Loading...

বালুচরী - যে শাড়ি গল্প বলে!

| Updated: January 28, 2022 20:43:30


বালুচরী - যে শাড়ি গল্প বলে!

শাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর আকর্ষণ আজন্ম। ভালবেসেই যেকোনো শাড়িই গায়ে তোলে তারা। তার মধ্যে কিছু শাড়ি আবার থাকে তাদের শৌখিনতা জুড়ে। আবার সেই শাড়ি যদি গল্প-গাঁথা শুনিয়ে যায়, তবে তা একেবারে লুফে নেবার মতন শাড়ি। হালের জনপ্রিয় বালুচরী শাড়ি হলো তেমনি একটি গল্পে মোড়া শাড়ি।

১৭০২ সাল। বাংলার নাজিমের সাথে দ্বন্দ বাঁধিয়ে ভাগীরথীর তীরে মকসুদাবাদে ঢাকা হতে পাত্তারি গুটিয়ে চলে এলেন সম্রাট আরঙ্গজেবের দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান। তার নামে জায়গার নাম হয়ে গেল মুর্শিদাবাদ।
রাজাদের যেন সব কিছুতেই নিজস্বতা থাকে, ছিল তাদের পোশাক তৈরির বিশেষ কারিগর। এদেরও সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং থাকবার জন্য গঙ্গার তীরে একটি বালুকাময় গ্রাম দিয়ে দিলেন । বালু থেকে এলাকার নাম হল বালুচর। কারো কারো মতে, এই জায়গাটির নামই জিয়াগঞ্জ।

নবাব তার বেগমদের পরার জন্য নতুন শাড়ি তৈরির আদেশ দিলেন সেই তাঁতিদের। তাঁতিরা রেশমের সুতোয় যে নতুন শাড়ি বুনল, তার নামই হল বালুচরী।

নবাবের বেগমদের জন্য যে শাড়ি বোনা হল, তা কিন্তু গল্প বলত। কিসের আবার? নবাবের শৌর্যবীর্যের। ঢাল-তলোয়ার-হাতি-ঘোড়া-যোদ্ধা, হুঁকো পানের দৃশ্য, নানা অঙ্গভঙ্গিতে অন্দরমহলের রঙ্গবতী নারী। রেশমের সুতোয় ফুটে উঠতে থাকল এসব ছবি। এই হল ঢাকার তাঁতিদের নয়া আবিষ্কার বালুচরীর শুরু। বালুচরের এই তাঁতীরাই বংশানুক্রমে বুনতে লাগল বালুচরী।

একবার দারুণ বন্যায় গঙ্গার স্রোতে তলিয়ে গেল তাদের গ্রাম। মলভূমের রাজারা তাদের আশ্রয় দিল। বিষ্ণুপুরে স্থাপিত হল তাদের নতুন নিবাস। বিষ্ণুপুর শিল্পে বেশ সমৃদ্ধ। এখানের সব মন্দিরে আছে পোড়া মাটির অপূর্ব সব কারুকাজ। রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ সব মন্দিরের দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ। এই সকল কারুকাজ তাঁতিদের আকৃষ্ট করল খুব। ফলে শাড়ির নকশায় আসল আমূল পরিবর্তন। শাড়িতে শোভা পেতে লাগল কৃষ্ণ, রাম লক্ষ্মণ সীতা, অর্জুন-দ্রৌপদীসহ নানা পৌরাণিক চরিত্র। বণিকদের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল বালুচরী সিল্ক।

তবে একসময় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কালের গহ্বরে হারাতে থাকল এর জৌলুস। বালুচরী ফেরাতে এগিয়ে আসেন ঠাকুর পরিবারের উত্তরসূরী সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি নতুন করে অনুসন্ধান চালিয়ে ফিরিয়ে আনলেন মহাভারতীয় নক্সা!

১৯৬৩ থেকে শুরু হয় এর নতুন বয়ন। এরপরে বিষ্ণুপুরে একের পর এক গড়ে ওঠে বালুচরী শাড়ি হাউজ। তারকাঁটার সীমা পেরিয়ে বাংলাদেশেও সমান জনপ্রিয়তা ছড়িয়েছে বালুচরী। এ দেশের মেয়েরা আপন করে নিয়েছে এই পৌরাণিক গল্প বলা এই রাজসিক শাড়িকে।

হাল আমলে বিভিন্ন কায়দায় এই বালুচরী শাড়ির আরো বাণিজ্যিক প্রস্তুতকরণ হচ্ছে, দামটাও এসেছে হাতের মুঠোয়। বর্তমানে বালুচরী শাড়ি জয় করে নিয়েছে নিত্যনতুন ফ্যাশনে নিজের স্থান। এখন তারকা থেকে শুরু করে নববধূর স্যুটকেস- বালুচরী শাড়ি শোভা পাচ্ছে গৌরবের সাথে।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

susmi9897@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic