Loading...
The Financial Express

মধুমাসের মধুর ফল

| Updated: May 10, 2021 22:33:14


মধুমাসের মধুর ফল

ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে ঋতুরাজ বসন্তের পরেই আগমন ঘটে গ্রীষ্মকালের। গ্রীষ্মের তাপদাহ জনমনে কিছুটা অস্বস্তি সৃষ্টি করলেও এ সময়ের সুমিষ্ট সব ফলের স্বাদ বাঙালি মনে তৈরি করে পরম তৃপ্তির আবহ। বাহারি সব ফলের ডালা সাজিয়ে জৈষ্ঠ্য বাঙালির কাছে হয়ে উঠে এক মধুমাস।

আবহাওয়াগত কারণেই বাংলাদেশের মাটি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। যার কারনে প্রায় সারা বছরই এদেশে কোনো না কোনো ফল পাওয়া যায়। তবে জৈষ্ঠ্য মাস এক্ষেত্রে বেশ প্রসিদ্ধ। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে এইসময় গাছে থাকা ফল পাকতে শুরু করে। আর এইসব ফল খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিগুণেও অনন্য।

আম

জৈষ্ঠ্যের ফলগুলোর মধ্যে যে ফলটির কথা প্রথমেই আমাদের মাথায় আসে, সেটি বোধহয় আম। অত্যন্ত রসালো ও সুস্বাদু হওয়ার কারণে একে ফলের রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো এই ফলটির আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ জাতের আম রয়েছে। এর মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরসা, আম্রপালি, কালীভোগ, হিমসাগর ইত্যাদি জাত বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। খুব

বেশি যত্নের দরকার হয় না বলে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র এই ফলগাছ দেখা যায়। শীতের শেষে গাছে মুকুল আসে এবং এরপর সে মুকুল থেকেই ফলের গুটি বের হয়। আর জৈষ্ঠ্যের শুরু থেকেই শুরু হয় আমপাকা।

সর্বত্র পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া আম দিয়ে তৈরি হয় নানান মুখরোচক খাবার। এর মধ্যে কাঁচা আমের আচার বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও আমের তৈরী মোরব্বা, জুস, কেক ও হরেক রকমের প্রক্রিয়াজাত খাবার রয়েছে। স্বাদ ও পুষ্টির পাশাপাশি এ ফলের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ। আয়ুর্বেদ ও ইউনানী চিকিৎসায় এ ফলের বহুল ব্যবহার রয়েছে। এছাড়াও জ্বর, আমাশয়, ও বুকের ব্যাথার চিকিৎসাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।

কাঁঠাল

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাদেশ ছাড়াও এটি শ্রীলংকার জাতীয় ফল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমের মতো এটিও বাংলাদেশের সর্বত্র জন্মে। খেতে খুব মিষ্টি এবং সুস্বাদু এ ফল। বৈশাখের শেষ দিক হতেই এটি বাজারে পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে পাহাড়ি অঞ্চলের কাঁঠাল বাংলাদেশে বেশ প্রসিদ্ধ। কাঁঠালের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। পাকা কাঁঠালের পাশাপাশি কাঁচা কাঁঠাল রান্না করে খাওয়া যায়, যা এঁচোড় নামে পরিচিত। এছাড়া পাকা কাঁঠালের বীজ রান্না করে খাওয়া যায়।

এ ফলের বিভিন্ন ধরনের জাত থাকলেও ‘গালা’ ও ‘খাজা’ নামের দুটি জাত বেশি দেখা যায়। বর্তমানে কাঁঠাল দিয়ে নানারকম প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরি করা হয়। এছাড়া ঘরোয়াভাবেও কাঁঠালের তৈরী পিঠা ও কাস্টার্ডও বেশ জনপ্রিয়। শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, বরং ওষধি গুণাগুণেও কাঁঠালের রয়েছে দারুণ সব ক্ষমতা। বদহজম, আলসার, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রোগ উপশমে কাঁঠাল বেশ উপকারী। কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পুষ্টি উপাদান যা দেহ গঠন ও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

