ভারত আগামী পাঁচ বছরে নতুন ৬০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে । চলতি সপ্তাহের বাজেট ঘোষণায় এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি করা মোটেই সহজ হবে না। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
সম্প্রতি কয়েক বছরে ভারতে বেকারত্বের হার অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের বেকারত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন দুই বিশেষজ্ঞ ক্রেগ জেফরি এবং জেন ডাইসন।
দেশটির বেকারত্বের ধরণ নিয়ে লিখেছেন তারা। বিবিসি তুলে ধরেছে তাদের লেখা সেই প্রতিবেদন:
২০০০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে উত্তরপ্রদেশের মিরাটে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঠাট্টার ছলে নিজেদের নাম দিয়েছিল ‘নোহয়্যার জেনারেশন’ বা ‘গন্তব্যহীন প্রজন্ম’।
বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টায় হতাশ হয়ে পড়েছিল তারা। এই তরুণরা শহুরে জীবন নিয়ে দেখা স্বপ্ন আর নিজেদের গ্রামের বাড়ির বাস্তবতা- দু’য়ের মধ্যে আটকে পড়ার কথা জানিয়েছিল। বেকারত্ব যেন তাদেরকে আধুনিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। তারা বলেছিল, "আমাদের জীবন এখন শুধুই 'টাইমপাসে' পরিণত হয়েছে।”
গত দুই সপ্তাহে আবার আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতের কর্মসংস্থান সংকটের পরিধি। 'বেকার যুবসমাজ' নিয়ে গণমাধ্যম ও জনসাধারণ আবারও সরব হয়েছে।
এশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আধিক্য ভারতে উদীয়মান অর্থনীতির জন্য সুফল আনবে-এমনটিই বলা হয়। কিন্তু নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করা লাখো তরুণ- যাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত- ভারতের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার আধিক্য বা ‘ডেমোক্রাফিক ডিভিডেন্ট’ এর বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
বেকারত্বের সমস্যা ২০০০ এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা উল্লেখজনকভাবে বেড়েছে। বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। কখনও বেকারত্ব নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ, আবার কখনও কোনও প্রচারণায় রাজনৈতিক নেতাদের কথার ফুলঝুরি গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে।
বেকারত্বের অভিশাপ এবং বেকার যুবকদের সমাজের বিপদ হিসাবে দেখার প্রচলিত ধ্যান-ধারনা থেকে বেরিয়ে এসে যদি আমরা আরও গভীর কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি, তাহলে হয়ত এই প্রশ্নগুলোই মনে জাগবে- এই ভারতীয় তরুণ-যুবারা প্রতিদিন করে কী? তারা সময় কাটায় কীভাবে? সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন? ভারতকে বদলাতেই বা তারা কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
গত ২৫ বছর ধরে ভারতের উত্তর প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী বেকার যুবকদের অভিজ্ঞতা ও কাজ নিয়ে গবেষণা করেছেন জেফরি এবং ডাইসন। উত্তর প্রদেশের মিরাট এবং উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে বেকার যুবকদের সঙ্গে থেকে সময় কাটিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে।
এতে দেখা গেছে, সামাজিকভাবে তারা চরম দুর্ভোগে আছে। বেকার সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ হতাশাগ্রস্ত। তাদের হাতে অর্থ নেই। তারা পরিবারের চাহিদা মেটাতে পারছে না। অনেক সময় প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় সমাজে তারা হেয় হচ্ছে। চাকরির অভাবে অনেকের বিয়ে হচ্ছে না।
পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম হিসেবে ছেলেদের জন্য স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলেই ধরে নেওয়া হয়। তাই পাকা চাকরি না থাকলে তারা নিজেদের অথর্ব বলে দোষারোপ করে। উপরন্তু পড়শোনা এবং চাকরি খোঁজায় যে সময় তারা ব্যয় করেছে তা নিয়েও বিতৃষ্ণায় ভোগে এই তরুণরা।
নাগরিকত্বের সঙ্গেও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। যুবসমাজের অনেকেই কিশোর কিংবা তরুণ বয়সে সরকারি চাকরি করে দেশসেবার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সরকারি চাকরি পাওয়া এতটাই কঠিন যে তা অনেকক্ষেত্রেই হাস্যকর হয়ে উঠেছে।
ফলে অনেক বেকার তরুণ বিশেষ করে ছেলেরা বিচ্ছিন্ন ও রুঢ় প্রকৃতির হয়ে পড়ে। নিজেরই তখন নিজেদের কিছু না করা মানুষ কিংবা শুধু 'টাইমপাস' করায় ব্যস্ত বলে বর্ণনা করছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই যাদের, সেই গন্তব্যহীন প্রজন্ম এখন সমাজের সবখানেই বিরাজমান বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
কিন্তু এই বেকার যুবকরা যে কিছুই করছে না, বা গন্তব্যহীন হয়ে পড়ছে - এ কথাটিকে আক্ষরিকভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ, চাকরি না পাওয়া তরুণরা সমাজে প্রায়শই উদ্যোক্তা হিসেবে ভূমিকা রাখে। বিকল্প এমন কাজ তারা খুঁজে নেয় যেখানে খুব বেশি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না, তবে ভবিষ্যতে তা থেকে ভাল কর্মসংস্থান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
