Loading...
The Financial Express

বার্ড ফ্লু - সতর্ক হতে হবে এখনই 

| Updated: August 20, 2022 19:13:09


রয়টার্স ফাইল ছবি রয়টার্স ফাইল ছবি

যুক্তরাজ্যের উপকূলভাগ জুড়ে রয়েছে সাগরের পাখির বাসা। অলঙ্কারে হিরে-মতি যেভাবে বসানো থাকে সেভাবেই এসব নীড় গড়ে উঠেছে সাগর উপকূলে। পাথর ও শিলাময় সৈকত হয়ে উঠেছে পাখির অভয়ারণ্য। এমনকি কোনো কোনো প্রজাতির পাখির দুনিয়াজুড়ে যত সদস্য রয়েছে তাদের  ৯০ শতাংশকেই যুক্তরাজ্যের উপকূলের বাসাগুলোতে পাওয়া যাবে।  এছাড়া সাগরের জলদস্যু হিসেবে পরিচিত  শিকারি পাখি গ্রেট স্কুয়াস। এ পাখি পরিবারের ৬০ শতাংশকেই দেখা যাবে যুক্তরাজ্যের উপকূলে। অন্যদিকে নর্দার্ন গানেটের ৭০ শতাংশই রয়েছে এ ভূখণ্ডে।

পাখিদের এই শান্তির নীড় এবারে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এর আগে কখনোই এমন হুমকির মোকাবেলা করেনি এসব পাখি। এ  হুমকির নাম - বার্ড ফ্লু। হ্যাঁ, বার্ড ফ্লুর একটি কঠোর প্রজাতিই পক্ষিকুলের জন্য বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। বার্ড ফ্লুর বিস্তার ঘটে পরিযায়ী বা ভুলভাবে কথিত অতিথি পাখির মধ্য দিয়ে। এ রোগের প্রকোপ বাড়ে মৌসুমের তুলনামূলক শীতের সময়ে। হাঁস-মুরগির খামার বা বাড়ির উঠোনে চড়ে বেড়ানো পোষা পাখির মধ্যে এ রোগ সেসময় দ্রুত ছড়াতে থাকে। কিন্তু  গরমের পারদ চড়লে, তাপমাত্রা বাড়লে এ রোগের প্রকোপ কমে। 

চলতি বছরে বার্ড ফ্লুর এ কাহিনি ভিন্ন রূপ নিয়েছে। মারাত্মক সংক্রামক পক্ষী-ব্যাধি তুলনামূলকভাবে উষ্ণ মৌসুমেও থাবা বিস্তার করেছে। সাধারণভাবে এ পক্ষী-ব্যাধিকে এইচ৫এন১ বলা হয়। সংক্ষেপে এ রোগকে এইচএআই’ বলারও চল আছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাবে কেবল বুনো পাখি নয় পোষা পাখিরাও মরেছে। 

এবারে বিজ্ঞানীরা সতর্ক চোখে পর্যবেক্ষণ করতে এবং মাথা ঘামাতে শুরু করেছেন। হঠাৎ করে এ ভাইরাসের স্বভাব বা আচরণ এমন করে বদলে গেল কেন? পাশাপাশি বার্ড ফ্লু’র ভাইরাসের ওপর শ্যেন দৃষ্টি রাখার আহ্বানও জানাচ্ছেন তারা। মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে এ আহ্বান জানানো হচ্ছে। পোষা পাখি বা খামারের অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের পাখির বেলায় এ পক্ষী-ব্যাধি সহজে বশ  মানানো যায়। বুনো পাখির ক্ষেত্রে কাজটা তত সহজ নয়। যুক্তরাজ্যের পাখির জগতে যদি বার্ড ফ্লু মহামারির চেহারা ধারণ করে, পোষা বা গৃহপালিত প্রাণীর জগতেও আগ্রাসন চালাতে পারে  তবে লোকমুখে চলতি কথা ধার করে বলা যায়- মানুষের জন্য খবর আছে। 

যুক্তরাজ্যে এখন বার্ড ফ্লু’র যে প্রজাতির প্রকোপ দেখা যাচ্ছে সে প্রজাতি এখনো পর্যন্ত মানুষের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেনি। চলতি বছরে যুক্তরাজ্যে মাত্র একজন মানুষ বার্ড ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তারপরও ভাইরাসবিদদের চিন্তার অন্ত নেই। আজ হুমকি হয়নি বলে আগামীকাল হবে না- তাকি কেউ নিশ্চয়তা দিয়ে বলবে পারবেন? এ ভাইরাসের ভবিষ্যৎ প্রজাতির সক্ষমতা বাড়তে পারে, তারা মানুষের মধ্যে মহামারি ঘটানোর শক্তি অর্জন করতে পারে বলে আশঙ্কায় আছেন বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক বিভাগ বলছে, দেশটিতে চলতি বছর বার্ড ফ্লু’র প্রকোপ সবচেয়ে বেশিদিন ছিল। শুধু তাই না, একই কাণ্ড ঘটেছে ইউরোপের বাদবাকি দেশগুলোতেও। আগস্টে দেওয়া এ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৩৫৪টি পৃথক পৃথক স্থানে ৬৩ প্রজাতির বুনো পাখি এ রোগের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি  এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ডিম পাড়া মুরগি, মুরগি ছানা ও টার্কি। 

