ভানুসিংহের বিয়ের দিন


মোজাক্কির রিফাত | Published: December 09, 2021 17:10:50


রবীন্দ্রনাথ আর মৃণালিনীর সাদাকালো ছবি।

শীতকালটা যেন বিয়েরই মৌসুম। এমনই এক শীতকালে ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত দম্পতির বৈবাহিক জীবনের সূচনা হয়।

বিয়েটা হয়েছিলো খুলনার মেয়ে ভবতারিণী দেবী আর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। বিয়ের পরে ভবতারিণী দেবীর নাম হয়ে যায় মৃণালিনী দেবী।

রবীন্দ্রনাথের মতো নক্ষত্রের আলোয় উজ্জ্বল হয়েছে বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতি। সাহিত্যের জগতে এক স্বকীয় ভুবন তৈরি করলেও যাপন করেছেন বংশীয় রীতিসিদ্ধ সামজিক জীবন; বিয়েটাও তার ব্যতিক্রম নয়।

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের খুলনা জেলার রুপসা থানার সাথে নাড়ির সম্পর্ক। তিনি অবশ্য কলকাতার শান-শওকতে বড় হয়েছেন। জীবনের প্রথম বাইশ বছরে কখনো চিন্তাও করেননি খুলনার সাথে তার কোনো নতুন সম্পর্কের গাঁথুনি তৈরি হতে চলেছে।

রবি ঠাকুরের বৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাদের জমিদারী সেরেস্তার কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবীকে প্রথম দেখায় পছন্দ করেন। এরপর মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রস্তাব করেন তার জন্য। গোত্র-কুল ইত্যাদি মিলিয়ে সবকিছুর সামঞ্জস্যতা থাকায় ঠিক হয় বিয়ে। বিয়ের দিন ধার্য হয় ২৪ শে অগ্রহায়ণ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ।

তবে শিলাইদহের একটি দুর্ঘটনা রবীন্দ্রনাথের বিয়ের আনন্দকে করেছিল কিছুটা মলিন। বড়বোন সৌদামিনী দেবীর স্বামী সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় মারা যান শিলাইদহে। তবুও বিয়ের দিনক্ষণ নির্ধারিত করা থাকায় সকল আনুষ্ঠানিকতা সমাধা হয়েছিল ঠিকঠাকভাবেই।

বিয়ের জন্য কবিগুরু সেসময় খুলনা যেতে রাজি হননি। তার ইচ্ছায় মৃণালিনী দেবীর পরিবারকে নিয়ে আসা হয় কলকাতায়। কনেপক্ষের পুরো পরিবারের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল এক বিশাল বাড়িও।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের মাথা হলেও বিয়ে তার হয়েছিলো খুলনা অঞ্চলের বনেদি হিন্দু রীতিতেই। তবে সচরাচর বিয়ের জাঁকজমক প্রায় ছিল না সেই বিয়েতে। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশেই সব সম্পন্ন হয়।

এ ব্যাপারে রবিঠাকুরের আরেক বৌদি হেমলতা দেবী লিখেছেন, ঘরের ছেলে রবীন্দ্রনাথের নিতান্তই ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়েছিল। ধুমধামের সম্পর্ক তার মধ্যে ছিলো না। পারিবারিক বেনারসি-শাল ছিল একখানি, যার যখন বিয়ে হতো সেইখানি হতো বরসজ্জার উপকরণ।

তবে আদতে জমিদার পরিবারের বিয়ে আর কতই বা ঘরোয়া হয়? ছাপা হয় বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র, যেগুলো ডাকযোগে আত্মীয়দের বাড়ি পাঠানো হয়।

মজার ব্যাপার হলো, নিমন্ত্রণপত্র ছাড়াও তখনই কবি হিসেবে বেশ গুরুত্ব পাাওয়া রবীন্দ্রনাথ তার বন্ধুদের জন্য নিজ হাতে লিখেছিলেন দাওয়াতের চিঠি। দীনেশচন্দ্র সেন, নগেন্দ্র গুপ্ত প্রমুখ ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন এ চিঠিটি পাঠিয়েই। চিঠিটি ছিল অনেকটা এমন,

আগামী রবিবার ২৪শে অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভ বিবাহ হইবেক। আপনি তদুপলক্ষে বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহাদি সন্দর্শন করিয়া আমাকে এবং আত্মীয়বর্গকে বাধিত করিবেন।

ইতি

অনুগত

শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই চিঠির উপরের দিকে সচিত্র অ্যাম্বুস করা ছিল, আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়।

এরপর সকলের অংশগ্রহণেই বিবাহকার্য সমাপ্ত হয়। প্রথা মেনে কবিকে খেতে হয়েছে কয়েক বাড়িতে আইবুড়ো ভাতও। কবিতায় সদা চঞ্চল রবীন্দ্রনাথ সেবারে পেয়েছেন লজ্জাও। বৌদিরা জিজ্ঞাসা করছেন, কী রে, বউকে দেখেছিস, পছন্দ হয়েছে? কেমন হবে বউ? ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ঘাড় হেঁট করে বসে একটু করে খাবার মুখে দিচ্ছেন আর লজ্জায় মুখে যেন কোনো কথাই নেই।

কিন্তু ততদিনে মা সারদা দেবীর মৃত্যু আর বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপস্থিতিতে ভানুসিংহের বিয়ের উপলক্ষকে এতটাও সুখকর কোনো ঘটনা হতে দেয়নি। ১৯০২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান। অল্পদিনেই ঘটে কবিগুরুর বৈবাহিক জীবনের সমাপ্তি ।

মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।

anmrifat14@gmail.com

Share if you like