ভাইরাসের হানার পর এখন নিত্যপণের চড়া দামের কষাঘাত


শামসুল হক জাহিদ | Published: October 11, 2021 19:20:44 | Updated: October 11, 2021 22:39:21


সরকার অবশ্য খুব সীমিত পরিসরে চাল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ ও আটা ভর্তুকীমূল্যে বা কমদামে বিক্রি করছে। সরকারেরর এই খোলা-বাজার বিক্রির কাজটি সার্বিক দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। -এফই ফাইল ছবি

সময়টা কোভিডের। জীবন এর আগে বোধহয় এতো কঠিন ছিল না। পরিবারের পর পরিবার আপনজন ও প্রিয়জনকে হারিয়েছে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের কারণে। হাজার হাজার মানুষ এই ভয়াবহ জীবাণুর সাথে প্রাণপণ লড়াই করে টিকে আছে। বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়াতেই লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে, খুইয়েছে তাদের আয়ের উৎসগুলো।

তবে ভাইরাসের সংক্রমণ আপাতত থিতিয়ে এসেছে। তাই বাতাসে অনিশ্চিয়তার বার্তা বইছে। তারপরও জীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে মহামারী-পূর্ব সময়ের মতো ছন্দময় অবস্থায় ফিরে যেতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। করোনা ভাইরাসের মহামারী অনেক প্রতিকূলতা ও বিপত্তি তৈরি করেছে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথে প্রতেক্যেই কমবেশি এসব অতিক্রম করতে বেশ বেগ পেতে হবে।

এর মধ্যে নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেন অনেকটা নিরন্তরভাবে বাড়ছে যা বেশিরভাগ মানুষকে বিশেষত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মহামারীর পুরো সময়টাতেই জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বেড়েছে। কখনো তা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে। কিন্তু দাম বেড়ে চলার এই প্রবণতা যৌক্তিক মাত্রা বা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বেলায় দামদর যেন যথেচ্ছাভাবে বাড়ছে!

মহামারীর আগের সময়ের সাথে কিছু নিত্যপণ্যের এখনকার দাম তুলনা করলে দুইয়ের মধ্যে বেশ বড় পার্থক্যই দেখা যায়। মোটা চালের কথাই ধরা যাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন তা কেজি প্রতি সাড়ে ৩১ শতাংশ বেশি দরে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়কালে আটার দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ, ময়দা ৩৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৪৩ শতাংশ, চিনি ২২ শতাংশ, ডাল ৩০ শতাংশ, দেশি পেয়াঁজ সাত শতাংশ, মুরগী (ব্রয়লার) ৫২ শতাংশ। বিভিন্ন ধরণের সবজি ও মাছের দামও বেড়েছে।

বাসাবাড়ির কাজে ব্যবহার হওয়ার এলপিজি গ্যাস ও প্রসাধনসামগ্রী, বেকারী পণ্য, পরিবহন ব্যয় সবই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অবশ্য এসব বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় না।

এটা ঠিক যে বিশ্ব পণ্য বাজার এখন অস্থির। বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুতহারে বাড়ছে। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটা আর পণ্য সরবরাহ করার জন্য জাহাজের ভাড়া বেড়ে যাওয়াই মূলত এর জন্য দায়ী। আন্তর্জাতিক বাজারের এই প্রবণতা দেশীয় বাজারকেও প্রভাবিত করেছে। কিন্তু কিছু সংখ্যাক অসাধু ব্যবসায়ী ও বিক্রেতার অতি মজুদ ও কারসাজি দেশের ভেতরে এখনকার চড়াদামের জন্য কম দায়ী নয়।

অবাক করার বিষয় হলো, দেশে পরপর দুবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে চালের দাম বাড়ছে। এমনকি চাল আমদানির শুল্ক কমানোর পরও তেমন কোনো কাজ হয়নি। এভাবে চালের দাম এতো চড়া হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। সরকার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দাবি করে আসছে। শুল্ক কমানোর পর বেসরকারি খাতেও প্রচুর চাল আমদানি হয়েছে। তবু দাম সহনীয় হয়ে আসছে না।

আসলে যোগ-বিয়োগের অংকটা সঠিক হতে হবে। চাল আমদানির পরিসংখ্যান সরকারের কাছে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আলাদাভাবে ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। এসব পরিসংখ্যান থেকে দেশে চালের সরবরাহজনিত কোনো ঘাটতির আভাস মেলে না। চাল আমদানির বেশিরভাগটাই হয় প্রতিবেশী ভারত থেকে। তাই আমদানি ব্যয়ও কম। তাহলে কেন চালের দাম এতো বেশি? সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে চাল আমদানির যে উপাত্ত রয়েছে, তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কি তাহলে সন্দেহ আছে? দেশীয় চালের বাজারে চালকলের মালিকরা একটি বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। কেননা, রাষ্ট্রীয় গুদামের জন্য চাল সংগ্রহ করতে সরকার এদের ওপর নির্ভর করে। তাহলে অনেকেই যে সন্দেহ করে থাকে চালকল মালিকরা চালের দাম বাড়ানো জন্য দায়ী, তা কি সত্যি?

পেঁয়াজ হলো আরেকটি নিত্যপণ্য যার কথাও উল্লেখ করতে হয়। এই পণ্যটির দাম এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে ভারত এর দাম সামান্য বেড়ে যাওয়ার পরপরই। অথচ দেশীয় পেঁয়াজের উৎপাদন এ বছর সন্তোষজনক। ব্যবসায়ীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানিও করেছেন।

চাল, পেঁয়াজ বা অন্য যে কোনো নিত্যপণ্যের দাম বাড়া বিষয়ক প্রশ্নগুলোর উত্তর একমাত্র সরকারই দিতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারে এ বিষয়ে অনেকটা নির্লিপ্ত অবস্থান নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা একরম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কম-বেশি প্রতিক্রিয়াহীন রয়েছেন।

সরকার অবশ্য খুব সীমিত পরিসরে চাল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ ও আটা ভর্তুকীমূল্যে বা কমদামে বিক্রি করছে। সরকারেরর এই খোলা-বাজার বিক্রির কাজটি সার্বিক দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি।

কর্তৃপক্ষের আসলে গরিব ও মধ্য-আয়ের মানুষের প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুসারে দেশের গরিব মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বহু মালিক তাদের শ্রমিক-কর্মচারীরর মজুর-বেতন কমিয়ে দিয়েছে। এরকম লাখ লাখ মানুষ এখন বিরাজমান চড়া দামের বাজারে টিকে থাকতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারের দ্রব্যমূ্ল্যের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু স্থানীয় বাজার তদারকীতো অনায়াসেই করতে পারে। দেখতে পারে যে বিভিন্ন পণ্যের দাম সমানুপাতিক হারে বাড়ছে কি না। কেউ অযৌক্তিক দাম হাঁকলে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে ব্যবস্থা নিতে পারে।

Zahidmar10@gmail.com

মূল ইংরেজি নিবন্ধ পড়ুন: After the virus, come soaring prices

Share if you like