মমতাজ বেগম: ভাষা আন্দোলন করে যিনি সব হারিয়েছিলেন


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: February 19, 2022 13:08:34 | Updated: February 19, 2022 18:38:58


মমতাজ বেগম: ভাষা আন্দোলন করে যিনি সব হারিয়েছিলেন

১৯৫২ সালের মার্চ মাস। পাকিস্তান সিভিল সাপ্লাই সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নাফ জেলখানায় এসেছেন তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগমের সাথে দেখা করতে। মমতাজ নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে জেলে। কারণ আর কিছুই নয় - ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করা ও নেতৃত্বদান।

আ. মান্নাফ স্ত্রীকে বললেন বন্ডসাইন দিয়ে মুক্তি নিয়ে নিতে। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় স্ত্রীর এই সংশ্লিষ্টতা তাঁর পেশাগত ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে তাঁর ধারণা ছিলো।

তিনি উচ্চাভিলাষী মানুষ ছিলেন। তাই পেশাগত চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়ে স্ত্রীকে দিয়ে গেলেন আল্টিমেটাম - 'তিনদিনের ভেতর মুচলেকা দিয়ে মুক্তি।'

প্রখর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মমতাজ তা মেনে নেননি। যে ভাষার অধিকারের জন্য ঢাকায় রক্ত ঝরেছে, সেই ভাষার জন্য আন্দোলন করে তিনি মুচলেকা দেবেন - এমনটা তিনি করতে পারতেন না। মমতাজ বেগম জেলেই রয়ে গেলেন। বিনিময়ে পেলেন স্বামীর কাছ থেকে তালাকনামা। হারাতে হলো চাকরিও।

এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক।

মমতাজ বেগমের নিজের বেড়ে ওঠাটাও ছিলো অনেকটা প্রতিকূল পরিবেশে। তাঁর জন্ম নাম কল্যাণী রায়চৌধুরী, ডাকনাম মিনু। বাবা খান বাহাদুর মহিম চন্দ্র রায় ছিলেন কোলকাতা হাই কোর্টের জজ। মা মাখনমতি দেবী ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশীর বোন।

১৯৫১ সালে বিএড সম্পন্ন করেন তিনি। স্কুলে যোগদানের পর থেকেই দক্ষ শিক্ষয়িত্রী হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় মর্গ্যান স্কুলের কাছে রহমতুল্লাহ ইন্সটিটিউটে আওয়ামী মুসলিম লীগের এক বিরাট জনসভার আয়োজন করা হয়। সভাপতি ছিলেন আবুল হাশিম।

মমতাজ তাঁর স্কুলের প্রায় তিনশ ছাত্রীকে নিয়ে মিছিল করে সেখানে উপস্থিত হন। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এমনকি তিনি আদমজী জুটমিলের শ্রমিকদেরও নিয়ে এসেছিলেন এই সভায়৷

পুলিশের গুলিতে ঢাকায় ছাত্রমৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জে দাবানলের মত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মমতাজ বেগমের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের মাঝেও আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৫২ এর ২৮ ফেব্রুয়ারি মমতাজ বেগমকে পুলিশ গ্রেফতার করে। খবর ছড়িয়ে গেলে উত্তেজিত জনতা দলে দলে বেরিয়ে এসে থানা ঘেরাও করে। পুলিশের গাড়ি চাষাড়া পর্যন্ত আসতেই জনতার প্রবল প্রতিরোধে ঢাকায় তাঁকে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপে শতাধিক ব্যক্তি আহত ও বহুসংখ্যক গ্রেপ্তার হন।

উত্তেজিত জনতা চাষাড়া থেকে পাগলা পর্যন্ত দেড়শ-র বেশি গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশের গাড়ি তাঁকে নিয়ে ঢাকায় যায়।

এরপর মুচলেকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি থেকে গেলেন জেলে৷ তবে এক-দুইদিন নয়। একবছরেরও বেশি সময়। ১৯৫৩ এর মে মাসে তিনি জেল থেকে মুক্ত হন।

তবে ততদিনে শরীর ভেঙে গেছে তার। একবার স্ট্রোক হয়েছে। স্বামী তাকে তালাক দিয়েছেন, নিয়ে গেছেন একমাত্র মেয়েকে। চাকরিও হারিয়েছেন। ধর্ম পরিবর্তনের কারণে বাবা-মায়ের সাথেও আর সম্পর্ক নেই।

কারামুক্ত মমতাজ কলকাতা বা হাওড়া ফিরে যাননি, থেকে গেলেন পূর্ব পাকিস্তানেই । যোগ দিলেন মিউনিসিপ্যালিটি স্কুলের পরিদর্শক হিসেবে। এরপর আনন্দময়ী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। কিছুদিন আহমেদ বাওয়ানী একাডেমীতে শিক্ষকতা করেন।

পরে শিশু ও নারীদের ভেতর শিক্ষা বিস্তারের প্রত্যয় নিয়ে গড়ে তোলেন কিন্ডারগার্টেন স্কুল শিশু নিকেতন। নিজের মেয়েকে হারানোর শোক মমতাজের ভেতর সবসময় ছিল। তাই অন্য শিশুদের ভেতর হয়তো খুঁজে পেতে চাইতেন মেয়েকে।

১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ তৃতীয়বারের মত স্ট্রোক করেন তিনি। ঘটনাচক্তে সেদিন তাঁর মেয়ের সাথে তাঁর দেখা হয়েছিলো। বিগত ১৫ বছরের ভেতর প্রথম ও শেষবারের মতো।

তখন তিনি অন্তিম শয্যায়। তার ধারণা ছিলো একদিন দেশ স্বাধীন হবে। মেয়েকে বলেছিলেন, "আমি দেখে যেতে পারলাম না, তোরা স্বাধীন দেশ দেখবি।" এর কিছুক্ষণের মাঝেই তিনি মারা যান।

মমতাজ বেগম এমন একজন নারী, ভাষার জন্য যিনি তাঁর স্বামী-সন্তান-চাকরি সব হারিয়েছেন, তবু আত্মসন্মানের জায়গায় একবিন্দু ছাড় দেননি।

নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন ভাষার দাবিতে আত্মত্যাগীদের জন্য, শিক্ষার ফুল ফোটাতে অকাতরে কাজ করেছেন আমৃত্যু।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like