আপনি একজন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ। বছরে একবার হলেও ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে আপনার থাকে। কিন্তু তা সম্ভব হয় না। আপনি মনে করেন, এর জন্য আপনার আর্থিক অবস্থা দায়ী। আসলে, তা নয়। কেবল আর্থিক অবস্থার জন্যেই আমাদের পছন্দের কাজগুলো বাকি থাকে না। সেগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যায়; কারণ, খরচের উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ শূন্য। আর এই খরচ নামক পাগলা ঘোড়াকে লাগাম লাগিয়ে রাখতেই ব্যক্তিগত বাজেট করা খুবই প্রয়োজন।
বাজেটের কথা ভেবে, কাজটি প্রথমে বিরক্তিকর ও কষ্টসাধ্য মনে হতে পারে। তবে অল্প কিছু ধাপ ও কৌশল প্রয়োগ করলেই আমরা সহজেই বাজেট তৈরি করতে পারবো। তাই, আজকের লেখায় আমরা জানব, কীভাবে বাজেট করা যায় এবং এটি করা আমাদের জন্য কেন দরকার।
বাজেট কী?
'বাজেট কীভাবে করব', এটি জানার আগে 'বাজেট কী'- এ বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার।
বাজেট হলো আয় ও ব্যয়ের একটি তুলনামূলক হিসেব, যা আপনার খরচকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাজেটের উদ্দেশ্য হলো, মূলত আয়ের সাথে ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- এটি তুলে ধরা এবং দিনশেষে আপনি লাভবান হচ্ছেন, নাকি লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন- তা ধরিয়ে দেওয়া।
এখন জানা যাক, বাজেট কীভাবে করা যায়।
ধাপ ১. খরচের রশিদগুলো সংগ্রহ করা
প্রতিমাসে যে সকল খরচের বিনিময়ে রশিদ পেয়ে থাকেন, সেগুলো একসাথে জমা করুন। যেমন: বিদ্যুৎ বিল। সেটা বিকাশের মাধ্যমে হলে পরিশোধ করা হলে অ্যাপ থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে আলাদা করুন। এছাড়াও ডিশের বিল, ব্রডব্যান্ড সংযোগের বিল, বাসা ভাড়ার রশিদ (যদি থাকে) অন্যান্য ব্যাংক সংক্রান্ত বিলের রশিদ ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। রশিদ থাকলে হিসেব করতে সুবিধা হয়। রশিদ না থাকলে নিজে থেকে কোথাও লিখে রাখলেও ভালো হয়।
এই রশিদগুলো একসাথে করে এতে খরচ হওয়া টাকার পরিমাণ খাতায় কিংবা গুগল স্প্রেডশিটে তুলে ফেলুন। তারপর রশিদসহ টাকার পরিমাণ যোগ করে রাখুন।
ধাপ ২. নির্দিষ্ট খরচের তালিকা তৈরি করা
প্রতি মাসে আমাদের কিছু বাধ্যতামূলক খরচ থাকে, যা এড়ানো যায় না। এই বাধ্যতামূলক খরচে ব্যয়িত অর্থসহ একটি তালিকা তৈরি করুন। এর মধ্যে যেগুলোর রশিদ আছে, সেগুলো ব্যতীত বাকিগুলো অন্তর্ভুক্ত করুন। যেমন: চাল-ডাল ইত্যাদি বাজার বিষয়ক খরচ, টিউশন মাস্টারের ফি (যদি থাকে), কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য পরিবহণ খরচ, সঞ্চয়ের খরচ, ব্যবসায়ী হলে কর্মচারীদের বেতন ইত্যাদি এতে অন্তর্ভুক্ত করুন। তাছাড়া যে মাসে কর প্রদান করে থাকেন, সে মাসে করের অর্থ অন্তর্ভুক্ত করুন। আগের মতোই এটিও নির্দিষ্ট স্থানে তুলে রাখুন।
ধাপ ৩. অনির্দিষ্ট খরচের তালিকা তৈরি করা
নির্দিষ্ট খরচের পাশাপাশি আমাদের এমন কিছু খরচ থাকে, যা প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন হয় কিংবা কখনো হয়ও না। এধরনের খরচকে আমরা অনির্দিষ্ট খরচ অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। এ খরচগুলোর মধ্যে থাকতে পারে, অসুস্থতা জনিত খরচ, যন্ত্রপাতি মেরামতের খরচ, ভ্রমণ সংক্রান্ত খরচ, বাইরে খাওয়া-দাওয়া, বই কেনা, সিনেমা দেখা, পোশাক বা পছন্দনীয় জিনিস কেনাকাটা সংক্রান্ত খরচ ইত্যাদি। আগের মতো এই খরচসমূহ লিপিবদ্ধ করুন। এর পর এসব খাতে খরচের পরিমাণ যোগ করুন।
