ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিভিন্ন ব্যাংক, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন অনেকে। তবে ব্যক্তিপর্যায়ে এমন ঋণ নেওয়ার আগে কিছু বিষয় জেনে নেওয়া জরুরি।
ক্রেডিট স্কোর
ঋণ নিতে আগ্রহী ব্যক্তিকে তার মাসিক আয়, বর্তমানে তিনি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ইন্ডাস্ট্রিতে সেটির অবস্থান, প্রতিষ্ঠানটির বেতন কাঠামো ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ক্রেডিট স্কোর দেওয়া হয়। ক্রেডিট স্কোর ভালো হলে ঐ ব্যক্তি ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত বলে ধরা হয়।
সাধারণত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়। তাই কোনো ব্যক্তি ঋণ নেওয়ার আগে তার ক্রেডিট স্কোর সম্পর্কে জেনে নেওয়া আবশ্যক। বর্তমানে অনলাইনে ক্রেডিট স্কোর ব্যক্তি নিজেই করে নিতে পারেন।
সুদের হার
যেকোনো ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ঋণ নেওয়ার আগে অবশ্যই মাথায় রাখা প্রয়োজন। আসল টাকার পাশাপাশি মেয়াদান্তে সুদের পরিমাণ পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব হবে কিনা। বর্তমানে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে ৯ শতাংশ মাসিক সুদের হারে ঋণ পাওয়া যায়।
নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা বেশি হয়। অন্যদিকে এনজিওর ক্ষেত্রে এ সুদের হার ১৮-২৪ শতাংশ হতে পারে।
তবে হার বেশি হলেও নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এবং এনজিও থেকে কিছুটা সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যায়। তাই যখন ব্যাংক থেকে কোনো ব্যক্তি ঋণ পেতে ব্যর্থ হবেন তখন তিনি সামর্থ্য অনুযায়ী নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কিংবা এনজিও থেকে ঋণ নিতে পারেন।
ভর্তুকি সুবিধা
দেশের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অনুদান হিসেবে সরকার অনেক সময় সুদের উপর ভর্তুকি প্রদান করে। যেমন ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশ হলেও তখন এর চেয়ে কম সুদের হারে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ প্রদান করে থাকে।
দেশে কোনো দুর্যোগ কিংবা মহামারি চলাকালেও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এমন ভর্তুকি সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
ঋণের মেয়াদ
প্রতিটি ঋণের ক্ষেত্রে একটি মেয়াদ বিবেচনা করা হয়। সাধারণত ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি সবধরনের ঋণ পাওয়া যায়। আবার নন-ব্যাংকিং এবং এনজিওতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেশি দেখা যায়। ঋণ নেওয়ার আগে ঋণের মেয়াদ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
ইএমআই সম্পর্কে ধারণা
ইএমআই (ইকুয়েটেড মান্থলি ইন্সটলমেন্ট) বলতে বোঝায় একটি মেয়াদের জন্য গ্রহণকৃত ঋণ মেয়াদান্তে সুদসহ যত টাকা হবে ঐ টাকাকে কিছু নির্দিষ্ট মাসে ভাগ ভাগ করে প্রতি মাসে পরিশোধ করা। প্রতিষ্ঠানভেদে ইএমআই সুবিধা ভিন্ন হতে পারে। তাই ঋণ গ্রহীতাকে ঋণ গ্রহণের পূর্বে এসব বিষয় জেনে নিতে হবে।
প্রসেসিং চার্জ
ঋণ গ্রহীতাকে বিভিন্ন ধরনের চার্জ যেমন - এককালীন চার্জ, জিএসটি চার্জ ইত্যাদি পরিশোধ করতে হতে পারে। আর এসব বিষয়গুলো অবশ্যই ঋণ গ্রহণের সময় খেয়াল করা প্রয়োজন।
বিলম্ব পরিশোধ চার্জ
ঋণ পরিশোধ কিংবা ইএমআই এর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হয়। তবে কোনো কারণে ঋণ গ্রহীতা যদি প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন তাহলে উক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিলম্ব চার্জ আরোপ করা হতে পারে। তাই ঋণ নেওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের সামর্থ্যটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
অগ্রিম ঋণ পরিশোধ
কোনো ব্যক্তি যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ গ্রহণ করেন কিন্তু উক্ত সময়ের আগেই সুদসহ ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করতে চান তাহলে সেটিকে অগ্রিম ঋণ পরিশোধ বলা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে এর জন্য চার্জ প্রদান করতে হলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ সুবিধাটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়। তাই কোনো ব্যক্তি মেয়াদের পূর্বেই ঋণ পরিশোধ করতে চাইলে এ বিষয়টি সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
এসব বিষয়ে আরো জানতে কথা হয় লিভিংট্যাক্সের ফিন্যান্স ডিরেক্টর মোরশেদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ঋণ সাধারনত ব্যক্তিগত আয়ের উপর বিবেচনা করে দেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তি প্রতি মাসে যে বেতন পান তার ১২ গুন পর্যন্ত ব্যক্তিগত ঋণ নিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে ক্রেডিট স্কোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যাংক বিভিন্ন কোম্পানির একটি গ্রেডিং স্কোর নিজেদের কাছে রাখে। আর কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রেডিং স্কোর ভালো হলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ ঋণ নিতে আসলে সহজে ঋণ পাওয়া যায়।
তিনি আরো বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত জামানতের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। তাই জামানত না থাকার অনেক সময় গ্রাহকরা ঋণ নিতে পারেন না। কিন্তু ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি থাকে না। কারণ এখানে ব্যক্তিগত আয়ের উপর ভিত্তি করেই ঋণ পাওয়া যায়। ফলে ঋণ পাওয়াও সহজতর হয়।
ব্যংক, নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, এবং এনজিও এ তিনটির মধ্যে কোন ক্ষেত্রে কোন মাধ্যমটি থেকে ঋণ গ্রহণ করা উত্তম- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমেই ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের চেষ্টা করা উচিত। কারণ এখানে সুদের হার কিছুটা কম হয়। তবে ব্যংক থেকে ঋণ পাওয়া না গেলে নন-ব্যংকিং প্রতিষ্ঠান কিংবা এনজিওতে যাওয়া যেতে পারে।
আবার ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি সব ঋণ পাওয়া গেলেও এনজিওতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি ঋণ পাওয়া যায়। তাই ঋণ নেওয়ার আগে এ বিষয়টিকেও বিবেচনায় আনা উচিত।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com