ডাউন সিনড্রোম সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে তুলতে এবং আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সকলকে আহ্বানের উদ্দেশ্যে আজ ২১ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস।
ডাউন সিনড্রোম একটি অন্যতম প্রধান ক্রোমোসোমাল ডিজঅর্ডার। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬,০০০ শিশু এই শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অর্থাৎ, প্রতি ৭০০ জন নবজাতকের মধ্যে ১ জন জন্মগতভাবে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে এই ক্রোমোসোমাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩০% বেড়েছে।
এটি একটি জেনেটিক অবস্থা এবং এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহের ২১ নং ক্রোমোসোমে আরো একটি বাড়তি ক্রোমোসোম থাকে।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গঠনগত, আচরণগত এবং বেশকিছু রোগজনিত জটিলতা দেখা যায়।
গঠনগত জটিলতা
সমতল মুখাবয়ব, অপেক্ষাকৃত ছোট মাথা এবং কান, ঘাড় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ছোট হয়, মোটা জিহ্বা, দেখলে মনে হবে চোখদুটো যেন খানিকটা উপরের দিকে, কানের অনিয়মিত গঠন এবং দুর্বল পেশী। এদের পেশি (সমূহ) দুর্বল হয় তাই শরীর নরম ও তুলতুলে হয়ে থাকে,বাচনভঙ্গি অনেকসময় অস্পষ্ট হয়ে থাকে এবং সঠিক শারীরিক বিকাশও ব্যাহত হয়।
আচরণগত জটিলতা
অস্থির চিত্ত, কোনকিছু ঠিকমত বুঝতে না পারা, কোনো বিষয়ে পুরোপুরি মনোযোগ না দেওয়া এবং স্বাভাবিক কোনো কিছু শিখতে কখনো কখনো অক্ষমতা প্রকাশ করা বা দীর্ঘ সময় নেওয়া।
রোগজনিত জটিলতা
গঠনগত এবং আচরণগত জটিলতার পাশাপাশি একজন ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত রোগীর শরীরে জন্মগতভাবে বা পরবর্তীতে নানারকম জটিলতা দেখা দেয়, যেমন - হৃদযন্ত্রের ব্যধি, কানে কম শোনা বা একেবারেই শুনতে না পাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টিশক্তি, রক্তশূন্যতা, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য, ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, ডিমেনশিয়া, হাইপোথাইরয়ডিজম, স্থূলতা, দেরিতে দাঁত উঠা এবং অনেকের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সে আলঝেইমার্সরোগ দেখা দেয়।
অধিক বয়সে অর্থাৎ ৩৫ বছরের পরে একজন নারী গর্ভবতী হলে তার গর্ভজাত সন্তান ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শুধু তাই নয়, একজন পুরুষের বয়স ৪০ এর বেশি হলে তার ঔরসজাত সন্তানের এই এই সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় পাঁচগুণ বেশি থাকে।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত একজন ব্যক্তির জীবনধারণ একজন স্বাভাবিক ব্যক্তির তুলনায় বেশ কষ্টকর এবং নানারকম শারীরিক চ্যালেঞ্জকে সাথে নিয়ে বাঁচতে হয়। ১৯৬০ সালের দিকে এই ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের গড় আয়ু ছিল ১০ বছর। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে ২০০৭ সালের দিকে এসে আক্রান্তদের আয়ুষ্কাল গড়ে প্রায় ৪৭ বছর। ন্যাশনাল ডাউন সিনড্রোম সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বেশকিছু বিষয় রয়েছে যা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তদের আয়ুস্কালের উপর প্রভাব ফেলে থাকে।
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত যেসকল নবজাতকের ওজন ১,৫০০ গ্রামের নীচে হয় তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জন্মের ২৮ দিনের মধ্যেই মারা যায়।
জন্মগতভাবে হৃদপিন্ডের ত্রুটি নিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম থাকে।
ডাউন সিনড্রোম কোনো রোগ নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও একে নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের কুসংস্কার, অপশিক্ষা। এই বিষয়টি তৃতীয় বিশ্বে যেমন জটিল আকারে বিদ্যমান, পাশ্চাত্যেও খুব একটা ভালো সংস্কারমুক্তি ঘটেনি এই ধারণা থেকে। তবে বর্তমানে ডাউন সিনড্রোম নিয়ে সঠিক শিক্ষার বিস্তার বাড়ছে। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তরাও মূলধারায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিখ্যাত ব্রিটিশ মডেল এলি গোল্ডস্টেইন, জেরেমি ব্রিউওয়ারসহ আরো অনেকে এখন তাদের কর্মক্ষেত্রে অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব, যাদের প্রত্যেকেরই আছে ডাউন সিনড্রোম।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com