Loading...

ভোঁতাকরণ, নির্মাণ এবং সম্প্রসারণ - তিন চৈনিক নীতি

| Updated: August 25, 2021 13:05:29


ভোঁতাকরণ, নির্মাণ এবং সম্প্রসারণ - তিন চৈনিক নীতি

[চীনের ক্রমবর্ধমান কঠোর কূটনীতির নেপথ্য কৌশলের পাশাপাশি এই সব কৌশল ঠেকানোর নীতি কী হতে পারে তা নিয়ে লেখা তিন বইয়ের একটির আলোচনা হয়েছে গত কিস্তিতে। আজ বাকি দুই বইয়ের বিষয়ে আলোকপাত হবে। ফাইনান্সিয়াল টাইমসে এসব বই নিয়ে আলোচনার বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

ওয়াশিংটনের থিং ট্যাংক বা চিন্তা-আধার নামে খ্যাত ব্রুকিংসের সাবেক পরিচালক রাশ দোশির লেখা বইটির নাম ‘দ্যা লং গেম: চায়না গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি টু ডিসপ্লেস আমেরিকান অর্ডার।’ আমেরিকা গত শতাব্দীকে নিজের মতো গড়ে তুলেছিলো। চীন একই ভাবে ২১ শতককে নিজের মনের মতো গড়ে নিতে চাইছে। সে লক্ষ্য অর্জনে চীনের কৌশলগুলোকে দক্ষ হাতে, নিপুণ ভাবে ব্যবচ্ছেদ করা হয় এ বইয়ে।

দোশি লিখেছেন, ”প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলবে বিশ্বব্যাপী আর বেইজিং যুক্তিসঙ্গত ভাবেই মনে করে, এর ফলাফল নির্ধারিত হবে আগামী দশকে।”

সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে দুনিয়াজোড়া যে নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার রয়েছে তা নাকচ করে দেওয়ার জন্য চীন তিন পদ্ধতিতে চেষ্টা করছে বলে উল্লেখে করেন দোশি। এ তিন পদ্ধতির প্রথম হলো ভোঁতা করা। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী মার্কিন সক্ষমতাকে ভোঁতা করে দেওয়া। তারপর আসছে নির্মাণ এবং সম্প্রসারণ।

তিন ঘটনাক্রমের ভিত্তিতে চীনের তৎপরতার ওপর যাঁরা নজর রাখছেন তাদের কাছে এই কৌশল স্পষ্ট হবে। এই তিন ঘটনাক্রম হলো, ১৯৮৯ সালে বেইজিংয়ের তিয়েনমিয়েন হত্যাকাণ্ড, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। এর ভিত্তিতে বিশ্বাস জন্মাবে যে পৃথিবীতে আমেরিকাকে নিজের জন্য বড় মাপের কৌশলগত হুমকি বলে মনে করছে চীন।

চীন নিজের যে কোনো লাভ বা অর্জনকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। আর এর মধ্য দিয়ে এই ভোঁতা করে দেওয়ার পদ্ধতিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই লাভ বা অর্জনের বিষয়টি যতই গতানুগতিক এবং পর্যায়ক্রমিক হোক না কেনো তাতে কিছুই যায় আসে না। কাজেই চীন যখনই কোনো বিমানবাহী রণতরি সাগরে নামাবে তুলনামূলক বিচারে ঠিক তখনই আমেরিকার একটি দিককে ভোঁতা করে দেওয়া মতো ঘটনাই ঘটবে। আমেরিকার ১১টি বিমানবাহী রণতরি সাগরে থাকলেও তাতে কিছুই যায় আসে না।

ব্রুকিংসের সাবেক পরিচালক রাশ দোশি এবং তার লেখা বই ‘দ্যা লং গেম: চায়না’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি টু ডিসপ্লেস আমেরিকান অর্ডার’-এর প্রচ্ছদ

২০০১ সালে বহুপাক্ষিক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয় চীন। এর মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার সুকৌশল প্রচেষ্টাই চালাল চীন। একই ভাবে চীন  দুনিয়ায় মাইনের বৃহত্তম অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলে, পৃথিবীর প্রথম জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডুবোজাহাজের বহর ভাসিয়ে মার্কিন সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দিতে চাইছে।

মার্কিন প্রভাবকে রাজনৈতিক ভাবে ভোঁতা করে দেওয়ার জন্য আঞ্চলিক অনেক সংস্থার সদস্যপদ নেয় চীন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সহযোগিতা ফোরাম এবং দক্ষিণপূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা।  “এ সব সংস্থাকে কাজ লাগিয়ে আঞ্চলিক উদারনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করত ওয়াশিংটন।… কাজেই আমেরিকার শক্তিকে খর্ব করার জন্যেই এ সব সংস্থায় যোগ দিয়েছে চীন।  এ ভাবে চীন এ সব সংস্থার সদস্য হিসেবে মার্কিন লক্ষ্য অর্জনের পথ রুখে দেয়। এ সব সংস্থা থেকে মার্কিনি ফয়দা তোলার পথও বন্ধ করে দেয়,” বলছেন দোশি।’

অর্থনৈতিক ভাবে মার্কিনি প্রভাবকে ভোঁতা করতে একই পন্থা বেছে নেয় চীন। ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়ে আমেরিকা দুর্বল হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পরই দ্বিতীয় কৌশল অর্থাৎ নির্মাণ নিয়ে এগিয়ে আসে চীন। এ ক্ষেত্রে চীনের নেতৃত্বের বিষয়ে দুইটি উদাহরণ তুলে ধরা যায়। এর একটি হলো এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। বহুপাক্ষিক ঋণ প্রদানকারী এ ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ১০০-র বেশি হবে। আর অপরটি হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রভাব বলয় গড়ে তোলার জন্য এর মাধ্যমে অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করেন  শি।

