বাদাম বৃত্তান্ত


শুভদীপ বিশ্বাস | Published: June 01, 2021 14:51:38 | Updated: June 01, 2021 21:07:02


ছবিঃ ইন্টারনেট

ফলের রাজ্যে একটি ফল আছে, যাকে চাইলে সব কাজের কাজী, বা আজকালকার ভাষায় ফুল প্যাকেজ জাতীয় শব্দ ব্যবহারে সম্বোধন করা যায়। পোলাও-মাংস হোক, পায়েস, কিংবা লাচ্ছির মতো পানীয়, এই বিশেষ ফলটি এমনই সার্বজনীন যে, যেকোনো খাবারের স্বাদ-সৌন্দর্য বাড়াতে একে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা চলে। খাবার তৈরির কথা বাদই দিলাম, চলন্ত ট্রেনের সিট কিংবা পার্কের বেঞ্চে বসে এই ফলটি এমনি এমনি কতবার খেয়েছেন, তার হিসেব আছে কি? হ্যাঁ, আমরা বাদাম নিয়েই কথা বলছি।

আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে বোধহয় সব মানুষেরই সবচেয়ে প্রিয় ফলের তালিকায় বাদামের স্থানটা সাধারণত বেশ ওপরের দিকেই থাকে (যদি না কারো বাদামে অ্যালার্জি থাকে)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশের একটা বেশ বড় অংকের মানুষই বাদাম বলতে স্রেফ চিনাবাদামই বুঝে থাকেন। অথচ চিনাবাদাম ছাড়াও আরও অনেক রকমের বাদাম রয়েছে, এবং সেগুলোও সমানভাবে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। আসুন, তেমনই কিছু বাদামের প্রকার আজ চিনে নেয়া যাক।

চিনাবাদাম (Peanuts)

নামে চিনাবাদাম হলেও, চিনাবাদাম কিন্তু আসলে চিনা-ও নয়, বাদাম-ও নয়। অর্থাৎ, চিনাবাদামের উৎপত্তি মোটেও চীনদেশে নয়, বরং দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকোর মতো অঞ্চল থেকেই এটি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। আবার, চিনাবাদাম সত্যিকার অর্থে বাদামগোত্রীয় ফলের মধ্যেও পড়ে না, এটি মূলত মটরজাতীয় শস্য বৈ আর কিছুই নয়।

চিনাবাদাম মূলত এশিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার উষ্ণ অঞ্চলে ভালো জন্মায়। অনেকেরই এই ভুল ধারণা আছে যে, চিনাবাদাম মাটির উপর ফলে। চিনাবাদামের ফুল মাটির উপরে ফুটলেও ফল মাটির নিচেই জন্মায়। খোসাসহ চিনাবাদাম তুলে আনার পর একে পরিষ্কার করে ধুয়ে রোদে শুকোতে হয়, তারপর এটা খাবার উপযোগী হয়। চাইলে পরিষ্কার করার সময়ই এর খোসা ভেঙে ফেলা যায়, তবে আমাদের দেশে সাধারণত খোসাসহ চিনাবাদাম শুকনো বালুতে ভেজে তারপর খোসা ভেঙে খাওয়া হয়।

চিনাবাদামের যে কত ব্যবহার আছে, তা ঠিক করে বলা দুষ্কর। এমনি এমনি খোসা ভেঙে খাওয়া তো যায়ই, নানা রকম রান্নায়ও দেয়া যায়; বাণিজ্যিকভাবে চিনাবাদাম থেকে পিনাট বাটার তৈরি করা হয়, তাছাড়া নানারকম বেকারি প্রডাক্ট, যেমনঃ বিস্কুট, কেক ইত্যাদি তৈরিতেও চিনাবাদামের বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে যদি পিনাট বাটারের কথা বলতে হয়, আমেরিকানরা বছরে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার ব্যয় করে শুধু এর পেছনেই। তাছাড়া আমেরিকার ছটি শহরের নামেও পিনাটবা চিনাবাদামের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কাজেই আমেরিকাতে যে চিনাবাদাম প্রচুর জনপ্রিয় একটি ফল, এতে সন্দেহ নেই।

চিনাবাদাম খুবই পুষ্টিকর। এক কাপ চিনাবাদামে মোটমাট ৪০ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে, সাথে রয়েছে প্রায় ৭১ গ্রাম ফ্যাট, ৭ গ্রাম সুগার, ২৬ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ১০২৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ২৪৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম।

কাজুবাদাম (Cashew Nut)

বাদামের জগতের আরেকটি সুস্বাদু সদস্য হচ্ছে কাজুবাদাম। কাজুবাদাম প্রধানত শুষ্ক ও আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশগুলো, যেমনঃ ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, ভারত, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জন্মায়। চিনাবাদামের মতো কাজুবাদাম মাটির নিচে নয়, বরং উপরে ফলে। কাজুবাদাম সরাসরি বাদাম হিসেবে জন্মায় না, জন্মায় কাজুফলের একটি অংশ হিসেবে।

কাজুবাদাম সংগ্রহ করে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল, এবং কিছুটা বিপজ্জনকও বটে। কাজুর সবথেকে বাইরের খোসাটি একরকম কস্টিক বা দাহক তরল পদার্থে পূর্ণ থাকে। তরলটি সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে এলে ত্বক বেশ গুরুতরভাবে পুড়ে যেতে পারে। অবশ্য, এমন কোনো দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য অনেকগুলো উপায় অবলম্বন করা হয়। যেমন, একটি প্রক্রিয়ায় কাজুকে বরফশীতল করে তারপর খোসা থেকে আলাদা করে নেয়া হয়, অবশ্যই দস্তানার সহযোগিতায়। তাছাড়াও, কিছুক্ষেত্রে কাজুবাদামকে তেলের মধ্যে রোস্ট করলেও খোসা থেকে বাদামটি আলাদা হয়ে যায়।

