বৈদ্যুতিকযান বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলসের (সংক্ষেপে ইভি) ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে গাড়ি নির্মাতাদের ভবিষ্যৎ। তবে এখনো কিছু পুরানপন্থী ভেবেচিন্তে বৈদ্যুতিকযানের পথে হাঁটতে চাইছেন। দ্রুত বৈদ্যুতিকযানের পথ ধরলে বর্তমান যে সব খদ্দের বা ভোক্তা রয়েছেন তাদের, কিংবা যারা এখনই বৈদ্যুতিকযানকে গ্রহণ করতে রাজি নন তাদের বা এমন বাহন গ্রহণ করতে করতে পারছেন না তাদেরকে অকালে পরিত্যাগ করার মতো কাণ্ড হয়ত ঘটবে
চলতি বছরের শুরুতেই বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা পোলস্টারের নির্বাহীরা যুক্তরাজ্যের জন্য উচ্চাভিলাষী বিক্রি পরিকল্পনা বানান। তবে কয়েক সপ্তাহ যাওয়ার আগেই সে নকশাকে ছিঁড়ে ফেলতে বাধ্য হন তাঁরা।
চাহিদা বাড়ছে হু হু করে। নতুন যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলো তা আগের তুলনায় ফুলে ফেঁপে এক তৃতীয়াংশের বেশিতে গিয়ে ঠেকল। এখন ভোলবো-সমর্থিত এ কোম্পানিকে শুধু যুক্তরাজ্যেই মাসে ১০০০ হাজার পরীক্ষামূলক গাড়ি চালাতে হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষামূলক গাড়ি চালানোর নতুন নতুন জায়গা ভাড়া করতে হচ্ছে। এ সব জায়গা খালি হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভাড়াও করতে হচ্ছে।
মাত্র চার বছর আগেই পোলস্টার ছিল উচ্চক্ষমতার দহন ইঞ্জিন তৈরিতে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান। ব্যাটারি গাড়ির চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। এ চাহিদাকে মুনাফায় পরিবর্তন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে যে সব কোম্পানি তারই অন্যতম হয়ে উঠেছে পোলস্টার। এবারে পোলস্টারের পুরোই ভোল পাল্টে গেছে। পোলস্টারের যুক্তরাজ্যের প্রধান জোনাথন গুডম্যান বলেন, “দুই বা তিন বছর আগেও গাড়ির জগতে ব্যাটারি গাড়ির বাজারকে কুলুঙ্গি বা খুদে বিশেষায়িত বাজার হিসেবেও গোণা হতো না।”
বৈদ্যুতিক যানের অসাধারণ চাহিদা বাড়ার ঘটনা গোটা দুনিয়া জুড়েই টের পাওয়া যাচ্ছে। সাংহাই থেকে স্টুটগার্ট, টোকিও থেকে টরেন্টো, নতুন নতুন কোম্পানি থেকে শুরু করে গাড়ি শিল্পের পুরানো এবং প্রতিষ্ঠিত, বিশাল কোম্পানি সবাই পরিবর্তনের হাওয়া ভালো করেই টের পাচ্ছে।
বিশেষ করে ইউরোপে পরিবর্তনের বাতাস যেন প্রচণ্ড বেগে বইছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত যে সব গাড়ি বিক্রি হয়েছে সেগুলোর প্রতি ১২টার মধ্যে একটি ব্যাটারিতে চলে। তেলে এবং ব্যাটারিতে উভয়েই চলে এমন হাইব্রিড বা শঙ্কর গাড়িকে হিসাবে ধরা হলে দেখা যাবে, প্রতি তিনের মধ্যে একটিই শঙ্কর গাড়ি। ২০১৮-তে ইউরোপে বিদ্যুৎগাড়ি বিক্রি হয়েছে এক লাখ ৯৮ হাজার। চলতি বছরে লাফ দিয়ে এ সংখ্যা বাড়বে বলে ধারণা হচ্ছে। অর্থাৎ ১১ লাখ ৭০ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির ভবিষ্যত বার্তা দেওয়া হয়েছে!

২০১৯ সালে জার্মানির একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা পরিদর্শনকালে শ্রমিকদের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল
তবে, এখনো দুনিয়ার যাত্রীবাহী গাড়ি বহরের মাত্র এক শতাংশ দখল করতে পেরেছে বৈদ্যুতিক গাড়ি। আর এমন গাড়ির বিক্রিও বাড়ছে দ্রুত গতিতে । ব্লুমবার্গএনএইএফের হিসাবে বলা হয়, আগামী মাত্র চার বছরের মধ্যেই চীনে যে সব নতুন গাড়ি কেনা হবে তার চারভাগের এক ভাগই হবে বিদ্যুৎশক্তির। আর একই সময়ে জার্মানির ৪০ শতাংশ হবে অনুরূপ গাড়ি। বিশ্বে ২০২৫-এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি এক কোটি ৭ লাখে দাঁড়াবে, আর ২০৩০’এর মধ্যে এ সংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ ছোঁবে।
কিছুদিন আগ পর্যন্ত অনেক চালকই বৈদ্যুতিক যানের কথা উঠলে ভাবতো, ও সব ভবিষ্যতের গপ্প। আর এখন বিষয়টা খুবই আটপৌরে হয়ে গেছে। নিজের পরবর্তী গাড়িটি বৈদ্যুতিক গাড়ি হবে ধরে নিয়ে সহজেই জল্পনা-কল্পনা করছেন অনেকে।
প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলছিল যে বিষয় সেটাই কওয়া নাই বলা নাই হঠাৎ করে ঘোড়ার গতি নিয়ে ছুটতে শুরু করে, এমন ঘটনা পৃথিবী অনেকবারই দেখেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বেলাও একই কাহিনি ঘটছে। অল্প সময়ের মধ্যে গাড়ি শিল্পের রূপবদলের, ভোল পাল্টে, গাড়ি চালনার ভাষায় বলা যায়, প্রথম গিয়ার থেকে একটানে পঞ্চম গিয়ারে চলে গেছে।
গাড়ি নির্মাণ শিল্প অনেক অর্থনীতিতেই গুরুত্বের জায়গা দখল করে আছে। রূপবদলকে কেন্দ্র করে এ শিল্পাঙ্গন প্রচণ্ড নাড়া খেয়েছে। চাকরি, নগর উন্নয়ন,এমনকি, ভূ-রাজনীতিতে এর বিশাল ধকল পড়বে।
২০১০-এ নিশান কোম্পানি প্রথম বৈদ্যুতিকগাড়ি নিশান লিফের গণউৎপাদন শুরু করে। নিশানকে এ উৎপাদন কাজে সহায়তা করেন কোম্পানির তৎকালীন নির্বাহী অ্যান্ডি পামার। নিশানের সাবেক এই নির্বাহী মোটর শিল্পের দুনিয়ায় নব পরিবর্তনকে “ঘোড়া থেকে গাড়ির যুগের দিকে যাওয়ার মতো ঘটনা” হিসেবে চিহ্নিত করেন।
পামার এখন সুইস মোবাইলিটি নামের একটি বৈদ্যুতিকবাস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি আরো বলেন, “এই পরিবর্তন হলো একটি ভূকম্পন, যা সব কিছুকেই বদলে দিচ্ছে, এমন ভাবে বদলে দিচ্ছে যে ময়দানের কোনো খেলোয়াড় যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, যদি বিনিয়োগ না করে, ভবিষ্যতে তার টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেইই।”
টেসলার বিস্ময়কর সাফল্য বা বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে চীনের কিছু কোম্পানি গোষ্ঠীর আগ্রাসী উচ্চাভিলাষই এ বাহনের দিকে দৃষ্টি টেনে এনেছে। প্রতিষ্ঠিত গাড়িনির্মাতারা গত এক বা দু’বছরে যে সাড়া দিয়েছে তা ই আরেক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
বিশ্বখ্যাত এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাড়ি নির্মাতারা এখন তাদের কপালকে বৈদ্যুতিক গাড়ির সাথে জুড়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফোর্ডের এফ ১৫০ লাইটেনিং ট্রাক থেকে শুরু করে ভক্সওয়াগানের আইডি পর্যায়ের গাড়িগুলোর উদাহরণ দেওয়া যায়। বিশ্বমারির কারণে বন্ধ থাকায় গত দুই বছরের মধ্যে ইউরোপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি মেলা অনুষ্ঠিত হলো সেপ্টেম্বরে মিউনিখে। মিউনিখ গাড়িমেলায় পেট্রল মোটর গাড়ির নতুন কোনো মডেলেরই দেখা প্রায় মেলেনি।
মার্কিন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা কোম্পানি ম্যাককিনসের হিসাবে, ২০২০-এর শুরুতেই বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পুঁজি আকর্ষণ করেছে। তবে এও বাহ্য! মার্কিন উপদেষ্টা সংস্থা অ্যালেক্সপার্টনার্স বলছে, বিদ্যুৎ গাড়ি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তিতে পরবর্তী পাঁচ বছরে ৩৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ঘোষণা দিয়েছে গাড়ি নির্মাতারা। গত ১২ মাসে এ অর্থের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানায় অ্যালেক্সপার্টনার্স। একই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান্ড্রু বার্গবাম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “একে কি ক্রান্তিকাল বলা যাবে?” তারপর তিনি নিজেই জবাব দেন, “আমার মনে হয় জবাবটি হবে, হ্যাঁ।”
কিছু দিন আগেও অভাবনীয় ছিল এমন তৎপরতায় নেমেছে অনেক নির্মাতা। তারা অন্তর্দহন ইঞ্জিন পর্যায়ক্রমে বাতিল করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গাড়ি আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় জার্মানির মার্সিডিজ-বেঞ্জকে। চলতি দশকের মাঝামাঝি থেকে মার্সিডিজ কেবল বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করবে। মার্সিডিজের মালিক ডাইমলারের প্রধান নির্বাহী ওলা ক্যালেনিয়াস মনে করেন, “কয়েক বছর আগে যা মনে করেছি তার তুলনায় অনেক বেশি জোর কদমে চলছি আমরা।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
