পরপর পাঁচটি চলচ্চিত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে বক্স অফিসে। সবাই ফ্লপমাস্টার বলে হাসি তামাশা করেন। ২৪ না পেরোতেই সংসার জীবনে প্রবেশ করায় সচল রাখতে চাকরি আর অভিনয় একসাথেই করেন। কিন্তু অভিনয়ের নেশা অস্থি মজ্জায়। একটা রোলের জন্য ছোটেন চলচ্চিত্র পাড়ার দুয়ারে দুয়ারে।
তবে অভিনেতা পাহাড়ী স্যান্নাল জহুরী হয়ে জহর চিনতে ভুল করেননি। ব্যর্থতার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছাবার আগে নাম বদলে অরুণ কুমার চ্যাটার্জী থেকে উত্তম কুমার করে দেন তিনিই। সুযোগ করে দেন নির্মল দের বসু পরিবার সিনেমাতে। এরপর একে একে অসংখ্য হিট চলচ্চিত্র দিয়ে বাংলার মানুষের মনে মহানায়ক হয়ে ওঠেন উত্তম কুমার।
১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হয়, সে বছরই উত্তম কুমার মায়াডোর ছবিতে অভিনয় করলেন। কিন্তু সেই ছবিতে তিনি শুধুমাত্র একজন এক্সট্রা। তবে বসু পরিবার হিট হওয়ার পর আর ঘুরে তাকাননি। বাংলা সিনেমার আইডল মৃত্যুর ৪৩ বছর পর এসেও কোলকাতার চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন এখনো উত্তম কুমার।
তবে জীবন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক নেহায়েত কম হয়নি। ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই উৎরাইয়ের সাথে জড়িয়ে ছিলো বেশ কিছু অজানা ঘটনা। ছিলো চলচ্চিত্রের পেছনের গল্পও।
অগ্নিপরীক্ষা কাণ্ড
১৯৫৪ সালে উত্তম-সুচিত্রা জুটির অগ্নিপরীক্ষা ছবিটি সেসময় সুপারহিট হয়। একইসাথে প্রকাশ্যে আসা অগ্নিপরীক্ষা সিনেমার পোস্টারে লেখা কয়টি লাইন ও ছবি বিতর্ক তৈরি করেছিল। ক্যাপশনে লেখা ছিল, অগ্নিপরীক্ষা: চিরন্তন ভালোবাসার সাক্ষী সাথে উত্তম-সুচিত্রার রোমন্থনের স্থিরচিত্র।
শোনা যায়, এই পোস্টারের ক্যাপশনটি উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরীদেবী এবং সুচিত্রা সেনের স্বামী দিবানাথ সেন মোটেও ভালো চোখে নেননি। উত্তম-সুচিত্রার প্রেম নিয়েও নানা গুঞ্জনের শুরু এখান থেকেই। তবে তা অবশ্য প্রযোজকদের জন্য লাভজনক ব্যাপারই হয়ে উঠেছিল।
রবার্ট ব্রুস নামকরণ
অরুণ কুমার, অরূপ কুমারের যুগ পেরিয়ে ১৯৫৪ সালে শুরু হল উত্তমযুগ। তার এই টানা ব্যর্থ্যতার পর সাড়ে চুয়াত্তর দিয়ে বিপুল সাড়া ফেলা পর্যন্ত এই দৃঢ় সংকল্পচেতা হওয়ার কারণে সে সময়ে গণমাধ্যম তাকে বাংলার রবার্ট ব্রুস হিসেবে নামকরণ করেন।
প্রযোজক, পরিচালক এবং সুরকার উত্তম
অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রের অন্যান্য অনুসঙ্গেও সমান বিচরণ করেছেন মহানায়ক। পরিচালনা করেছেন পাঁচটি ছবি, সুরারোপ করেছেন দুটিতে আর প্রযোজনা করেছেন আরো সাতটি ছবি। সঙ্গীতপ্রেমী উত্তম কাল তুমি আলেয়া ছবির সবগুলো গানের সুরারোপ করেন। ছবিটি ১৯৬৬ সালে মুক্তি পায়। আবার একইসাথে শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রস্তাব পেলে মঞ্চে অভিনয় করেছেন।
সত্যজিৎ রায়ের প্রস্তাবে না
বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় নাম সত্যজিৎ রায়ের একটি প্রস্তাবের অপেক্ষায় যখন গোটা কোলকাতার শিল্পী সমাজ, তখন না করেন উত্তম কুমার। যদিও তিনি আগেই চিড়িয়াখানা ও নায়ক চলচ্চিত্রে সত্যজিতের নির্দেশনায় কাজ করেন। পরিচালক তার ঘরে বাইরে ছবিতেও উত্তম কুমারকে সন্দীপের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। তবে তার চরিত্রটি খলনায়কের চরিত্র হওয়ায় উত্তম কুমার এই ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। পরে এই চরিত্রে দেখা গিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে।
সপ্তপদীর বিড়ম্বনা
১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত সপ্তপদী ছবিটি এখনও বহু সিনেমাপ্রেমীর মনে গাঁথা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এই ছবিতে উত্তম-সুচিত্রা বাইকে করে গান গাইতে গাইতে যাওয়ার দৃশ্যটি চিরন্তন একটি রোমন্থন দৃশ্য বললেও ভুল হয় না। এই পথ যদি না শেষ হয় তো বাঙালির প্রেমকে আরো মধুর করে তুলেছে পরবর্তীতে। এক ব্রাহ্মণ যুবকের সঙ্গে খ্রিস্টান যুবতীর প্রেম দেখানো হয়। এজন্য ষড়যন্ত্র করে এই ছবির শ্যুটিং বন্ধ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
উত্তম ছাট এবং স্টাইল
উত্তম কুমারের হেয়ার স্টাইলের কদর ছিল ব্যাপক। সেই সাথে তার শার্টের কলার কেমন ধাঁচের, তার স্যুটের কাট সবই অনুকরণ করতেন তার অনুগামী ভক্তেরা। কোলকাতায় সেলুনে সেলুনে পাওয়া যেত 'উত্তম ছাটে'র বিজ্ঞাপন। এমনকি ঠোঁটের কোণে সিগারেট ধরানো অথবা গভীর চোখে প্রেমিকার দিকে তাকানো পর্যন্ত অভ্যাস করতেন বাঙালি যুবকেরা।
উত্তম সুপ্রিয়া শেষ জীবন
ঘরভাঙা ভালোবাসা উত্তমকুমারকে অন্য ঘর গড়ে দিয়েছিল। কথায় কথায় স্ত্রী গৌরী দেবীর সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছিলেন। বোঝাতেও চেয়েছিলেন, তবে পারেননি। এজন্য ১৯৬৩ সালে সম্পর্কের টানপোড়ন থেকে মুক্ত করে পরিবার ছেড়ে উত্তম কুমার সুপ্রিয়া দেবীর ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠেন।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মৃত্যুর আগে জীবনের শেষ সতেরো বছর উত্তম কুমার সুপ্রিয়া দেবীর সাথেই কাটান। উত্তম নিজেই আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, সুপ্রিয়া দেবীর সাহচর্যে তিনি ধীরে ধীরে সব যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠছিলেন। কীভাবে সুপ্রিয়া দেবীর আশ্রয় তাকে শান্তির খোঁজ দিয়েছিল। তবে একটা কথা উল্লেখ করতে ভোলেননি উত্তম কুমার, তিনি সুপ্রিয়া দেবীকে ঠকাতে চাননি কখনো।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
anmrifat14@gmail.com