বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য এ সময়ে সবাই উতলা হয়ে উঠছে কেনো? রাজনীতির দিকে নজর দিলেই কেবল এ প্রশ্নের আংশিক জবাব মিলবে। গাড়ি নির্মাতারা বহু বছর ধরেই বৈদ্যুতিক গাড়ি নামানোর কথা বলছেন। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের কারণেই তাঁরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির যথার্থ তৎপরতা শুরু করেন।
ইউরোপজুড়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্গমন আইনের কড়াকড়ি গত বছর বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রথম বড় ঢেউকে উসকে দেয়। ২০২০-এ গোটা মহাদেশটিতে প্রায় সাত লাখ ৩৪ হাজার ব্যাটারিচালিত গাড়ি বিক্রি হয়। বিশ্বমারির লকডাউনে জীবন-যাত্রার স্বাভাবিক গতি আটকে যাওয়ার পরও এ সব গাড়ি বিক্রি হয় বলে জানায় গাড়িশিল্প সংক্রান্ত শীর্ষস্থানীয় সংস্থা এলএমসি অটোমোটিভ। ২০১৯-এ যে পরিমাণ গাড়ি বিক্রি হয়েছিল তার চেয়ে এ সংখ্যা দ্বিগুণ, অন্যদিকে এর আগের তিন বছরে সর্বমোট যে গাড়ি বিক্রি হয়েছে এ সংখ্যা তারচেয়েও বেশি বলে একই হিসেবে জানায় এলএমসি।
পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের বাঁধন আরো শক্ত করা হচ্ছে। গ্লাসগোতে এক মাসের কম সময়ের মধ্যে সিওপি২৬ জলবায়ু শীর্ষ বৈঠকে বসবে বিশ্বের সব সরকার। নির্গমন কমানোর চোখ ধাঁধানো প্রতিশ্রুতিতে সজ্জিত হয়ে অনেকেই এ সম্মেলনে বসতে চাইছে। নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম সহজ পথই হলো বিদ্যুৎগাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে ডিজেল এবং পেট্রল গাড়ি বিক্রির বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেছে। ২০৩৫-এর মধ্যে এই দুই ধরণের গাড়ি বিক্রি যুক্তরাজ্যে বন্ধ হয়ে যাবে। আর নরওয়ে এ বাবদ আদাপানি খেয়েই নেমেছে। দেশটি বলছে ২০২৫-এর মধ্যেই এ সব গাড়ি পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাব করেছে, ২০৩৫-এর মধ্যে এ সব গাড়ির ওপর কার্যত চড়াও হবে নিষেধাজ্ঞা ।
বৈদ্যুতিকগাড়ির চালকদের সহায়তা এবং তাদের গাড়ি চালনা সহজ করার লক্ষ্যে টাকা খরচের অঙ্গীকার করছে এ সব কমিটি। এ লক্ষ্যে চলার পথে চার্জ ফুরিয়ে গেলে আরামেই যেন চার্জ করতে পারে সে জন্য জায়গায় জায়গায় চার্জ কেন্দ্র বসনোর কথা বলা হচ্ছে। এতে খদ্দের বা ভোক্তাদেরকে বিদ্যুৎগাড়ি ব্যবহারের দিকে দলে দলে টেনে আনা সম্ভব হবে।
মার্সিডিজের মালিক ডাইমলারের প্রধান নির্বাহী ওলা ক্যালেনিয়াস মনে করেন, “সরকারগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থ খরচে নামছে। সবচেয়ে বড় কাজ হলো সরকার এবং গাড়ি শিল্পকে অবকাঠানো বিনিয়োগে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।”
জাতীয় সরকারগুলোই কেবল নয়, এবারে নিগর্মন বিধির রশি আরো কষে বাঁধতে শুরু করেছে অনেক নগর কর্তৃপক্ষও। নগর কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলছে বিশুদ্ধ বায়ু অঞ্চল। সেখানে পুরানো গাড়ি ঢুকলে মোটা হারে টাকা আদায় করা হচ্ছে। নগরের গাড়ি চালকরা পরিবেশেরে দিক থেকে পরিচ্ছন্ন বাহনের দিকে, বিশেষ করে অনেকেই বিদ্যুৎগাড়ির দিকে, ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে।
