Loading...

মহাবিশ্বে জীবনের অন্বেষণ: ডেকে আনবে কি মহাবিপদ?

| Updated: January 08, 2022 17:54:01


পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মহাকাশ দুরবিন বসানো হয়েছে ভিনগ্রহবাসীদের সাথে যোগাযোগের জন্য  - ছবি: সায়েন্স নিউজ ফর  স্টুডেন্ট পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মহাকাশ দুরবিন বসানো হয়েছে ভিনগ্রহবাসীদের সাথে যোগাযোগের জন্য - ছবি: সায়েন্স নিউজ ফর স্টুডেন্ট

দুনিয়ার জন্য ২০২১ ছিল সমস্যায় ভাজা ভাজা হওয়ার বছর। এসব সমস্যার অন্যতম হলো: বিশ্বমারি, অর্থনৈতিক অবস্থান টলে ওঠা, জলবায়ু পরিবর্তন, ইউক্রেন এবং তাইওয়ান নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা চাগিয়ে ওঠা। কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো একদিন যদি আমাদের এসময়ের দিকে নজর দেই তবে সংকট নিয়ে প্রাসঙ্গিক আর একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হবে। আর এটি হলো, বহির্জীবনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কে কি সত্যিই ভালো কাজের কাতারে ফেলা যাবে?

বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবন বা প্রচলিত কথায় গ্রহান্তরের আগন্তুকদেরকে মহাবিশ্বে আমাদের উপস্থিতি সম্পর্কে আভাস দেওয়ার যে কোনো সফল প্রচেষ্টা পরিণামে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী এবং লেখক মিশিও কাকু। এ দলে আরো অনেকের মধ্যেই একজন তিনি। কাকু গত বছর নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন “এ ধরণের কিছু করা হলে, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি করা হবে বলে আমি মনে করি।”১৬শতকে মন্টেজুমার অ্যাজটেকদের সাথে (স্প্যানিশ অভিযাত্রী) হার্নান কর্টেসের নৃশংস আচরণের কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে উন্নত আন্তঃনাক্ষত্রিক আগন্তুকদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিণাম মানবজাতির জন্য মন্টেজুমার অ্যাজটেকদের মতোই একই ভাগ্যলিপি হয়ে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি মানুষের জন্য কোনো শুভ দৃশ্য হয়ে দেখা দেবে না। “গ্রহান্তরের আগন্তুকরা যদি পৃথিবীতে আসে তবে তাতে কোনো সুন্দর দৃশ্যের অবতারণা হবে না।”মিশিও কাকু আরো বলেন, “একদল মানুষ তাদের দেবতা ভেবে পূজা করবে। আরেকদল তাদেরকে শয়তান হিসেবে গণ্য করবে এবং কিছু লোক তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে।”

বহির্জাগতিক কোনো বুদ্ধিমান আগন্তুকদের সাথে যোগাযোগ করার কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন এমন অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী আছেন। এধরণের যোগাযোগের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নানা প্রচেষ্টায় মগ্ন রয়েছেন এবং এমন সব প্রচেষ্টা বাড়ানোর কাজও করে চলেছেন কেউ কেউ। ১০ বিলিয়ন (এক হাজার কোটি) ডলারের জেমস ওয়েব মহাকাশ দুরবিন সবে মাত্র চালু হয়েছে। এ দুরবিনের অন্যতম লক্ষ্য জীবের বাসযোগ্য, (আমাদের সৌরজগতের বাইরে নক্ষত্র প্রদক্ষিণকারী গ্রহ,) বহির্গ্রহকে খুঁজে বের করা। সে রকম গ্রহে হয়ত আমাদের চেয়ে ভিন্নতর জীবনের খোঁজও পাওয়া যেতে পারে।

