতে পারে এই ব্যথা, যার নাম মাইগ্রেন।
এই অবস্থায় সাধারণত মাথার যেকোনো এক পাশে (কিছু ক্ষেত্রে উভয় পাশেই) তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় এবং আলো বা শব্দের ক্ষেত্রে এক ধরনের সংবেদনশীলতা কাজ করে আর সাথে বমিবমি ভাব তো রয়েছেই। এই ব্যথার স্থায়ীত্বকাল কয়েকঘন্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত হতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষায় অতিমাত্রায় সক্রিয় স্নায়ুকোষগুলো যখন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুতে সিগন্যাল পাঠায় এবং উত্তেজিত করে তোলে তখন মাথা এবং মুখমন্ডলে এক ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
এধরনের প্রতিক্রিয়ার কারণে শরীর থেকে নানা রকম রাসায়নিক উপাদান, যেমন - সেরোটোনিন এবং ক্যালসিটোনিন জিনের অনুরূপ পেপটাইড ক্ষরিত হয়। এই রাসায়নিক উপাদানগুলো ব্রেইনের আবরণীতে অবস্থিত রক্তজালিকাসমূহকে স্ফীত করে তোলে।
এর ফলে নিউরোট্রান্সমিটারগুলো এক ধরনের অস্বস্তিবোধ এবং ব্যথার সৃষ্টি করে যাকে মাইগ্রেন বলা হয়।
কেন হতে পারে মাইগ্রেনের ব্যথা?
খাবার
চকলেট বা সাইট্রাসযুক্ত ফল, ক্যাফেইন রয়েছে এমন পানীয়, যেমন-চা বা কফি; টাইরামিন, নাইট্রেট বা মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট উপস্থিত রয়েছে এমন খাবার, পুরনো চিজ, অ্যালকোহল এগুলো গ্রহণের ফলে মাইগ্রেনের ব্যথা হতে পারে।
অনিয়মিত আহার
কোনো বেলায় খাবার না খেলে বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে ব্যথার প্রকোপ দেখা দেয়।
আবহাওয়া
প্রচন্ড বাতাস বা ঝড়ের মুখে পড়লে বা অনেক উচ্চতায় গেলে মাইগ্রেনের ব্যথার উদ্রেক হতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক, গর্ভকালীন, ওভুলেশন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণকালীন বা মেনোপজের সময় মাইগ্রেনের ব্যথা অনুভব করেন।
দুশ্চিন্তা
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায়, আকস্মিক কোন দুঃসংবাদ পেলে, উত্তেজনা বা শোকগ্রস্ত হলে ব্রেইন থেকে নানা রকম হরমোন নিঃসৃত হয় যার ফলে রক্তজালিকায় বেশকিছু পরিবর্তন ঘটে এবং ব্যথার সৃষ্টি করে।
সংস্পর্শ
জোরালো আওয়াজ, প্রখর আলো বা তীব্র গন্ধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ব্যথার প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে; অর্থাৎ ব্যথার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
ওষুধ
ভ্যাসোডাইলেটর জাতীয় ঔষধ, যেমন - ক্যাপটোপ্রিল, এনালাপ্রিল, পেরিনডোপ্রিল ইত্যাদি ওষুধও ব্যথার প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।
ঘুম
অতিরিক্ত ঘুম বা অপর্যাপ্ত ঘুমের ফলে ব্যথা হতে পারে।
কাদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের ঝুঁকি বেশি?
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রায় তিনগুন বেশি। বয়স ভেদে সাধারণত ১০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে অধিক হয়ে থাকে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি ৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ৪ জনের পরিবারে কারো না কারো মাইগ্রেন রয়েছে। বাবা-মা দুইজনের মধ্যে যেকোনো একজনের মাইগ্রেন থাকলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৫০ভাগ এবং দুইজনেরই থাকলে সেই সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে।
যাদের ঘুমের সমস্যা, বাই পোলার ডিসঅর্ডার রয়েছে বা বিষন্নতায় ভুগে থাকে তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
নিরাময় নয়, নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
পুরোপুরিভাবে কখনো মাইগ্রেন নিরাময় সম্ভব নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য এই ব্যথার ভয়ানক তীব্রতা খানিকটা বা অবস্থাভেদে পুরোপুরি প্রশমিত করা সম্ভব এবং যেসকল কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা হয় সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। সেইসাথে পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং দুশ্চিন্তা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
ব্যথার সময় অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকলে বা ঘুমালে খানিকটা আরাম পাওয়া যায়। ব্যথা উপশমে চিকিৎসকরা সাধারণত প্যারাসিটামল বা ইব্যুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ঔষধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে যেকোনো ঔষধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