ধাপ ৪. নিজের আয়ের উৎসগুলোর তালিকা তৈরি করা
খরচের তালিকা সম্পূর্ণ হয়েছে। এখন আয়ের তালিকা তৈরি করে ফেলুন। আয়ের তালিকা তৈরি করা অনেক সহজ। আপনি যদি নির্দিষ্ট বেতনপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী হন, তাহলে সেটি লিপিবদ্ধ করুন। চাকরির পাশাপাশি অন্য কোনো কাজ থাকলে এ টাকা অন্তর্ভুক্ত করুন। অর্থাৎ, ব্যয়ের মতোই যে আয় আপনার নির্দিষ্ট, তার একটি হিসেব খাতায় অথবা স্প্রেডশিটে তুলে রাখুন।
আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, সেক্ষেত্রে আপনার বিগত ছয়মাসে যত টাকা মুনাফা হয়েছে, তার একটি গড় বের করুন এবং গড় অর্থের পরিমাণটি হিসেবের খাতায় অন্তর্ভুক্ত করুন। ফ্রিল্যান্সিং হলে গত ছয়মাসে যত আয় হয়েছে, তার গড় করে হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করুন। আয় অনির্দিষ্ট হলেই গড় হিসেব বের করুন।
তারপর যাবতীয় আয়ের খাত হতে উপার্জিত অর্থসমূহ যোগ করুন। উল্লেখ্য, নিজের প্রতি নিজের সৎ থাকতে হবে।
ধাপ ৫. হিসেব করা
এখন ক্যালকুলেটর হাতে নিয়ে সহজ যোগ-বিয়োগ করুন। আপনার খরচের পরিমাণ আয় হতে কম হলে আপনি লাভের খাতায় আছেন, আর বেশি হলে লোকসান।
ধাপ ৬. সিদ্ধান্ত নেওয়া
লাভ বা ক্ষতির হিসেব হাতে পেলে আপনি আপনার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিন, আপনি কীভাবে নিজের আর্থিক গাড়ি পরিচালনা করবেন। খরচ বেশি হলে সিদ্ধান্ত নিন, কোথায় খরচ অতিরিক্ত বা অহেতুক হচ্ছে। সে অনুযায়ী উক্ত খাতের টাকা অন্য কোথাও ব্যয় করুন।
যদি লাভ হয়ে থাকে, তাহলে সিদ্ধান্ত নিন কীভাবে এই লাভের চাকা সচল রাখা যায়। বাড়তি টাকা বিনিয়োগ করুন, প্রয়োজনীয় জিনিস কিনুন বা তিন/পাঁচ/দশ বছর মেয়াদী কোনো সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করুন। সংকটকালীন অর্থ হিসেবেও জমা রাখতে পারেন।
আপনার স্প্রেডশিটের হিসেব প্রতিমাসে সংস্কার করুন এবং নিয়মিত চোখ রাখুন খরচের প্রতি।
কেন বাজেট করব?
ফিরে যাওয়া যাক লেখার প্রথম অংশে। আপনি ঘুরতে যেতে চান, তবে আপনার ধারণা হলো, আপনি অর্থের অভাবে যেতে পারছেন না। এ সমস্যার সমাধান আপনি পেয়ে যাবেন আপনার তৈরিকৃত বাজেটে।
আপনার বাজেটই আপনাকে বলে দেবে, কোথায়, কত খরচ হচ্ছে। ফলে, আপনার আয় ও ব্যয়ের উপর আপনি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন। যে খাতে অতিরিক্ত টাকা হিসেব করেছিলেন, সেটি ভ্রমণে স্থানান্তর করুন। নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী ঘুরতে চাইলে তিনমাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেন। এভাবেই বাজেট আপনাকে আপনার ইচ্ছা পূরণে সহায়তা করবে। এটিই এর উপকারিতা।
এছাড়াও বাজেট আপনাকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। ঝুঁকি নেওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা বলে দেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, করোনা পরিস্থিতির মতো যেকোনো মহামারির সময় এটি আপনাকে এমনভাবে সহায়তা করবে, যা আপনি হয়তো কখনো ভেবেও দেখেননি। তাই বাজেট তৈরির বিষয়টি একটু কষ্টসাধ্য হলেও দিনের কিছু সময় এতে ব্যয় করে তৈরি করে ফেলা উচিত।
মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com
