পুরান ঢাকার অনেক ইতিহাস কালের গলিত গর্ভে হারিয়ে গেলেও আজও সেখানকার অলি-গলিতে ছড়িয়ে আছে মুঘল আমলের স্মৃতি বিজড়িত বহু ঐতিহ্য। সে খাবার-দাবারেই হোক, ব্যবসা-বাণিজ্যেই হোক কিংবা দালান কোঠার খসে পড়া পলেস্তারাতেই হোক পুরান ঢাকা এখনো তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বকীয় রূপ নিয়ে টিকে আছে। ওই ঘিঞ্জি গলিগুলোতে এমন কিছু আছে, যা মূল ঢাকায় নেই। হয়তো সে কারণেই সুযোগ পেলে লোকজন ঢুঁ মারে পুরান ঢাকায়। এখানকার যেসব ঐতিহ্য এখনো সগৌরবে টিকে আছে তার মধ্যে খাবার এবং রন্ধনশৈলির স্বকীয়তা অন্যতম। আর খাবারের মধ্যে যেটি এক নামে প্রসিদ্ধ সেটি হলো এখানকার বিরিয়ানি।
যাঁরা ভোজনরসিক তাঁরা পুরান ঢাকায় এলেই খোঁজেন বিরিয়ানির দোকান। এখানে অন্তত পাঁচটি নামকরা বিরিয়ানির দোকান মিলবে। আয়তনে খুব একটা বড় নয় এ দোকানগুলো।আকারে নয়, প্রকারে বড়এ নীতির ওপরই এরা টিকে আছে অনেক বছর ধরে।
হাজীর বিরিয়ানি
সবাই একে একনামে চেনে। এই বিরিয়ানি সম্ভবত শুধু পুরান ঢাকার নয়, গোটা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরিয়ানি। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালের দিকে। বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় হাজী পরিবার টিকিয়ে রেখেছে দোকানটি। মাঝখানে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, এক ধরনের যুগান্তরের মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব ও অবস্থান ধরে রেখেছে এটি। দোকানটি পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে অবস্থিত। বর্তমানে যিনি দোকানটির স্বত্বাধিকারী, তিনি এর প্রতিষ্ঠাতার নাতি। এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হাজী মুহাম্মদ হোসেন।
বিশেষত্ব:
১. সরিষা তেলের ব্যবহার
২. শুধুমাত্র খাসির মাংসের ব্যবহার
৩. কাঁঠাল পাতার ঠোঙায় করে পার্সেল করা হয়
নান্নার মোরগ পোলাও
হাজীর বিরিয়ানির পরপর, কখনো বা একসঙ্গে যে নামটি উঠে আসে, তা হলোনান্না। নান্নার দোকানটি পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়িতে। বিরিয়ানি নয়, এখানকার মোরগ পোলাও বিখ্যাত। যদিও খাসির কাচ্চি, বিরিয়ানি, রেজালা সবই পাওয়া যায় এখানে, তবু মোরগপোলাও কে আজও টপকে যেতে পারেনি অন্য কোনো আইটেম।
বিশেষত্ব:
১. পোলাওয়ের সঙ্গে দেওয়া মুখরোচক মসলার মিশ্রণ
২. সুস্বাদু ঝোল
ঝুনুর মোরগ পোলাও
এ দোকানের দেখা মিলবে নারিন্দায়। নুর মোহাম্মদ এ ব্যবসা শুরু করেন। তার মেয়ে ঝুনুর নামে দোকানটির নামকরণ করা হয়। ঝুনুর দোকানটি যাত্রা শুরু করে ১৯৭০ সালে, স্বাধীনতার আগের বছর।
পুরান ঢাকায় যাঁদের কমবেশি যাতায়াত আছে, তাঁরা অনেকেই ঝুনুর মোরগ পোলাওয়ের ভক্ত। সঙ্গে ডেজার্ট হিসেবে এদের কাশ্মীরি ফিরনিটাও অনেকজন প্রিয়।
বিশেষত্ব:
১. দেশি মুরগির ব্যবহার
২. মাটির চুলায় রান্না হয়
৩. কম তেলে রান্না
হানিফের বিরিয়ানি
নাজিরাবাজারের এই দোকানটি হাজীর বিরিয়ানির একেবারে উল্টোপাশেই অবস্থিত। স্বাদে ও মানে টিকে থাকার জন্য হানিফের বিরিয়ানি প্রতিদিনই অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। এই দোকানটি যাত্রা শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, ১৯৭৫ সালে।
বিশেষত্ব:
১. প্রধান আকর্ষণ কাচ্চি বিরিয়ানি
২. হাজীর বিরিয়ানির প্রতিদ্বন্দ্বী
মামুনের বিরিয়ানি
পুরান ঢাকার ৮৩ নাজিমুদ্দীন রোডে অবস্থিত এই বিরিয়ানি হাউসটির মূল শাখা। দ্বিতীয় শাখা নাজিরাবাজার মোড়ে খোলার পর থেকে এর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। শুরুর দিকে শুধু গরুর বিরিয়ানি বিক্রি করা হতো এখানে। তবে এখন পদ সংখ্যা বেড়ে পাঁচ ছাড়িয়েছে। গরুর পাশাপাশি খাসি এবং মোরগও স্থান করে নিয়েছে এখানকার খাদ্যতালিকাতে। শুধু বিরিয়ানি বা মাংসই নয়, খাবার পর মিষ্টি মুখ করার জন্য এখানে অতি সুলভমূল্যে পাওয়া যাবে কাপ ফিরনিও।
বিশেষত্ব:
১. মধ্যরাত অবধি খোলা থাকে
২. পদের বৈচিত্র্য রয়েছে।
অনেকের কাছে পুরান ঢাকার এ দোকানগুলো নেহাত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।