কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে প্রথমেই মাথায় আসে কোন বিষয়টি? কোন কোন জিনিস সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে এরকম অনেক ভাবনাই হয়তো জট পাকায় তখন। তবে এই সবকিছুই অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি সেই ভ্রমণের বাজেট ঠিক ভাবে না করা হয়।
কীভাবে হিসেব করবেন খরচের খাত, কোথায় টাকা বেশি ব্যয় করবেন, কোথায় করবেন কম - এরকম সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার লক্ষ্য নিয়েই এই লেখা।
পরিবহন ব্যবস্থা
বেশিরভাগ ভ্রমণের উল্লেখযোগ্য অর্থ খরচ হয় পরিবহন খাতে। বাস, লঞ্চ, ট্রেন মূলত এই তিনটিই ভ্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত যান।
চাঁদপুর, বরিশাল, কুয়াকাটার জন্য লঞ্চ; সিলেট, উত্তরাঞ্চল কিংবা দেশের বাইরে কোলকাতায় হলে ট্রেন বা বাস। এছাড়া কমবেশি সবখানেই বাসে যাওয়া যায়।
অন্তু দাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিনি কয়েকদিন আগেই বান্দরবান ঘুরে এসেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি দেশজুড়ে বিশের অধিক জায়গায় ভ্রমণ করেছেন।
.jpg)
বান্দরবানের যোগী হাফং এ অন্তু দাস, ২০২২ এ তোলা ছবি
অন্তু তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, "পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরতে গেলে ‘চাঁদের গাড়ি’ ভাড়া নিতে হয়। এখানে ভ্রমণকারী যত বেশি হবে জনপ্রতি ভাড়া তত কমে যাবে।"
তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ভালো বাস কিংবা লঞ্চ নির্বাচন করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, "যেসব বাস বেপরোয়াভাবে, অতিরিক্ত গতিতে হাইওয়েতে চলে সেগুলো পরিহার করাই ভালো। লঞ্চের ক্ষেত্রে ফিটনেসহীন লঞ্চ কখনোই যাওয়া উচিত নয়।"
থাকবেন কোথায়?
গন্তব্যে পৌঁছে গেলেন, এখন থাকবেন কোথায়? খরচের হিসেব এই খাতেও কমানো যায়। 'টপ ভিউ প্রোডাকশন' নামে একটি প্রোডাকশন হাউজের প্রতিষ্ঠাতা তামজিদ হোসেন। তিনি তার কাজ এবং শখের বসে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান, তৈরি করেন ট্রাভেল ভ্লগ।
হোটেলের ব্যাপারে তামজিদ উদাহরণ দিলেন কক্সবাজারের। তিনি বলেন, "কক্সবাজারে মোটামুটি সব খরচেই হোটেল পাওয়া যায়। এর মধ্যে আপনি যতটুকু সুবিধা না হলেই নয় সেটুকু পেলেই কম খরচে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে নিতে পারেন।"
থাকার জায়গা নির্বাচন প্রসঙ্গে হিবা শেহরিন বিনতে মাহমুদ গুরুত্ব দিলেন পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সুস্বাস্থ্যের ওপর।
তিনি বলেন, "আমিও কম খরচে ভ্রমণ করতে পছন্দ করি, তবে দুটি বিষয় আমি মাথায় রাখি। প্রথমত নিরাপত্তা এবং দ্বিতীয়ত পরিস্কার টয়লেট। এই দুটি বিষয় খেয়াল রেখেই হোটেল খরচে কাটছাঁট করি।"
.jpg)
হিবা শেহরিন বিনতে মাহমুদ
হিবা একজন সনদপ্রাপ্ত পর্বতারোহী। দেশ বিদেশে ঘুরাঘুরির পাশাপাশি ‘স্কলারস জোন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাউন্সিলর হিসেবে আছেন তিনি।
কতজন নিয়ে ভ্রমণ করবেন?
মোঃ রাকিব হুসাইন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যন্ড ইনফোরম্যাটিক্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি ছুটি পেলে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। নেত্রকোনা, চাঁদপুর এবং বান্দরবানে গিয়েছেন তিনি।
তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী একা ভ্রমণের জন্য চাঁদপুর, সিলেট এসব জায়গা বেশ ভালো। কারণ এসব জায়গায় কম খরচে একজনেই গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে পারবেন। সমস্যা হয় যেখানে একাধিক সিটের গাড়ি ভাড়া করতে হয়।
তিনি বলেন, "একটি নৌকা ভাড়া কিংবা চাঁদের গাড়ি ভাড়া করার জন্য দশ - বারোজন সঙ্গী থাকলে ভাড়া কমে যায়। ৮ হাজার টাকা ভাড়ার ১৬ জনে, জনপ্রতি পাঁচশ টাকায় হয়ে যায়।"
শুধু পরিবহন নয়, গন্তব্য এবং হোটেল খরচও ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ার সাথে কমে যায়। বাজেট কম হলে বেশি লোক নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন রাকিব।
খাবার
খাবারে চাইলেই অনেক টাকা বাঁচানো যায়। ট্রেকিংয়ের মতো যেকোনো পরিশ্রমী ট্যুরের জন্য বিরিয়ানির মতো ব্যয়বহুল খাবার প্রযোজ্য নয়।
নুঝাত ফারহানা প্রেক্ষা বলেন "আয়ের সাথে সামঞ্জস্যতা দরকার। বাজেট কম হলে তিন বেলার পরিবর্তে দুই বেলা খেয়েও খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে।"
.jpg)
বান্দরবানের আফিয়াখুমে দাঁড়িয়ে ক্যামেরাবন্দী নুঝাত ফারহানা প্রেক্ষা
নুঝাত একজন ভ্রমণপিপাসু, সুযোগ পেলেই ঘুরতে পছন্দ করেন। তিনি বর্তমানে ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ে কো-কারিকুলার সহযোগী হিসেবে কর্মরত।
নুঝাতের মতো খাবারের পরিমাণের পাশাপাশি কী ধরনের খাবার খাওয়া যেতে পারে এই বিষয়ে যোগ করেন অন্তু। তিনি বলেন, "ট্রেকিংয়ের মতো ভ্রমণ হলে শুকনো খাবার, ফল এসব নিয়ে যাওয়া ভালো। স্থানীয় খাবারগুলোর খরচ কম।"
খাবারে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হিবার কাছেও নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, "আমি মনে করি দলগতভাবে ট্যুরে গেলে মূল খাবারগুলো খরচের ভিতর চলে আসে। তখন সবার আওতার মধ্যেই হয়ে যায়।"
অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ
অনাকাঙ্ক্ষিত খরচের জন্য অবশ্যই কিছু টাকা রাখা উচিত বলে মনে করেন অন্তু। যেকোনো পরিস্থিতিতে এই টাকা কাজে লাগবে।
তুলনামূলক গুরুত্ব বিচার
পরিবহন, থাকার জায়গা, খাবার ভ্রমণের খরচ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এগুলো নির্দিষ্ট কিছু খাত। প্রতিটি খাতেই চাইলে খরচ কমানো বা ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
রাকিবের মতে, আরামপ্রিয় ব্যক্তি হলে পরিবহন ও আবাসনে বেশি খরচ করে খাবারের খাতে খরচ কমানো যেতে পারে। অথবা বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মতো ট্রেকিংবান্ধব জায়গাগুলোতে তিনি না গিয়ে কক্সবাজার বা সিলেট ঘুরে আসতে পারেন।
হিবা যেহেতু একজন মাউন্টেইনার, তিনি ট্রেকিংয়ের উদাহারণ দিয়ে বলেন, "পূর্ব প্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তুতি ভালো হলে পরিবহন, খাবার এসবের পরিবর্তে ভালো জুতা, ব্যাগ এবং অন্যান্য অপরিহার্য জিনিসে খরচ বাড়ানো যাবে।"
তিনি আরো বলেন, "নিজের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য সবচেয়ে অপরিহার্য। তাই এসব বিষয়ে কাটতি করে ঝুঁকি নেয়া উচিত নয়।"
দূরে কিংবা কাছে, দলগত কিংবা একা - এই ভ্রমণপিপাসুদের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে ভ্রমণ সংক্রান্ত খরচের নানা দিক। কেউ গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্যের দিকে, কেউ আবার সার্বিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এঁকেছেন খরচের ছক। প্রতিটি খাতেই নিজের সুবিধা, দুর্বলতা এসব কিছু বিবেচনা ভ্রমণে বাজেট করা যেতে পারে।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
imran.tweets@gmail.com