নজিরবিহীন এমন প্রকোপের ফলে টনক নড়ে ব্রিটিশ সরকারের। দ্রুত ১৮ লাখ পাউন্ড স্টারলিং ব্যয়ে এ রোগ ঠেকানোর চেষ্টা করতে থাকে। সরকারের এ প্রয়াসে যুক্ত হয়েছিলেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রোজলিন ইন্সটিটিউটের অণু-ভাইরাসবিদ পল ডিগার্ড। তিনি বলেন, উপকূলীয় পক্ষী নিবাসগুলোতে এ রোগের প্রকোপ হঠাৎ করে বাড়লো কেন প্রথমেই তাই জানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। 

তিনি বলেন, সাগরতীরের পাখিরা নেহায়েতই ঘটনাক্রমে এমন ব্যাধির শিকার হয়েছে – এমনটা কী হতে পারে? কিংবা ভাইরাসের মৌলিক সক্ষমতা বদলে গেছে এবং আরও শক্তিশালী হয়েছে, আগে প্রাণী দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারতো না, কিন্তু এখন পারছে? এছাড়া,  চলতি বছর গ্রীষ্মকালেও কেন এ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা গেছে? এর কারণ কী এই যে এসব সাগরের পাখির দেহে সংক্রমণ ঘটাতে পারছে, নাকি এ ভাইরাস আবহাওয়াভেদে টিকে থাকার সক্ষমতা পেয়েছে? তিনি আরও বলেন, ভাইরাস নিয়ে সাধারণ বিষয়টি হলো, গরম আবহাওয়ায় এদের সক্ষমতা বেশ কমে যায়। তিনি মনে করেন,  এমনটি ঘটে থাকতে পারে,  উঁচু মাত্রার অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণসহ জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে হয়তো এ ভাইরাস নিজ সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে রোগ ছড়ায় পরিযায়ী হাঁস প্রজাতির পাখির মাধ্যমে। পরিযায়ী পাখির গতিপথের সাথে আন্তর্জাতিকভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ার মিল রয়েছে। পরিযায়ী পাখির গতিপথের ওপর তাই নজর রাখতে হয়। উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়াতেও চলতি বছর বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ ছাড়িয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন নতুন এলাকায় এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

ভাইরাসটি ছোট একটা পরিবর্তন ঘটাতে পারলে আরও ব্যাপক এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারবে। এটি হলো, প্রাণী দেহে সংক্রমণ ঘটাবে কিন্তু তাতে প্রাণীটি অসুস্থ হবে না। ফলে এ প্রাণী রোগের মাগনা ‘উবার’ বা বাহন হয়ে উঠবে। হাঁসের কোন কোন প্রজাতি এভাবে রোগের নীরব বাহক হয়ে উঠতে পারে। ভাইরাস যাত্রীগুলোকে হাজার হাজার মাইল জুড়ে বিলাতে বিলাতে যাবে। দেহজাত তরল পদার্থ বা গুয়ের মধ্য দিয়ে এসব ভাইরাসকে বিলানোর পালা চলবে। ভাইরাস নিয়ে দলবদ্ধ গবেষণার সময় একটি জিনিস তাই দেখতে হবে, একই ভাইরাসের প্রতি পৃথক প্রজাতি কেন পৃথকভাবে বিক্রিয়া করে। 

বুনো প্রজাতির পাখির মধ্যে ভাইরাসের বিস্তার কমাতে রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব বার্ডস এবারে যুক্তরাজ্যের শরতের শুটিং মৌসুমের আগে গেম বার্ড বা শিকারের জন্য ব্যবহৃত মোরগ জাতীয় পাখি ব্যাপকহারে প্রকৃতিতে মুক্তি দেওয়া বন্ধ রাখার আহ্বান জানায়।  এর উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আহ্বান জানায়। আগস্ট মাসের ১২ তারিখ থেকে এই মৌসুম শুরু হয়েছে। তবে ক্রীড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত কোন কোন খামার পর্যাপ্ত পাখি যোগাড় করতে না পারার কারণে শিকার তৎপরতা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।  

মরসুম এগিয়ে যাক বা না যাক, শিকারের এ মৌসুম চালু থাকুক। জোরেশোরে এগিয়ে যাক কিংবা না যাক, জৈব নিরাপত্তা বা বায়োসিকিউরিটি কঠোর করতেই হবে। বাড়াতেই হবে নজরদারি। ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি, পোল্ট্রি শিল্প এবং মানব স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য  এটি চৌকস কৌশল হিসেবে গণ্য হবে। প্রতিবার পক্ষী-ব্যাধি দেখা দেওয়ার মানে হলো ভাইরাসের জন্য নতুন রাস্তা খুলে দেয়া।  আর আমরা মানুষ প্রতিবারই জুয়াই জিতে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়ছি। আরও উত্তম কিছু ঘটবে বলেও আশা করছি।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত অঞ্জনা আহুজার নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা (syed.musareza@gmail.com)]

Share if you like

Filter By Topic