২০২১ সাল শেষ হয়েছে। স্বভাবতই পুরো ডিসেম্বর জুড়ে আলোচনায় ছিল ২০২১ সালে কোন ঘটনাগুলো আলোচিত ছিল তার হিসেব-নিকেশ।
এই হিসেবের সংখ্যা ধার্য করা হয় মূলত চিকিৎসা বিজ্ঞানে অতি গুরুত্ত্বপূর্ণ শব্দ ‘ভাইরাল’ হওয়া ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে।
খবর বলছে, ২রা ডিসেম্বর রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের চেয়ারম্যান বাড়ি ইউটার্নে দ্রুতগতির ব্যক্তিগত গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজংয়ের বাবা মনোরঞ্জন হাজং। ঘটনার পর মামলা করার জন্য কয়েক দফা চেষ্টা করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সেন্ট্রাল কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে কর্মরত এই নারী কর্মকর্তা।
বাবাকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় ১১ ডিসেম্বর পুলিশের সার্জেন্ট মহুয়া হাজং বনানী থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ১৬ ডিসেম্বর ২০২১বৃহস্পতিবার চালকসহ অজ্ঞাতনামা তিনজনকে আসামি করে বনানী থানায় মামলা হয়।
বিষয়টা এমন যেন, আলোচনায় না আসলে মামলা হতো না। খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত একজন কর্মীই যেখানে আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন সেখানে সাধারণ মানুষের আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কা্রণ রয়েছে।
ভাইরাল না হলে যে অবিবেচিত, গবেষণা বহির্ভূত সিদ্ধান্ত বাতিল হয় না তার যথেষ্ট ইঙ্গিত দেয় পরের ঘটনাটি।
সম্প্রতি, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী পয়েন্টে নারী ও শিশু পর্যটকদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা উদ্বোধনের কয়েক ঘণ্টা পরই তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, “পর্যটকদের মতামতের ভিত্তিতে নারী ও শিশুদের জন্য সৈকতে সংরক্ষিত এলাকা করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর গণমাধ্যম ও সামজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ায় আগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে,” খবর প্রথম আলোর।
ব্যাপারটি এরকম না করে আমাদের সকল সেবামূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে যদি মানুষের নিরাপত্তার প্রাধান্য থাকতো তবে নিরাপত্তা পেত নারী, নিরাপত্তা পেত শিশু। শুধু এই একটি বা দুটি ঘটনা নয় বছর জুড়ে এরকম অসংখ্য ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। প্রত্যেক ঘটনারই, লক্ষণ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হরহামেশাই লক্ষ্য করা গেছে যা অবশ্যই উপযুক্ত আলোচনার দাবি রাখে।
কেন হচ্ছে এমন?
প্রথমত, একটি রাষ্ট্রে যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রকট হয়, তখন মানুষের মাঝে এই ধারণা তৈরি হয় যে, আইন আদালত যেহেতু তাদের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে পারছে না তখন জনগণেরই নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়া উচিত।
ফলে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনমত তৈরি করে ঘটনার প্রতিকার চায়। আর জনতুষ্টিবাদী শাসনব্যবস্থা নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে অধিকাংশ জনগণের দাবির মুখে তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে উক্ত জনমত ভুল হওয়া সত্বেও এ ধরনের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে কোনো ধরনের পর্যালোচনা বাদেই সেসব দাবি মেনে নেয়।
দ্বিতীয়ত, এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর তৈরি হয় যারা আইনের আশ্রয় না নিয়েই, উদ্ভুত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করে।
গত বছর বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রদায় তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের সময়ে কুমিল্লার নানুয়ারদীঘির পূজামণ্ডপের ভেতরে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন রাখার একটি ছবি ব্যাপক ভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার জল কতদূর গড়িয়েছে তা সবাই লক্ষ্য করেছেন।
ভাইরাল সংস্কৃতির মাধ্যমে আমরা আমাদের কিশোর, যুবক ও রাজনীতিবিদ তথা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ও আমজনতার মাঝে তৃতীয়ত যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছি তা হল আলোচনায় আসার জন্য তীব্র কামনা জন্মানো। তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশী সংস্কৃতিকে লালন করে, টিকটক, লাইকি’র মত প্রযুক্তির অপব্যবহার করে বিভিন্ন অশালীন ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে আলোচনায় আসতে চেষ্টা করেন।
অনেক ক্ষেত্রে সফলও হন। এছাড়াও রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সামনে, বিভিন্ন সভা সেমিনার, টক-শো’য় বেফাঁস মন্তব্য করে আলোচনায় আসার নজির দেখা গিয়েছে।
ধরুন আপনি আপনার কাছের কারো সাথে সরাসরি কথা বলছেন। এক্ষেত্রে আপনি বুঝতে পারবেন কতটুকু স্পর্শকাতর কথা আপনি বলতে পারবেন। কিন্তু একই কথা আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বলতে গেলে বুঝতে পারলেও পরিমাপ করার উপায় নেই কতটা স্পর্শকাতর ব্যবহার করেছেন।
