কথায় আছে ‘দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে?’ তা অবশ্য মেটে না, তবে দুধের সব পুষ্টিগুণই কিন্তু উপস্থিত ঘোলে। ঘোল বা মাঠা- যে নামেই পরিচিত হোক, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে রয়েছে এর অন্যরকম কদর।
বাংলাদেশের মতো গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে তীব্র তাপদাহে শরীরে পানির ঘাটতি মেটাতে এ পানীয় আদর্শ।
দুধ থেকে ছানা অপসারণের পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকে, তাই ঘোল। দইকেই পাতলা করে ঘোল বানানো হয়। হজমে সহায়ক এ পানীয় সারা দেশেই জনপ্রিয়, তবে ভাগ্যকুলের ঘোলের জুড়ি মেলাটা ভার।
ভাগ্যকূলের ঘোল শুনে মনে হতে পারে এটি নির্দিষ্ট কোন দোকানের নাম; তবে তা কিন্তু নয়। ভাগ্যকূল বাজার নামের একটি জায়গা মিষ্টান্নের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় এ নামের পরিচিতি। ঢাকাসহ সারাদেশে ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডার বা এ ধরনের যেসকল নাম রয়েছে তার উৎপত্তিও এই ভাগ্যকুল বাজারেই।
আড়িয়াল বিল দিয়ে বেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার একটি ইউনিয়ন হলো ভাগ্যকূল। ইলিশের বাড়ি মাওয়া ঘাট থেকে ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় এ বাজারে আসতে।
পদ্মার একদম পাড় ঘেষে ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান, নাম চিত্তরঞ্জন সুইটমিট। ভাগ্যকূল বাজারে গিয়ে যে কাউকে বললেই এক নিমিষেই দেখিয়ে দেয় এ দোকানটিকে।
সাদামাটা ও জরাজীর্ণ টিনে ঘেরা ঘর হলেও জায়গাটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দূর-দূরান্ত থেকে ভাগ্যকূল বাজারে এ দোকানেই মানুষ আসেন ঘোলের স্বাদ চাখতে।
ভাগ্যকূল বাজারে মিষ্টির দোকান আরো আছে। তবে ঘোলের জন্য চিত্তরঞ্জন সুইটমিটই চিরন্তন আবেদনের জায়গা। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে চিত্ত রঞ্জন আচার্য এ দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার মৃত্যুর পর তিন সন্তান মিলে এ দোকানটি এখন পরিচালনা করেন।
জানা যায়, দোকান প্রতিষ্ঠার একেবারে শুরু থেকেই এখানে দই বানাতে গরুর খাঁটি দুধ ব্যবহার করা হয়। সেই দই থেকে ঘোল প্রস্তুত করা হয় বলেই এখানকার ঘোলের মান ও স্বাদ অতুলনীয়।
প্রতিদিনই এখানে প্রচুর ভীড় থাকে ঘোল খেতে আসা মানুষের। তবে ছুটির দিনগুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষের যেনো গণজমায়েত লেগে যায়। দোকানের অবয়বের মতই পরিবেশনাতে কোনো আড়ম্বর না থাকলেও আছে পরিচ্ছন্নতা।
অর্ডার করার মিনিট পাচেকের মধ্যেই কাঁচের গ্লাসে একটি লেবু আর পানের জন্য একটি স্ট্র-সহ পরিবেশন করা হয় ঘোল। প্রতি গ্লাস ঘোলের বিনিময় মূল্য মাত্র ৪০ টাকা। ঘোল ছাড়াও এ দোকানে কালোজাম, সন্দেশ, ছানার মিষ্টি ইত্যাদি বাহারি মিষ্টি পাওয়া যায়।
ভাগ্যকূল বাজারে গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভান্ডার নামে আরো একটি শতবর্ষী মিষ্টির দোকান রয়েছে। তারাও মিষ্টি ও ঘোলের জন্য বিখ্যাত। ভোজন রসিক মানুষেরা এ দোকানটি না ঘুরে যান না। এখানেও প্রায় একই প্রক্রিয়ায় ঘোল তৈরি ও পরিবেশন করা হয়। বাজার থেকে ঘোল খেয়ে বাড়িতে বোতলজাত করে নিয়ে আসারও ব্যবস্থাও রয়েছে।
ফেরার বেলায় পদ্মার চর ধরে ঘুরে আসারও সুযোগ থাকে। এখান থেকে ট্রলার ভাড়া করার ব্যবস্থাও আছে। মাওয়া ঘাটে ইলিশ খেতে গিয়েও খুব সহজে ঘুরে আসা যায় ভাগ্যকূল বাজার।
যেভাবে যেতে হয়
ঢাকা থেকে থেকে বাসে করে শ্রীনগর চলে যাওয়া যায়। সেখান থেকে অটো বা রিকশা করে সরাসরি ভাগ্যকূল বাজারে যাওয়া যায়। আরামসহ বেশ কিছু বাস ঢাকা থেকে শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া জনপ্রতি ৬৫ টাকা।
মাওয়া থেকে ভাগ্যকূল যাওয়া আরো সহজ। মাওয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি করে মাত্র ৩০ মিনিটেই যাওয়া যায়। সিএনজি রিজার্ভ নিলে ৩০০ টাকা। শেয়ারে অটো নিয়েও চলে আসা যায় মিষ্টির স্বর্গ ভাগ্যকূলে।
মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
anmrifat14@gmail.com
