Loading...
The Financial Express

মহামারীতে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ ডেঙ্গু

| Updated: August 07, 2021 14:55:27


File Photo File Photo

ঢাকার মুগদার বাসিন্দা মেহেদী হাসানের বাবা ও ছোট ভাই দুজনই করোনাভাইরাস থেকে সেরে ওঠার সময়ই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

গের চিকিৎসা বাসায় থেকে হলেও এবার তাদের ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে। কিন্তু ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি থাকায় তাদের জন্য হাসপাতালে শয্যার ব্যবস্থা করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় গণমাধ্যমকর্মী মেহেদীকে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পাঁচ-ছয়টা হাসপাতালে গিয়েও সিট পাইনি। পরে নানাভাবে উপরিমহলে যোগাযোগ করে বিএসএমএমইউতে বাবার জন্য একটা সিট আর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভাইয়ের জন্য একটা সিট ম্যানেজ করি।

“মুগদা এলাকায় অনেক মশার উপদ্রব; ময়লা-আবর্জনা এলাকাজুড়ে। এসব পরিষ্কারের কোনো উদ্যোগও নেই। তাই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের।”

মহামারীর ভয়াবহতম বিস্তারের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ হিসেবে এসেছে ডেঙ্গু জ্বর। সরকারি হিসাবে না থাকলেও নিয়মিতই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর সামনে আসছে।

রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলো কোভিডের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হওয়ায় সেখানে ডেঙ্গু রোগীরা সেবা নিতে পারছেন না। ফলে সেবা পেতে যেমন রোগীদের একাধিক হাসপাতাল ঘুরতে হচ্ছে, তেমনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় চাপ বেড়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার ৪১টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ২০৮ জন নতুন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যাও হাজার ছাড়িয়েছে।

কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত বাবা আবুল কালামকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করান সদ্য বিবিএ উত্তীর্ণ ইউসুফ। ততক্ষণে রোগীর অবস্থা সঙ্গীন। সপ্তাহখানেকের বেশি সময় চিকিৎসা নিয়ে বৃহস্পতিবার তিনি বাসায় ফিরেছেন।

ইউসুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার বাবার রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারে নেমে আসে, পরে ৮ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।

“প্লাটিলেট ১০ হাজারে নামলে তো রোগীকে বাঁচানো যায় না, আমাদের সৌভাগ্য যে বাবা বেঁচে আছেন!”

সুস্থ মানুষের শরীরে রক্তের প্লাটিলেট কাউন্টের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় দেড় লাখ থেকে সাড়ে ৪ চার লাখের মধ্যে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রক্তের প্লাটিলেট কমে যায়; কারও কারও রক্তক্ষরণ হয়।

ইউসুফের ধারণা, তার বাসার পাশে খিলগাঁও বাজারের মাঠে এবার গরুর হাট বসায় সেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে।

তিনি বলেন, “ওখানে অনেক জায়গায় গর্ত করা হয়েছে। কোরবানির সময়ও তো গর্ত করা হয়েছে। ওই গর্তে পানি জমা থেকেই এডিস মশার বিস্তার হতে পারে। আমাদের বাসার পিছনে এখনও পানি জমা আছে।"

গত কয়েকদিন ধরেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে বলে ঢাকার হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের কথা বলে জানা গেছে। ডেঙ্গু সন্দেহে ১০টি মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে আইইডিসিআর।

এবছর শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৪ হাজার ১১৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছেন।

এবছর জানুয়ারিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল চার দশকের ঘরে। আর অগাস্টের প্রথম পাঁচ দিনে প্রায় দেড় হাজার ডেঙ্গু রোগী পেয়েছে হাসপাতালগুলো।

জানুয়ারিতে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, পরের তিন মাসে এ তালিকায় যোগ হন আরও ২৫ জন। মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৩ জন ও জুনে ২৭২ জন।

জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে এক মাসে একলাফে ২ হাজার ২৮৬ জন আক্রান্ত হন। অগাস্টের প্রথম পাঁচ দিনেই একহাজার ৪৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী পেয়েছে হাসপাতালগুলো।

সরকারি হাসপাতালগুলো কোভিড ডেডিকেটেড হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা নিতে যেতে হচ্ছে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে। দেশের সবচেয়ে বেশি ১৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে এখানে।

