বর্তমান সময়ে অনলাইন ক্লাস আমাদের কাছে অতি সুপরিচিত একটি শব্দ।লকডাউন, শাটডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সোশ্যাল ডিস্ট্যন্সিং ইত্যাদির মতো অনলাইন ক্লাসও আমাদের জীবনে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে।করোনার এই মহামারী থেকে পৃথিবী আবার কবে নিজের গতিতে ফিরে আসবে, সে কথা কেউ জানে না।এই দুঃসময়ে অনেকেরই অনেক ক্ষতি হচ্ছে।তার মধ্যে অন্যতম ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।সেই কথা বিবেচনা করে মূলত শুরু করা হয়েছে অনলাইন ক্লাস ব্যবস্থা।প্রথম দিকে এই অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি জটিল মনে হলেও বর্তমানে এটি অধিকাংশের কাছেই সহজলভ্য হয়ে উঠছে।শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্যরকম মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে এই নতুন প্ল্যাটফর্মে।
আমাদের দেশে মোটামুটিভাবে দুই ধরনের অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি আছে।একটি হচ্ছে সরাসরি ক্লাস, অর্থাৎ জুম বা গুগল মিটের মাধ্যমে নেয়া ক্লাস। অন্যটি হচ্ছে রেকর্ডকৃত ক্লাস।জুম বা গুগল মিটে ক্লাস হলে শিক্ষার্থীর সাথে শিক্ষক বা শিক্ষিকার সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়।কিন্তু রেকর্ডেড ক্লাসে তা হয় না।কেননা ছাত্র-ছাত্রীরা রেকর্ডেড ক্লাসে প্রশ্ন করার সুযোগ পায় না।
শ্রীমঙ্গল শহরে অবস্থিতসেন্ট মার্থাস উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ঋদ্ধিমান দেব শ্লোক বলে, অনলাইনে রেকর্ডেড ভিডিও ক্লাস করতে খুব একটা ভালো লাগে না।ম্যাম শুধু কথা বলেই যান, আমরা কোনো প্রশ্ন করতে পারি না।সে এও জানায়, পড়া না বুঝলে তার ব্যক্তিগত শিক্ষক মা তাকে পড়া বুঝিয়ে দেন।
স্কুল শিশুদের মানবিক বিকাশের একটি ভিত্তিকেন্দ্র।সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরা অবচেতন মনে অনেক কিছুই শিখে থাকে।বাচ্চাদের খেলাধুলা, কেয়ারিং, শেয়ারিং, খুনসুটি ইত্যাদি গড়ে ওঠে স্কুলজীবনের মাধ্যমে।জীবনের অন্যতম সম্পর্ক - বন্ধুত্বের শুরুটাও সেখানেই হয়।
মোহাম্মদপুর ঢাকার সেন্ট জ্যাকব স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র শিল্প বর্ম্মণ জানায়, আমার স্কুলে যেতে খুব ভালো লাগে। স্কুলের বন্ধুদের খুব মিস করি আমি।আগে তো ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুদের সাথে কত মজা করতাম, কিন্তু এখন তো জুম ক্লাস হয়। পাশের বন্ধুদের তো ডাক দিয়ে কিছু বলাও যায় না।
অনলাইনে ক্লাস হলেও শিশুদের জন্য এই ব্যবস্থা অনেকটাই কঠিন।সেজন্য ক্লাসের পড়া না বুঝলে সাহায্য নিতে হয় অভিভাবকের।
অভিভাবক টুম্পা দেব জানান, অনলাইন ক্লাস বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর শক্তি হিসেবে কাজ করছে।যার জন্য বাচ্চাদের প্রতিদিন নিয়মমাফিক পড়াশোনা করানোর জন্য পড়তে বসাতে পারি।তিনি আরো বলেন বাচ্চারা মোবাইল ফোন খুব বেশি ভালোবাসে ইউটিউব ও ভিডিও গেইমের জন্য।সব সময় খেয়াল রাখতে হয় মোবাইল ফোনের প্রতি যাতে আসক্ত হয়ে না যায়।
অনলাইনে ক্লাস করে অনেকেই উপকৃত হয়েছে।সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত ছাত্র বিশাখ গোস্বামী বলেন, বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।এর কারনে আমার স্নাতক ডিগ্রি শেষ হয়েও হচ্ছিল না এমন অবস্থায় পড়েছিলাম।কিছুদিন পর ইউনিভার্সিটি থেকে অনলাইন ক্লাস করানো শুরু হয়।যার দরুন আমি ঘরে বসেই স্নাতক ডিগ্রি শেষ করে এখন স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করছি।অনলাইন ক্লাস সেবার কারণে এখন আমি বিভিন্ন চাকরির জন্য অবেদনের যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি।
অনলাইন ক্লাসের যেরকম সুবিধা আছে, সেরকম কিছু অসুবিধাও আছে।অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে নিজেকে পুরোপুরি সঠিকভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না।নেটওয়ার্কের সমস্যা প্রতিনিয়তই থাকে।তাছাড়া ফোনগুলোও মাঝে মাঝে হ্যাং হয়ে যায়।সবচেয়ে বড় কথা হলো, একজন পরীক্ষকের সামনে বসে পরীক্ষা আর ঘরে বসে পরীক্ষার মধ্যে অনেক তফাৎ আছে।বাচ্চাদের জন্য একটা বড় ঝুঁকি হচ্ছে, অনলাইন ক্লাসের কথা বলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের আসক্তি দিন দিন বেড়ে চলেছে।
এই মহামারীকালে স্থবির শিক্ষা ব্যবস্থাকে চলমান করেছে অনলাইন ক্লাস ঠিকই, কিন্তু এখনো এই ব্যবস্থা পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে।নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও ইন্টারনেট প্যাক কিনে অনলাইন ক্লাস করা এখনো দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে আছে।
অদ্রি বর্মনবর্তমানেশ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজেহিসাববিজ্ঞান বিভাগে সম্মানচতুর্থবর্ষে অধ্যয়নরত।