কিন্তু বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনের জন্য পরোক্ষভাবে খোঁজ করার তৎপরতা, বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনের অনুসন্ধান (দ্যা সার্চ ফর এক্সট্রাটারেসটিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা) এসইটিআই নামে পরিচিত। এ তৎপরতা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে তেমন কোনো মত পার্থক্য নেই। এর বিপরীত অবস্থানে রয়েছে সক্রিয়ভাবে বহির্জাগতিক বুদ্ধিমান জীবনকে লক্ষ্য করে বার্তা পাঠানোর তৎপরতা, মেসেজিং এক্সট্রাটারেসটিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা, এমইটিআই। তুলনামূলকভাবে এ তৎপরতাকে ঘিরে জমে উঠেছে নানা বিতর্ক।

মহাবিশ্বকে লক্ষ্য করে প্রথম বার্তা পাঠানো হয় ১৯৭৪ সালে। একদল জোত্যির্বিজ্ঞানী আরেসিবো মানমন্দিরের বেতার দুরবিন থেকে বার্তা পাঠান। ২৫,০০০ আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রপুঞ্জ এম১৩কে লক্ষ্য করে এ বার্তা পাঠানো হয়। বার্তার জবাব পাওয়ার জন্য আরো হাজার হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে – সাধারণ হিসাবেই তা বুঝতে কারো দেরি হবে না।

১৯৮৬ সালে যেখানে কথিত ইউএফও দেখা গিয়েছিল, সেখানে গ্রহান্তরের আগন্তক উৎসবে ২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সেখানে তথা আর্জেন্টিনার করডোবাতে গ্রহান্তরের আগন্তুকের কল্পিত পোশাকে এক নারী –ছবি: এপি

২০০১ সালে ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারের একটি শস্য খেতে দুটো শস্যচক্র পাওয়া গেছে। একটি চক্র মানুষের মুখ অপরটি আরসিবো থেকে পাঠানো মূলবার্তার একধরণের আত্তীকরণ বলে ধারণা করা হয়। আর এর মাধ্যমে ‘আরসিবো বার্তার জবাব দেওয়া হয়েছে’বলে একটা কথা রটেছিল। তবে আপনার বিশ্বাসের মাত্রা যদি উপচে পড়ার মতো হয়,  তবে তা আপনি চাইলে বিশ্বাস করতে পারেন!

মহাবিশ্বে অনুসন্ধানী কয়েকটি যান সে থেকে সৌরজগত ছেড়ে মহাবিশ্বের অনন্তের পথে বেরিয়ে গেছে। এরা সবাই একমুখো টিকেট করেছে, এসব যান আর কখনোই সৌরজগতে ফিরবে না। মহাবিশ্বের গোটা ভ্রমণপথে তারা সৌরজগতের পৃথিবী গ্রহে মানুষের অস্তিত্বের কথা প্রচার করতে করতে যাবে। নাসাসহ কয়েকটি মহাকাশ সংস্থা, জ্যোতির্জীববিজ্ঞানের গবেষণায় সহায়তা দিচ্ছে। এসব গবেষণার মধ্য দিয়ে “প্রাণের উৎপত্তি এবং পৃথিবীর বাইরে জীবন”এর অনুসন্ধান তৎপরতা চলছে।

২০১৫ সালের কথা। বহির্জাগতিক সভ্যতার বার্তা পাঠানোকে লক্ষ্য করে সানফ্রান্সিসকোতে প্রতিষ্ঠিত হলো অলাভজনক গবেষণা এবং শিক্ষা সংস্থা এমইটিআই ইন্টারন্যাশনাল। দুই বছর পরে এমইটিআই ১২ আলোকবর্ষ দূরের লালবামন নক্ষত্র লুইটেনকে লক্ষ্য করে একটি বার্তা পাঠায়। তবে কেবল বার্তাই ছিল না। এর মধ্যে জুড়ে দেওয়া হয় গণিতের সূত্র এবং জিন-মিশেলজারের সঙ্গীত।