এক্ষেত্রে আমাদের তরুণ প্রজন্ম যারা প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ এবং আমাদের বয়োঃবৃদ্ধ প্রজন্ম যারা অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারে অদক্ষ তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ভুল ব্যবহারটি করে থাকেন। এ প্রসংগে একটি ঘটনার অবতাড়না করা যেতে পারে।
বছরের শেষার্ধে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক নারী শিক্ষার্থীকে মেসেঞ্জারে বুয়েটেরই আরেক শিক্ষার্থী তার তিন বন্ধুর পরামর্শে অর্ধনগ্ন ছবি ও অশ্লীল ভিডিও পাঠিয়ে, আপত্তিকর বিভিন্ন ইমোজি ব্যবহার এবং কমেন্টের মাধ্যমে যৌন হয়রানি করে।
পরবর্তীতে, ফেসবুকে চার ছেলে শিক্ষার্থীর ছবি এবং তাঁদের মেসেঞ্জারের কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এতে পক্ষ-বিপক্ষে আলোচনা, সমালোচনাও হয়েছে। সামাজিক মূল্যবোধ ও নীতি- নৈতিকতার অভাবে প্রতিনিয়তই এরকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এতে অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী উভয়েই ভুক্তভোগী হচ্ছেন।
সোশ্যাল টেনশন
ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার অভিযোগে চাকরি খোয়ান অনেকে। এ তালিকা থেকে ডাক্তার, পুলিশ, শিক্ষক ও ছাত্রনেতা সহ প্রভাবশালীদের বাদ যায়নি কেউ। যার ফলে আমজনতার মাঝে একটি আতঙ্ক দেখা দেয় এই ভেবে যে, যেকোন সময় যে কেউ ভাইরাল হয়ে যেতে পারেন এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে পারে।
এই আতঙ্ককে সমাজতত্ত্বের ভাষায় ‘সোশ্যাল টেনশন’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নারী ও শিশু নির্যাতন, খুন, ডাকাতি, অপহরণ, মাদক কারবার ও পুলিশ আক্রান্তের ঘটনাগুলোর মত এই ভাইরাল সংস্কৃতিও আমাদের সামাজিক দুশ্চিন্তাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি দেশে সরকারের সাথে জনগণের যখন দূরত্ব দেখা দেয় তখন ঘন ঘন বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় আলোচনায় আসে। সরকারের উপর কর্তৃত্ববাদের ছায়া ভর করলে বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করে উদ্ভূত ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার।
আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোতে দেখা গিয়েছে, কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো তাদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে নিত্য নতুন ঘটনাকে জন্ম দিয়েছে। এটি করা হয় মূলত রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, লুটতরাজ, ঘুষ ও দূর্নীতি থেকে জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন দিকে সরিয়ে রাখতে।
মন্দের ভালো
ভাইরাল সংস্কৃতির ভাল দিক একবারেই যে নেই তা নয়। যে ভাল দিকটি আছে তা হল শেষ ব্যবস্থাটি বা মন্দের ভাল। নেটিজেনরা বলে থাকেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে নিবর্তনমূলন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপ্রশাসন যখন ঠিকভাবে তার কাজটি করতে পারে না তখন জনমতের মাধ্যমে ভুক্তভোগী যদি কাঙ্খিত বিচার পান এটি ভাল নয় কি?
তবে এই ভালো’র দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে তাও আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে। এরকম চলতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে মানুষ থানায় না গিয়ে ফেইসবুকের কাছে যাচ্ছে। আইনের প্রতি জনগণের অশ্রদ্ধা সৃষ্টি হবে যা কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্যে মোটেও সুখকর নয়।
অপরদিকে অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাবে, তাদের মাঝে এই ধারণা সৃষ্টি হবে যে, অপরাধ করলেও তাদেরকে বিচারের আওতায় আসতে হবে না, যার চূড়ান্ত পর্যায় হলো অপরাধবোধ কাজ না করা।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বিরুপ প্রভাব হলো মানুষের ব্যক্তিগত সুরক্ষা না থাকা। কিছুকাল আগেও দেখা গেছে, কেবল যারা সরকারি ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন বা বিরোধী মতাদর্শের তাদেরই অডিও ফাঁস হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে ঘটনা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, যিনিই কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হচ্ছেন তারই ব্যক্তিগত তথ্য বেড়িয়ে আসছে। আবার যিনিই অশালীনতার কারণে আলোচনায় আসছেন তিনিই কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হচ্ছেন। সম্প্রতি একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ঘটনার ক্ষেত্রে যা ভালভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে।
রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন দূর করতে না পারলে এবং মানুষের জীবন যাত্রার মানের সুষম উন্নয়ন না হলে এই পরিস্থিতি চলতে থাকবে বলে অনুমান করা যায়।
তবে সরকারের উচিত সামাজিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা নির্মূল করতে কাজ করা। কেননা রাষ্ট্রীয় দুর্বল ব্যবস্থাপনায় সামাজিক বৈকল্যের কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
alif@cgs-bd.com