হাসপাতালটির পরিচালক রশিদ উন নবী জানান, “ঢাকার অধিকাংশ হাসপাতালগুলোই এখন করোনা রোগী ভর্তি। ওইসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী হলেই আমাদের এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেলের মেডিসিন বিভাগ বন্ধ।

“চাপের কারণে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৭৫ বেডের একটি নতুন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।“

মিটফোর্ড হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ১৯৫টি বেড থাকলেও এখন ৫২২ জন রোগী সেখানে ভর্তি রয়েছেন বলে জানান তিনি।

করোনাভাইরাসের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী আসায় যে চাপে পড়তে হচ্ছে, সে কথা জানালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক নজরুল ইসলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সরকার কিছু হাসপাতাল ডেঙ্গু ডেডিকেটেড করে দিয়েছে। তারপরও ডেঙ্গু রোগী আমাদের কাছে আসছে।”

বেসরকারি আদ-দ্বীন হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এই হাসপাতালের পরিচালক নাহিদ ইয়াসমিন।

তিনি বলেন, “প্রতিদিনই আউটডোরে রোগী আসছে। যাদের প্রয়োজন মনে হচ্ছে ভর্তি নিচ্ছি আমরা। প্রতিদিনই রোগী ভর্তি হচ্ছে।”

সচেতন মানুষরা জ্বর হলেই দ্রুত হাসপাতালে চলে আসায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে না বলে জানান নাহিদ ইয়াসমীন।

কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট ডা. আব্দুল ওয়াহাব জানান, বৃহস্পতিবার তাদের হাসপাতালে ৫০ জনেরও বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন।

“প্রতিদিনই ৭-৮ জন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। মাঝবয়সী রোগীই আমরা বেশি পাচ্ছি। অধিকাংশ রোগীর প্লাটিলেট একলাখের নিচে পাই। তাদেরই ভর্তি নিয়ে অবজারভেশনে রাখছি।”

বেসরকারি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন।

এই হাসপাতালের পরিচালক খোরশেদ মজুমদার বলেন, “প্রতিদিনই আমাদের এখানে নতুন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। রোগীদের অনেক চাপ।”

বাংলাদেশে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। সে বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ছাড়ালেও ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটা কম ছিল। গত বছর ১ হাজার ৪০৫ জন রোগী হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নেন।

এবার জুলাইয়ের পর অগাস্টেও গত বছরের তুলনায় বেশি রোগী আসায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ এইডিস মশার বিস্তার রোধে বাধাগুলো জরুরি ভিত্তিতে দূর করার উপর দিয়ে এক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের দুর্বলতাকেই সামনে আনছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, প্রথম বাধা হল, সিটি করপোরেশনে কীটতত্ত্ববিদ নেই। কীটতত্ত্ববিদ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হবে না। শুধু মশক নিধনকর্মী নিয়ে এইডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।

“এখানে রীতিমত এনটোমোলোজি টিম, ইউনিট, এনটোমোলোজির আধুনিক ল্যাবরেটরি থাকা দরকার। তাহলে এরা কোথায় বংশবিস্তার করছে- সবকিছু জানা যেত। এটা কীটতত্ত্ববিদরাই পারে, মশকনিধন কর্মীরা না।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক এই পরিচালক জানান, তারও এক আত্মীয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যখন সুস্থ হচ্ছিলেন, তখনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

বে-নজির বলেন, একে তো করোনাভাইরাস তার ওপর ডেঙ্গু- এটা হচ্ছে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। যারা করোনা ও ডেঙ্গু- দুটাতেই আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের জীবন তো আশঙ্কাজনক হয়ে যাচ্ছে।

“কোভিড নিয়ে আমরা খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। তার উপরে ডেঙ্গু এসে মানুষ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে এমনিই বেড নেই, আইসিইউ নেই, এখানে যদি আবার ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়, তাহলে তো কোনভাবেই ম্যানেজ করা যাবে না।”

গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যালেরিয়া ও এইডিসবাহী রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছিলেন, সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্ণার রাখতে তারা সব হাসপাতালে চিঠি পাঠিয়েছেন।

তবে প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ হিসেবে বর্ণনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র রোবেদ আমিনও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই মুখপাত্র বলেন, "এখন তো কোভিড চলছে। প্রতিটা হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার কীভাবে করবে? এটা তো সহজ হিসাব। করলে নন-কোভিডে করতে হবে। এটা নির্ভর করবে হাসপাতালের সিচুয়েশনের ওপর।”

Share if you like

Filter By Topic