চীন সম্প্রসারণ কৌশল নিয়ে আরো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টায় মেতেছে। দোশির মতে, সিসিপি প্রতিষ্ঠার শততম বার্ষিকী অর্থাৎ ২০৪৯ সালের মধ্যেই বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে আমেরিকাকে হঠিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে চীন। এ লক্ষ্য পূরণেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে নেতৃত্ব নিতে চাইছে দেশটি। পাশাপাশি এ সব সংস্থায় চাপিয়ে দিতে চাইছে স্বৈর-আচরণ।

চীন দীর্ঘ মেয়াদের খেলায় নেমেছে। চীনের এই খেলা বানচালের জন্য  আমেরিকাকে কি নীতি-কৌশল নেওয়া উচিত সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয় বইটার শেষ পরিচ্ছেদে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে শুরু করেছিলেন বাণিজ্য যুদ্ধ। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক-বিরতির আহ্বানও জানান তিনি। পাশাপাশি কোভিড-১৯কে ‘কুংফু ফ্লু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। দোশি অবশ্য এমন চরমপথ বেছে নেওয়ার কথা বলেননি। এরচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত, সূক্ষ্ম এবং মোলায়েম পথ বেছে নেওয়ার কথাই বলেন তিনি। দোশি বলেন, “একটি অসম প্রতিযোগিতার জন্য চীনের ডলারের-বদলে-ডলার, জাহাজের-বদলে-জাহাজ এবং ঋণের-বদলে-ঋণের  কথা কেউ বলছে না।”

২.

নামের দিক থেকে তৃতীয় বইটার সঙ্গে দ্বিতীয় বইয়ের মিল আছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিজয় গোখলের লেখা এ বইয়ের নাম ‘দ্যা লং গেম: হাউ দ্যা চাইনিজ নেগোশিয়েট উইথ ইন্ডিয়া।’ চীনের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান গোলযোগপূর্ণ সম্পর্কের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া দিয়েছে এ বই। ২০২০ সালে বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে হঠাৎ দুপক্ষের সংঘর্ষে ভারতীয় ২০ এবং চীনের ৪ সেনা নিহত হয়। দেশটির দ্বিপাক্ষিক বিবাদ কতোটা রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠতে পারে এ ঘটনা তাই ব্যক্ত করেছে।

বিজয় গোখলের লেখা বই ‘দ্যা লং গেম: হাউ দ্যা চাইনিজ নেগোশিয়েট উইথ ইন্ডিয়া’-এর প্রচ্ছদ

উচ্চ-ঝুঁকি এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে চীনের আলোচনা-কৌশলকে চিত্তাকর্ষক ভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন গোখলে।  তিনি লিখেছেন, ‘মনে হয়, আগেকার মর্যাদাবান এবং অমায়িক চীনা আলোচকদের পরিবর্তে এখন স্থান করে নিয়েছেন রুক্ষ স্বভাবের নেকড়ে-যোদ্ধারা। সম্প্রতি তাঁরা আগ্রাসন, দম্ভ, মেজাজসহ অন্যান্য আচরণ দেখাতে দ্বিধা করছেন না। এগুলো মেনে নেওয়ার মতো না হলেও এ সবই নাটক।” তিনি আরো লেখেন, “চীনাদের কেবল বন্ধুত্বের খাতিরে বন্ধু বানানোর করার কোনো আগ্রহ নেই। বশে আনা বা কাজে লাগানো যাবে এমন সব ক্ষেত্রে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে  চীনারা। অন্যদিকে লোক দেখানো ক্ষোভের ভাব তাদের থাকে।”

চীনা কূটনৈতিকরা লোক দেখানো আচার-আচরণে দক্ষ তবে বেইজিং বাস্তবে ধীরে ধীরে আচার-আচরণে আরো মারমুখো হয়ে উঠছে তা নিয়ে কারো কোনো সংশয় নেই। দোশি এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলেন,  চীন জিনজিয়াংয়ে অন্তরীণ শিবির খুলেছে, হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় দেওয়া নিজ আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে, সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের সাথে লড়াইয়ে নেমেছে, দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপপুঞ্জে ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে এবং কয়েকটি তৃতীয় দেশ থেকে ইউরোপীয় নাগরিকদের অপহরণ পর্যন্ত করেছে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বিজয় গোখলে

এ সব তৎপরতা যে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা সেটা বুঝতে কারোই ভুল হয় না। চীনের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, গত মাসে চীনা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়া ফেং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানকে বলেন, “বিধি-বিধানপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ কার্যত ‘জঙ্গলের আইনের’ মার্কিন সংস্করণ এবং ওয়াশিংটন এ সব বিধি বিধান অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।”

আগামী দশকের পরাশক্তির প্রতিযোগিতা খেলা অনেক দেশকেই ঘূর্ণাবর্তে ঠেলে দেবে। বিশ্বের রাজধানীগুলোতে এরই মধ্যে বিপদ ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। কোন পরাশক্তিকে সমর্থন দিতে হবে এবং কিভাবে স্বার্থ রক্ষা করতে হবে তা নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন রাজনীতিবিদরা। আর ভেতরে ভেতরে সবাই আশঙ্কা করছেন, সত্যিই মার্কিন বিশ্ব প্রভাব যদি উদীয়মান চীনের বিশ্ব প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে তবে কী ঘটবে? এটি কেবলমাত্র একটি বিশ্বব্যবস্থা থেকে অপর একটি বিশ্ব ব্যবস্থায় স্থানান্তর হওয়া মতো ঘটনা হবে না বরং গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার হয়ত ধস নামবে।

Share if you like

Filter By Topic