একইভাবে লন্ডনের “অতি নিম্ন নিগর্মন অঞ্চল” বা “আলট্রা লো এমিশন জোন”- এ পুরানো গাড়ি নাক গলালেই জরিমানা করা হয়। এ মাস থেকে এঅঞ্চলের পরিধি বাড়ানো হবে এবং সার্কুলার রিং রোডগুলোর ভেতরের এলাকা এর আওতায় নিয়ে আসা হবে। এর প্রভাব বর্তাবে ২৬ লাখ গাড়ির ওপর। প্যারিস, ব্রাসেলস এবং আমস্টারডামেরও একই পরিকল্পনা রয়েছে। জার্মানির বহু নগর কেন্দ্রেই পুরানো মডেলের ডিজেল গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে।
লোভনীয় গঠনশৈলী
বাজারে বৈদ্যুতিকবাহনের দেদার সরবরাহকে বিদ্যুৎগাড়ি বিপ্লবের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সব ধরণের গ্রাহকের মনের মতো গাড়িতে বাজার এখন ঠাসা। কিছুদিন আগেও ‘যুতসই’ গাড়ি পাওয়া ছিল মুশকিল। ফলে গ্রাহক চটপট বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার কথা ভাবতেই পারত না। কিন্তু গাড়িনির্মাতারা লোভনীয় গঠনশৈলীর আকর্ষণীয় ব্যাটারি গাড়ি বাজারজাত করার কাজে যারপরনাই সচেষ্ট হয়ে উঠেছে।

একটি চার্জ স্টেশন থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ করছেন একজন নারী
গাড়ি মেলায় বছরের পর বছর ধরে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎবাহন উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরণের গাড়ি নিয়ে প্রশংসামূলক নানা বুলি শোনান হয়েছে। তবে হালে গাড়িনির্মাতারা সব শ্রেণির ক্রেতাকে খুশি করার মতো এক ঝাঁক বিদ্যুৎবাহন বাজারে নিয়ে আসতে পেরেছে। নগরে চলাচলের উপযোগী খুদে গাড়ি থেকে শুরু করে সপরিবারে ভ্রমণ উপযোগী বড় পরিসরের গাড়ি পর্যন্ত সবই এখন পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আরো নানা ধরণের গাড়ি আসবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
পেট্রলচালিত যানবাহনের তুলনায় এ সব গাড়ির অনেকগুলোই দামে বেশ চড়া। তবে এ সব গাড়ি চালানোর খরচ কম। বিশ্ববাজারে তেলের দাম চড়চড় করে বাড়ার সাথে সাথে এ খরচ আরো কমছে। অন্যদিকে এ সব গাড়ি কিনলেও এখনো সরকার প্রণোদনা দেয়। দেয় নানা সুযোগ এবং বিস্তর সুবিধা।
মার্কিন উপদেষ্টা সংস্থা অ্যালেক্সপার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী বাজারে ৩৩০ রকমের বিশুদ্ধ বিদ্যুৎ গাড়ি এবং ব্যাটারি ও পুরানো দিনের ইঞ্জিন উভয়েই চলতে পারে এমন শঙ্কর গাড়ি রয়েছে। পাঁচ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৬টি। আর নতুন নতুন গাড়ি বাজারে আসছে এবং ২০২৫-এর মধ্যে এ সংখ্যা বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে ৫০০-র বেশিতে পৌঁছাবে।