জাম

জাম বাংলাদেশের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফল। খেতে অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু এই ফলটি পাকতে শুরু করে জৈষ্ঠ্যের শেষদিকে। খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না বলে গ্রামগঞ্জের সর্বত্র এই ফলের গাছ দেখা যায়। ইংরেজি মে মাসের শেষ নাগাদ বাজারের সর্বত্রই এ ফল পাওয়া যায়। তবে এটি খুব বেশিদিন সংরক্ষণ করা কষ্টকর। বাংলাদেশে জামের বিভিন্ন প্রজাতি রয়েছে। ওষধি গুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় ইউনানী ও চৈনিক চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও হজমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, মাড়ির প্রদাহ ইত্যাদি চিকিৎসায় জামের ছাল ও পাতা বেশ প্রসিদ্ধ।

লিচু

গ্রীষ্মকালীন ফলগুলোর মধ্যে যে ফলটির জন্য কিছুটা যত্ন করতে হয়, সেটি হচ্ছে লিচু। এই ফলটিও জৈষ্ঠ্য মাসে পাকে। খেতে কিছুটা টক-মিষ্টি স্বাদযুক্ত ফলটি মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। আর রসালো ফল হওয়াতে গরমে এর চাহিদাও থাকে বেশি। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ লিচু চাষের জন্য বিখ্যাত। লিচু দিয়ে বর্তমানে জুসসহ আরো নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরি করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা ভিটামিন ‘সি-এর অভাবে ভুগছে, তাদের জন্য লিচু বেশ উপকারী।

আনারস

সর্বত্র চাষ হলেও পাহাড়ি এলাকা আনারস উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। বৈশাখ মাসের শেষ দিক হতে এই ফল পাকতে শুরু করে। খেতে খুবই মিষ্টি এবং সুস্বাদু। এর জন্মস্থান হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকাকে ধরা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতে এর প্রচুর উৎপাদন হয়। ওজন নিয়ন্ত্রণ, হাড় গঠন, দাঁত ও মাড়ি সুরক্ষা এবং চোখের দৃষ্টি ঠিক রাখার ক্ষেত্রে আনারস বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে।  এছাড়াও আনারসে কম পরিমাণ ফ্যাট ও প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফাইবার ও ভিটামিন সি থাকাতে এটি দেহের জন্য খুবই উপকারী। আবার ভাইরাসজনিত রোগ ও সর্দি-কাশি সারাতেও আনারসের ভূমিকা রয়েছে।

তরমুজ

বৈশাখ মাস তরমুজের জন্য বিখ্যাত হলেও প্রায় পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়েই এটি পাওয়া যায়। অত্যন্ত রসালো হওয়াতে এটি গরমে পানির চাহিদা পূরণ করে। এছাড়া তরমুজের জুসও বেশ জনপ্রিয় পানীয়। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এর অত্যধিক চাষ হয়। এ ফলের মধ্যে ৬% চিনি, ৯২% পানি, এবং ২% অন্যান্য উপাদান থাকে। শরীরের জন্যও এটি বেশ উপকারি একটি ফল। হৃদরোগ, টাইফয়েড, এবং উচ্চরক্তচাপ রোধে তরমুজ খুব উপকারী। চোখ ভালো রাখতেও এই ফল সাহায্য করে।

উৎসবপ্রিয় বাঙালিরা বছরের এই সময়টাকে কেন্দ্র করে আয়োজন করে নানা উৎসবের। এর মধ্যে জামাই ষষ্ঠী অন্যতম। জৈষ্ঠ্যে যখন নানা ধরনের মৌসুমী ফলে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে, ঠিক সে সময়ই অনুষ্ঠিত হয় এ উৎসব। জৈষ্ঠ্য মাসে জামাইকে শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ফল দিয়ে আয়োজন করা হয় এ উৎসবের। ফল ছাড়াও এই অনুষ্ঠান আয়োজনে থাকে মিষ্টি ও বিভিন্ন স্বাদের মুখরোচক সব রান্না।

উৎসবটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হয়ে আসছে। এছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই মধুমাসটিকে পরম যত্নে বরণ করে নেয়। অতিথিদের দাওয়াত দেওয়া, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে উপহার হিসেবে ফল পাঠানোসহ মানুষের মধ্যে নানা আয়োজন দেখা যায় বছরের মধুমাস খ্যাত এই সময়টিতে।

লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

tanjimhasan001@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic