বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গবেষণা খাতে অনেকদূর এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে অনেক। এদেশে যতটুকু গবেষণা হয় তার সিংহভাগই হয়ে থাকে বিজ্ঞান খাতে। এখন প্রশ্ন হলো বিজ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবসায়, মানবিক এবং সমাজবিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ কতটুকু?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভৌগোলিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ব্যবসায়-বাণিজ্যের অনুকূলে। আর এসকল সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন আরো বেশি বাজার গবেষণা।
দেশের বিভিন্ন শ্রেণি আর গোষ্ঠীর মাঝে এখনো আছে নানান প্রথা, কুসংস্কার আর ট্যাবুর চর্চা। এ ব্যাপারটি প্রমাণ করে যে সমাজ ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা কতটা জরুরি।
তবে বর্তমানে এসব বিষয়ে গবেষণার পরিধি পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। আর এসব বিষয়ে যত বেশি গবেষণা হবে তা দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক পরিবেশের উপর তত বেশি অবদান রাখবে।
এই প্রসঙ্গে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফের সাথে। জটিল ও তাত্ত্বিক কথাবার্তায় না গিয়ে একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেন তিনি।
“একজন গবেষক যখন নতুন কোনো ধানবীজ আবিষ্কার করেন তখন সেটি মানুষের জীবনযাত্রার উপর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই আমাদের গবেষকদেরও উচিত গবেষণা করে যে বিষয়গুলো উদ্ভাবন করবেন সেগুলোকে বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করা।”
তবে গবেষণার ফলাফল প্রয়োগের ক্ষেত্রও একইসাথে যাতে বাড়ানো হয়, সেই আশা রাখেন তিনি।
“আমাদের দেশের গবেষণাগুলো অনেকক্ষেত্রে পাবলিকেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। গবেষণাগুলোকে পাবলিকেশনের পাশাপাশি বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য করতে হবে।”
বাংলাদেশে ব্যবসায়, মানবিক, এবং সমাজবিজ্ঞানের গবেষণায় সমস্যাগুলো কি কি এবং সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই আরেক সহযোগী অধ্যাপক ড. জাপান বড়ুয়ার সঙ্গে। মার্কেটিং বিভাগের এই শিক্ষক গবেষণার দ্বার রুদ্ধ করে রাখা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দিলেন।
“আমার মতে উক্ত বিষয়গুলোতে গবেষণার পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে মূলত তিনটি বিষয়। প্রথমটি হলো উপযুক্ত গবেষণা পরিবেশের অভাব। আমাদের দেশের অনেকেই জানে না কীভাবে গবেষণা করতে হয় বা কোন পর্যায় থেকে এটি শুরু করতে হয়।”
“দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো ফান্ডিং-জনিত সমস্যা। গবেষণা খাতে যতটুকু বরাদ্দ দেওয়া উচিত সে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে গবেষণা বিষয়ক কিছু ওয়েবসাইট আছে যেগুলো ব্যবহার করতে ফি দিতে হয়। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এমন কিছু ওয়েবসাইট ব্যবহারের খরচ বহন করে, কিন্তু এর সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার।”
“বাংলাদেশে গবেষণা করে যথেষ্ট মূল্যায়ন না হওয়া তৃতীয় সমস্যা। অন্যান্য দেশে যেখানে গবেষকরা কোনো একটি গবেষণা করার পরে মোটা অংকের সম্মানী পেয়ে থাকেন, বাংলাদেশে তা পাওয়া যায় না। তাই অনেকেই গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন,” যোগ করেন তিনি।
ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের এমবিএর ছাত্র মোঃ মুফিদুর রহমান গবেষণা করছেন ছাত্রাবস্থায়। তিনি বলেন, “এখনো পর্যন্ত আমার কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধ বের হয়েছে। কিন্তু এ গবেষণাগুলো করতে গিয়ে বড় সমস্যা ছিল ফান্ডি। একজন ছাত্রের পক্ষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গবেষণা করতে যে খরচ হয় তা বহন করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না।”
শিক্ষকরা যদি তাদের গবেষণা কাজে শিক্ষার্থীদেরকে সহযোগী হিসেবে রাখেন তাহলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা গবেষণার বিষয়গুলো শিখতে পারবেন, একইসাথে ফান্ডিং সমস্যারও কিছুটা সমাধান হতে পারে, এমনটা মনে করেন তিনি।
বর্তমানে বিজ্ঞানের পাশাপাশি এ তিনটি ক্ষেত্রেও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কিছু সংগঠনের আওতায় কিছু গবেষণা বিষয়ক ইভেন্ট আয়োজন করা হয় এ ক্ষেত্রগুলোতে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এসব বিষয়ে বর্তমানে সহযোগিতা মিলছে।
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ গবেষনার মাধ্যমে মৌলিক জ্ঞান উৎপাদনের কাজ যদি যথেষ্ট পরিমাণে না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষার পুরো ধারণাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
tanjimhasan001@gmail.com