গত বছর বিশ্বমারির প্রকোপ পুরো পৃথিবী যখন কাতরাচ্ছিল তখন গাড়িনির্মাতারা অতি প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো ছাড়া আর সব কাজেই খরচের লাগাম টেনে ধরে। দহন ইঞ্জিন উন্নয়ন খাতে খরচ বন্ধ হয়ে গেলেও তখনো কিন্তু বিদ্যুৎ প্রযুক্তিখাতের খরচ বন্ধ হয়নি। বরং বাস্তবে ব্যয় বেড়েছে।
জেফারিজের মোটর গাড়ি বিষয়ক বিশ্লেষক ফিলিপ হাউচোইস মনে করেন, “গত কয়েক বছরের মধ্যে মোটর গাড়ি শিল্পকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে কোভিড-১৯। এর কারণেই গাড়ি শিল্পখাতকে কঠোর শৃঙ্খলা মেনে চলা রপ্ত করতে হয়েছে।”
সত্যি বলতে কি বৈদ্যুতিক গাড়ির এগিয়ে চলার গতি পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ নির্বাহীদের পর্যন্ত তাজ্জব করে ছেড়েছে। গত সেপ্টেম্বরে রেনল্টের সাবেক প্রধান থিয়েরি বোলেরি জাগুয়ার ল্যান্ড রোভারের প্রধানের দায়িত্ব নেন। সে সময় বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা নিয়ে আঁকিবুঁকি করতে শুরু করেন তিনি । তখন এমন কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। কৌশলটি চূড়ান্ত করতে তার ছয় মাস লেগে যায়। সে সময় এমন গতি দেখতে পান যে প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে যা নির্ধারণ করা হয়েছিল তা আরো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার গ্রহণের তাগিদে বাতিল করতে হয়।
তবে এই টানটান উত্তেজনা সত্ত্বেও বড় বড় গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে এখনো বিচক্ষণ থাকার তাগিদ দেওয়ার লোকের কমতি নেই। তাদের যুক্তি হলো, বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে অতিদ্রুত এগিয়ে গেলে বর্তমানের ক্রেতাদের ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হবে। এ সব ক্রেতারা হয়ত বিদ্যুৎগাড়ির দিকে যেতে পারছে না বলেই অনেকে সতর্ক করছেন। বিএমডব্লিউ’র প্রধান নির্বাহী ওলিভার জিপস বলেন, “ধরুন ২০৩০-এর মধ্যে ইউরোপের বাজারের ৫০ শতাংশ গাড়িই বিশুদ্ধ বিদ্যুৎশক্তির হয়ে যাবে; কিন্তু তখন অন্য ৫০ শতাংশ গাড়ি তো থাকবে। তবে কেউ যদি কেবল এই ৫০ শতাংশকেই সেবা দেবে বলে লক্ষ্য ঠিক করে তবে অনিবার্য ভাবেই তার ব্যবসা কমতে থাকবে। ”
জার্মান এই গাড়ি নির্মাতা অঙ্গীকার করেন যে, ২০২৩’এর মধ্যে সব শ্রেণির গাড়ির ব্যাটারি মডেল ছাড়া হবে। পাশাপাশি শঙ্কর গাড়িতে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এ সব গাড়ি যাত্রাপথের কিছু অংশ ব্যাটারি শক্তিতে চলবে এবং নগর সীমার বাইরে যাওয়ার পর ঐতিহ্যবাহী ইঞ্জিন দিয়ে বাকি পথ পাড়ি দেবে।
ইউরোপ এবং চীনের বাজারে বিদ্যুৎশক্তির গাড়ির বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। তবে উভয় বাজার এখনো ভর্তুকির ওপর গভীর ভাবে নির্ভর করছে।
ফিলিপ হাউচোইস স্বীকার করেন, “ইউরোপে বিদ্যুৎগাড়ি বিক্রির জন্য ক্রেতাদের এখনো ঘুষ দিতে হয়। তবে চীনে এ বাবদ দিতে হয় মাঝারি ধরণের ঘুষ।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
আরো পড়ুন:
বৈদ্যুতিক গাড়ি: চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে নতুন কালের বিপ্লব
