ভোজ্যতেলের রকমফের


শুভদীপ বিশ্বাস | Published: August 12, 2021 10:47:12 | Updated: August 12, 2021 16:37:47


ছবি - সংগৃহীত

ইদানিং দুরকম বাঙালি দেখা যায়। একদল খেতে বসলে রাঁধুনীকে বলেন, এত কম তেলে রান্না করলে কি স্বাদ পাওয়া যায় নাকি? কাল থেকে বেশি করে তেল দিয়ে রান্না করতে হবে। আবার আরেকদল আছেন, যারা বলেন, এত তেল চুপচুপে করে রান্না করেছো কেন? আরও কম তেলে রান্না করা শিখতে হবে।

হ্যাঁ, পরিমাণ কমানো কিংবা বাড়ানোর কথা বলেন সবাই, কিন্তু তেল বাদ দিয়ে খাবার রান্নার কথা? নৈব নৈব চ! আলুসেদ্ধ থেকে শুরু করে খাসির রেজালা, তেল বাঙালির লাগবেই। আজকের এ লেখায় আলাপ হবে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানান রকম ভোজ্যতেল নিয়ে।

নারিকেল তেল

আমাদের অতি পরিচিত মাথার চুলে পুষ্টি যোগানো নারিকেল তেল আসলে ভোজ্যতেল হিসেবেই প্রাথমিকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেসকল অঞ্চল মূলত নারিকেল গাছ প্রধান, সেসব স্থানে ভোজ্যতেল হিসেবে নারিকেল তেল বেশি প্রচলিত। যেমন, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকা, পলিনেশিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের রান্নায় নারিকেল তেলের বিবিধ ব্যবহার রয়েছে।

প্রায় চার হাজার বছর আগেও নারিকেল তেলের ব্যবহারের কথা খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, পনেরোশো খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে সংস্কৃত ভাষায় লেখা আয়ুর্বেদগ্রন্থে শরীর, মন ও আত্মার কার্যতঃ সকল অংশে নারিকেল তেল ব্যবহারের উপদেশ পাওয়া যায়। ইউরোপিয়ান নাবিক ক্যাপ্টেন কুকও তাঁর অভিযানের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপবাসীদের ভোজ্য তেল হিসেবে নারিকেল তেলের একচেটিয়া ব্যবহার লক্ষ করেছিলেন।

ভোজ্যতেল হিসেবে নারিকেল তেলের বেশ কিছু উপকারী দিক রয়েছে। নারিকেল তেলে যে ফ্যাট রয়েছে, তা অন্যান্য ফ্যাটের চেয়ে তাড়াতাড়ি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এতে করে শরীরের বিপাকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ক্ষুধা দমন হয় ও ওজন কমানো সহজ হয়। তবে অতিরিক্ত নারিকেল তেল ব্যবহারে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্ভাবনা ও বৃদ্ধি পায়।

এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল

জলপাই বা জয়তুন তেল নামেও পরিচিত এ তেল আমাদের অঞ্চলে ভোজ্যতেলের চেয়ে প্রসাধনী হিসেবেই বেশি পরিচিত। ভোজ্যতেল হিসেবে পৃথিবীতে উৎপাদিত অলিভ অয়েলের অর্ধেকই উৎপাদন করে থাকে স্পেন। এছাড়াও ইতালি, গ্রিস, টার্কি প্রভৃতি জায়গায়ও প্রচুর পরিমাণে অলিভ অয়েল উৎপন্ন ও ব্যবহার হয়ে থাকে।

অলিভ অয়েল প্রাচীনকাল থেকেই মানবসভ্যতার রসনার অন্যতম একটি উপাদানের মর্যাদা পেয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান রসনা সহ ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতিতে রান্নায় অলিভ অয়েলের ব্যবহারের বহুবিধ উল্লেখ পাওয়া যায়। নিওলিথিক মানুষের হাতে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ সালে বুনো অলিভ থেকে অলিভ অয়েল তৈরির কথা পাওয়া যায়।

এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ জাতীয় পদার্থ থাকে, যা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এই তেলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এটিতে সাধারণত অন্য কোনো রাসায়নিক মেশানো হয় না, কিংবা কোনোরকম অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শেও আনা হয় না, অর্থাৎ পুরোপুরি প্রাকৃতিক অবস্থায় তেলটি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা হয়।

ঘি

যদিও ভোজ্যতেল হিসেবে ঘি-এর প্রচলন আমাদের তুলনায় আমাদের পাশের দেশেই বেশি, তবুও উৎসবে-অনুষ্ঠানে ঘিয়ে ভাজা মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবারে আমরা নেহাত অনভ্যস্ত নই। ঘি-কে মূলত ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার করা হয় ভারতীয় ও মধ্যপ্রাচ্যীয় রসনায়। তাছাড়া মিশরসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও ঘি সদৃশ ভোজ্যতেল ব্যবহারের কথা শোনা যায়, যদিও এদের কোনোটাই গরুর দুধ থেকে উৎপন্ন হয় না।

আমাদের উপমহাদেশেই প্রথমে ঘি তৈরি শুরু হয়। ধারণা করা হয়, যেহেতু আমাদের দেশের উষ্ণ তাপমাত্রা দুধ বা মাখন দীর্ঘকাল সংরক্ষণের জন্য খুব একটা সহায়ক ছিল না, কাজেই মাখনকে তাপের সাহায্যে পরিশোধিত করে ঘি উৎপন্ন করা হতো, যাতে অনেকদিন সংরক্ষণ করা যায়।

ঘি-তে বেশ ভালো পরিমাণে ফ্যাট আছে। তাছাড়া চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর খুব ভালো উৎস হচ্ছে এটি। আজকাল অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে ঘি থেকে দুধের প্রোটিন আলাদা করে বাজারজাত করা হচ্ছে, যাতে করে ল্যাক্টোজ-ইনটলারেন্ট ব্যক্তিরাও ঘিয়ের স্বাদ আর পুষ্টি উপাদানগুলো গ্রহণ করতে পারেন। তবে যেহেতু ঘিয়ের বেশিরভাগটুকুই ফ্যাট বা চর্বি, কাজেই ভোজ্যতেল হিসেবে খুব পরিমিত পরিমাণে এটি ব্যবহার করা উচিত।

পিনাট অয়েল

পিনাট অয়েল বা চিনাবাদামের তেল বাংলাদেশে ঢালাওভাবে ব্যবহৃত ও পরিচিত না হলেও ভোজ্যতেল হিসেবে এর পরিচয় বিশ্বব্যাপী। সাধারণত এর নির্যাস খুব সূক্ষ্ম হলেও রোস্টেড পিনাট অয়েলের বেশ আকর্ষণীয় বাদামসুলভ একটি নির্যাস রয়েছে। পিনাট অয়েল সাধারণত আমেরিকা, চীন, ভারত, আফ্রিকা আর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এর ইতিহাস অন্য তেলগুলোর মতো অতটা প্রাচীন নয়। ১৮০২ সালে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে পিনাট অয়েল তৈরি করার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।

ঈষৎ মিষ্টি স্বাদের এই তেলটিতে প্রচুর ক্যালরি আছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এতে দ্রবীভূত চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি কম। পিনাট অয়েল মূলত মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের উল্লেখযোগ্য উৎস। এই ফ্যাটি অ্যাসিড মানবদেহে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। তবে তাই বলে অধিক পরিমাণে পিনাট অয়েল খাওয়ার অভ্যাস করাও উচিত নয়, কারণ এতে প্রচুর ওমেগা-৬ রয়েছে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

ভোজ্যতেলের তালিকা এখানেই শেষ নয়। এসকল তেল ছাড়াও আরও আছে অ্যাভোক্যাডো অয়েল, পাম্পকিন সিড অয়েল, কাঠবাদামের তেল, তিলের তেল, তিসির তেল। রান্নার স্বাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে মানবদেহের প্রয়োজনীয় চর্বি, ভিটামিন ও খনিজের যোগান দিতেও তেলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে খেয়াল রেখে তৈলাক্ত খাবারের বদলে পরিমিত পরিমাণ তেলে রান্না করা খাবার খাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like