এমইটি আইইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডগলাস ভাকোচ এভাবে বার্তা পাঠানোর পক্ষে কথা বলতে যেয়ে জানান, গ্রহান্তরের আগন্তুকরা যদি পৃথিবীতে পৌঁছানোর মতো বিশাল দূরত্ব ভ্রমণের পরিশীলিত প্রযুক্তি জ্ঞানের অধিকারী হয় তবে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের কাছে তুলে দেওয়ার মতো কিছুই থাকবে না। আমাদের কোনোকিছুই তাদের প্রয়োজনে আসবে না। অতএব আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বরং শুরু হতে পারে মহাজাগতিক সংলাপ। তিনি আরো বলেন, “ভয় আমাদের রক্ষা করে না, ভয় কেবল আমাদেরকে কোণঠাসাই করবে।”

 মহাবিশ্বে বার্তা পাঠানোর জন্য জেফ হকিন্স তাঁর বই এ থাউজেন্ড ব্রেইনসে একটি চমকপ্রদ পদ্ধতির কথা বলেছেন। আলো আটকে দিতে পারে এমন বিশাল বিশাল বস্তু সূর্যকে ঘিরে প্রদক্ষিণেরে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে সূর্যের আলো পুরোপুরি আটকে যাবে না। কিন্তু কমে যাবে। অস্বাভাবিকভাবেই এই আলো কমে যাওয়ার বিষয়টা মহাজগতের বহুদূর থেকে প্রত্যক্ষ করা যাবে। এসব বস্তু কোটি কোটি বছর ধরে সূর্যকে ঘিরে ঘুরপাক খাবে। অতীতে বোতলে বার্তাপুরে সাগরে ভাসান হতো। সূর্যের আলো আটকে বা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও সেই বোতলে করে বার্তা পাঠানোর মতোই ঘটবে। এর মাধ্যমে আমাদের গোটা ছায়াপথে বার্তা দেওয়া যাবে।

নাসার জেমস ওয়েব মহাকাশ দুরবিন

গ্রহান্তরের আগন্তুকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার এমন সব প্রচেষ্টা গভীর প্রশ্নেরও সৃষ্টি করেছে। প্রথমত, আমাদের গ্রহের পক্ষ থেকে কথা বলার অধিকার রয়েছে কার? মহাবিশ্বে আমরা কী বার্তা পাঠাবো? টরেন্টোর ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী ক্যাথরিন ডেনিং আরেকটি প্রশ্ন তুলেছেন: কেন বিজ্ঞান বিশারদরা গ্রহের ঝুঁকি সহনশীলতার মাত্রা একতরফাভাবে নির্ধারণ করবেন? উদাহরণ হিসেবে তিনিবলেন, নামিবিয়ার ছয় বছর বয়সী একটি মেয়ে এসব বিজ্ঞানবিশারদদের চেয়ে দীর্ঘজীবী হবে এবং গ্রহান্তরের আগন্তুকরা কোনো ঝুঁকি হয়ে দেখা দিলে তাতে আয়েসি জীবনে অভ্যস্তদের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে এ মেয়েটিই।

এসব প্রশ্ন যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছে তা হলো, বহির্জাগিতক বুদ্ধিমত্তাদের ঘিরে যে বিতর্কের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে এমইটিআই-এর তৎপরতাকে ঘিরে। একে অতিবিরল বৈজ্ঞানিক বিতর্ক হিসেবেও ধরা যেতে পারে। এ বিতর্কে  কোনো পক্ষই নিজ নিজ যুক্তির সমর্থনে এক টুকরা সাক্ষ্যপ্রমাণও হাজির করতে পারবে না। আলোচনাটি পুরোই অনুমাননির্ভর। উদ্বেগসৃষ্টিকারী বিজ্ঞান-কল্পের ভিত্তিতে এটি গড়ে উঠেছে। আবেগ সর্বস্ব, মানবতার সার্বজনীনতায় আবছায়া বিশ্বাস এবং বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান এমন (সম্ভবতমিথ্যা) ধারণা নির্ভর।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে: আবিষ্কারের জন্য মানবতার সম্মিলিত ইচ্ছা কি অজানা ভয়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী? এমন প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মানব ইতিহাসে বহু শতাব্দী ধরে এর একটিই স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়েছে আর সেটি হলো হ্যাঁ।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

Share if you like

Filter By Topic