বুত্থানচারী প্রিন্স ও বাংলাদেশে বুত্থান


মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Published: May 06, 2022 13:08:56 | Updated: May 09, 2022 01:13:17


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুত্থান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শাকিল বোরহান প্রিন্স

প্রতি শনি-সোম-বুধবার সকাল সাতটায় টিএসসি এলেই দেখা মেলে কালো শার্ট ও ট্রাউজার পরা কিছু প্রশিক্ষণার্থীর৷ আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তারা মার্শাল আর্ট শিখছেন। তবে সেটি কুংফু-কারাতে বা এমন কিছু নয়। এই বিশেষ ধরণের মার্শাল আর্টের নাম 'বুত্থান'। প্রশিক্ষক হিসেবে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুত্থান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শাকিল বোরহান প্রিন্স। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ক্রীড়া, কল্যাণ, আত্মরক্ষা ও আত্মশুদ্ধি - এই চারটি মূলনীতি নিয়ে মূলত কাজ করে বুত্থান। বুত্থানে যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন তারা পরিচিত হন 'বুত্থানচারী' বলে। তাদের স্লোগান- 'দেহ হবে লৌহের মত, হৃদয় হবে ফুলের মত'।

প্রিন্সের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, বুত্থান মূলত বাংলাদেশের মার্শাল আর্ট। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মার্শাল আর্টের বিভিন্ন রূপ আছে। যেমন- কারাতে, কুংফু, তায়কোয়ান্দো। চীন-জাপানের দিকে কুংফু-কারাতে বেশি প্রচলিত, আবার তায়কোয়ান্দো কোরিয়ার, তেমনিভাবে বুত্থান বাংলাদেশের।

বাংলাদেশে বুত্থানের শুরু হয় ইউরি বজ্রমুনির হাত ধরে। তিনি ম্যাক ইউরি নামেও পরিচিত। ১৯৮১ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু। পরে ২০১৩ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক এটি স্বীকৃতি পায়। বুত্থানের মূল কেন্দ্র রাজশাহীতে।

প্রিন্স জন্মসূত্রে রাজশাহীর মানুষ। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় তার বুত্থানের সাথে যুক্ত হওয়া। সেটা ২০১০ সালের ডিসেম্বরের কথা। তিনি মার্শাল আর্ট শেখার জন্য রাজশাহীর মার্শাল আর্ট সেন্টারগুলোতে যাতায়াত শুরু করেন। তার বাড়ি থেকে কাছে ছিলো একটা সেন্টার, আর দুটো দূরে। পাকাপাকিভাবে যেখানে শেখার কথা ছিলো, সেটি সেদিন বন্ধ থাকায় তিনি আরেকটি সেন্টারে চলে যান। ওটিই ছিলো বুত্থান ক্লাব। তিনি প্রথমে মনে করেছিলেন ভুটানের সাথে হয়ত সম্পর্কিত, তাই এমন নাম। কিন্তু পরে দেখলেন আসলে তা নয়। এই বুত্থান এমনকি মার্শাল আর্টেরও আদি সংযোগ রয়েছে এই ভারতবর্ষের সাথেই।

বুত্থান প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে নিজেকে নতুন মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করলেন তিনি। তার কথায়, বুত্থানে মনোদৈহিক সংযোগ প্রয়োজন। ব্যাপারটা শুধু শারীরিক কসরতের বিষয় নয়। যেমন ধরুন, কারাতে স্ট্রাইকিং। জুডো আবার স্ট্রাইকিং না তেমন। মানে, মার না দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা বা এমন করা হয়। তায়কোয়ান্দো অন্যরকম। বুত্থান শারীরিক কসরতের সাথে সাথে মানসিক দিকেও জোর দেয়। যেমন - একটা মাইকে কথা বললে, কথা শুনতে পাওয়ার জন্য স্পিকার ঠিক থাকতে হয়। আবার স্পিকার ঠিক, কিন্তু মাইক নষ্ট - তাও হবেনা। এখানে দেহ হলো স্পিকার, আর মন হলো মাইক। কাজেই মন থেকে বিষাক্ত ব্যাপারগুলো দূর করার উদ্যোগ বুত্থান নেয়।''

প্রিন্স আরো যোগ করলেন, এখানে দুটো দিক আছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক। ব্যক্তিগত পর্যায়ে চারটি ধাপ আছে। ক্রীড়া, কল্যাণ, আত্মরক্ষা ও আত্মশুদ্ধি৷ আবার সামাজিক দিক বলতে কল্যাণকর বিভিন্ন কাজ, যেমন- আমরা যখন প্রাকটিস করবো, তখন আগে সবাই মিলে টিএসসির মাঠের একটা অংশ পরিষ্কার করতে পারি। এটার কারণ এভাবে ভাবা যায় যে, আমরা মাঠটা পরিষ্কার করলাম। এরপর আমরা অনুশীলন করবো। মানে অনুশীলন করব, তাই মাঠ পরিষ্কার - এমন না ভেবে মাঠ আমরা আন্তরিকভাবে পরিষ্কার করে তারপর অনুশীলনে গেলাম।

অন্যভাবে বললে, বুত্থানের চারমাত্রা আছে- সাধনা, প্রজ্ঞা, বর্জন ও সজ্ঞা। সাধনার ব্যাপারটা শারীরিক বা বাহ্যিক। প্রজ্ঞার বিষয়টি মানসিক অর্জন। বর্জন হলো নিজের বিষাক্ততা দূর করা, আরো ভালো মানুষ হয়ে ওঠা। সজ্ঞা হলো এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত আত্মোপলব্ধি। নিজের ইতিবাচক পরিবর্তনসমূহ টের পাওয়া।''

এই পরিবর্তন টের পাবার সাথে সাথে প্রিন্সের সামনে উন্মোচিত হয় রোমাঞ্চকর এক ইতিহাস। তিনি ক্রমান্বয়ে জানতে পারেন মার্শাল আর্ট বলতে সাধারণত আমরা সবাই চীন-জাপান বুঝলেও এর শুরু কিন্তু অনেক আগে এই ভারতবর্ষ থেকেই!

কাঞ্চিপুরাণ নামে একটি জায়গা ছিলো দক্ষিণ ভারতে। ওখানে যোধিধর্মা বলে এমন একজন গুরু ছিলেন। উনি ছিলেন ক্ষত্রিয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ যারা করতেন। তার শিক্ষক আবার ছিলেন প্রজ্ঞাতারা যোধিধর্মা চীনদেশে যান ধর্ম প্রচারে৷ তিনি নৃতাত্ত্বিকভাবে ছিলেন দ্রাবিড়ীয় - ডার্ক স্কিন বা কালো চামড়ার মানুষ। একারণে চীনদেশের অনেকে তাকে ঠিক মেনে নিতে পারেনি।

তবে তিনি চীনের শাওলিন মন্দিরে ধ্যান করতে ও করাতে শুরু করেন। তার আত্মরক্ষা বিষয়ক কলাকৌশল অনেককে চমৎকৃত করে। এখনো মন্দিরে তার চর্চার বা ধ্যানের দেয়ালচিত্র আছে। তবে পরে উপমহাদেশে এটার তেমন বিকাশ হয়নি৷ বরং, ওখান থেকে চীন - জাপানে ছড়িয়ে যায়। ওকিমাওয়ায় যেমন শুরু হয় কারাতে, শাওলিনে কুংফু, কোরিয়ায় তায়কোয়ান্দো। সেদিক থেকে বুত্থানকে বরং বাইরে থেকে অণুপ্রাণিত হয়ে আসা বলা যায়না, বরং আমাদের এই ভারতবর্ষ থেকেই যে ওদিকে গেছে - তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে প্রিন্সের কাছে।

প্রিন্স মনে করেন বুত্থান মূলত গুরুমুখী বিদ্যা। কাজেই অধ্যবসায়ের সাথে সময় নিয়ে শিখতে হবে। উপযুক্ত গুরু যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিষ্যেরও ধারাবাহিকভাবে অনুশীলন করে যাওয়া প্রয়োজন। বুত্থান শুধু শারীরিক কসরত নয়, মনোদৈহিক সংযোগ।

গুরু ইউরি বজ্রমুনির একটা কথা উদ্ধৃত করলেন তিনি- 'দেহ হবে লৌহের মত, হৃদয় হবে ফুলের মত'। অর্থাৎ, এটা একজন ব্যক্তিকে সহিংস করবেনা, বরং আত্মরক্ষা করতে শেখাবে। কারণ, বুত্থানের মূল অর্থই হলো উন্নতি হওয়া বা জাগ্রত করা। সনাতনকে সত্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করা। সংঘাত রহিতকরণ ও আত্মউন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। তাই এতে ঝুঁকি নেই, বরং আমাদের মনের কুপ্রবৃত্তি দূর করতে বা বিষাক্ততা কমাতে এটি বেশ সহায়ক হবে৷''

আর সেই প্রত্যয় নিয়েই প্রিন্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন বুত্থান ক্লাব। প্রতি শনি, সোম ও বুধবার টিএসসি প্রাঙ্গনে সকাল সাতটায় শুরু হয় প্রশিক্ষণ। যেকোনো তথ্যের জন্য আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারেন- butthanagar@gmail.com

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করেছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like