কাজুবাদামের সবচেয়ে বড় পুষ্টিগুণ হচ্ছে এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এতে ভিটামিন বি৬, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, থিয়ামিন, রিবোফ্লাভিন ইত্যাদির সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রোটিন এবং ম্যাগনেশিয়ামও রয়েছে। পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ এবং সুস্বাদু এই বাদামটি কাঁচা তো খাওয়া যায়ই, উপরন্তু চীনা রসনায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিভিন্ন রকম সালাদ তৈরিতে এবং নানান চকলেটজাতীয় মিষ্টিতেও কাজুবাদাম ব্যবহার করা হয়।

কাঠবাদাম (Almonds)

কাঠবাদাম আমাদের অঞ্চলে খুব পরিচিত কোনো ফল নয়, কারণ কাঠবাদাম মূলত পশ্চিমা দেশগুলিতেই ভালো জন্মায়। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে গোটা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে কাঠবাদাম উৎপন্ন হয়। তাছাড়াও স্পেন এবং ইতালিতেও এটি বেশ বড় পরিসরে ফলে। গাছের শাখায় জন্মানো এই বাদাম গাছ থেকে পেড়ে আনার পর থেকেই খাওয়া যায়। তবে সপ্তাহদুয়েক শুকিয়ে তারপর খাওয়া গেলেই এর প্রকৃত স্বাদ এবং সর্বোচ্চ নির্যাস উপভোগ করা যাবে।

কাঠবাদামের সবচেয়ে উপকারী দিক হলো এর মধ্যে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন এবং ভিটামিন। উপকারী এই বাদামটি থেকে তেল, এমনকি ময়দা পর্যন্ত তৈরি করা হয়। তাছাড়া, বিভিন্ন রকম সালাদেও কাঠবাদাম কুঁচি ব্যবহার করা হয়। কাঠবাদাম থেকে ক্ষেত্রবিশেষে পিটুলিও তৈরি করা হয়ে থাকে।

হ্যাজেলনাট (Hazelnut)

উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার কিছু কিছু দেশ হচ্ছে হ্যাজেলনাটের প্রাপ্তিস্থান। এর গাছগুলো বেশ শক্ত প্রকৃতির হয় এবং মাঝারি আকৃতির ঝোপঝাড়ে জন্মায়। এই বিশেষ বাদামটি খাওয়ার উপযোগী হলে গাছ থেকে তুলে নেয়ার পরপরই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শুকোনোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়, নয়ত এর স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। খোসা না ছাড়ানো অবস্থায় শুকনো হ্যাজেলনাট অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, তবে একবার খোসা ছাড়ানো হয়ে গেলে কয়েক সপ্তাহের বেশি একে ফেলে রাখা উচিত নয়।

কাঠবাদামের মতোই এটিও মনোআনস্যাচুরেটেড তেলে পরিপূর্ণ। প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন আর খনিজও পাওয়া যায় এ বাদামে। চকলেট জাতীয় মিষ্টি খাদ্য, যেমন চকলেট ট্রাফল বা নিউটেলা তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়। কফির নির্যাস বৃদ্ধিতে এবং মাংসের বিভিন্ন রকম পদ রান্নায়ও হ্যাজেলনাটের ব্যবহার লক্ষণীয়।

পেস্তা বাদাম (Pistachio)

পেস্তা বাদাম মূলত আমেরিকার দক্ষিণে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা এবং নিউ মেক্সিকো রাজ্যে প্রচুর জন্মায়। এছাড়াও, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, ইতালি, সিরিয়া প্রভৃতি দেশেও এর ফলন হয়। পেস্তা বাদামের গাছ প্রধানত বেশ ছোট হয়, এবং এরা মরুভূমিসদৃশ বালুমাটির উপর জন্মায়।

পেস্তা বাদাম যদিও ঠিকমতো ধুয়ে নিলে কাঁচাই খাওয়া যায়, তবে অনেকেই এটি রোস্ট করার পর লবণাক্ত অবস্থায় খেতে পছন্দ করেন। কুলফি, আইসক্রিম, শরবত প্রভৃতি বিভিন্ন খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য এই সুস্বাদু বাদামটি উপাদান হিসেবে যোগ করা হয়। শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি সমভাবে পুষ্টিকরও বটে। এতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফাইবার এবং ভিটামিন রয়েছে। এর জনপ্রিয়তাও খুব একটা কম নয়। চীন এবং ইরানে পেস্তা বাদাম এতই জনপ্রিয় যে, উক্ত দেশগুলোতে বাদামটিকে যথাক্রমে আনন্দময় বাদাম এবং হাস্যমুখী বাদামনামে ডাকা হয়।

এখানেই শেষ নয়, পৃথিবীতে আরও অনেক অনেক প্রজাতির বাদাম রয়েছে। যেমন ধরুন, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বাদাম ওয়ালনাট, আজ থেকে দশ হাজার বছর আগেও এই বাদামটি খাওয়া হতো। সাথে আছে ব্রাজিল বাদাম, যা খাওয়ার উপযোগী হতেই বিশ থেকে ত্রিশ বছর সময় নেয়। ম্যাকাডেমিয়া বলে একপ্রকার বাদাম আছে, যা কষ্ট করে গাছ থেকে তুলতেও হয় না, খাওয়ার উপযোগী হলে সেগুলো এমনিতেই মাটিতে ঝরে পড়ে। এদের খোসাও খুব শক্ত, যা ভাঙতে ৩০০ পিএসআই চাপের প্রয়োজন পড়ে। ১৯১৯ সালে যে গাছটিকে টেক্সাসের রাজ্যবৃক্ষের খেতাব দেয়া হয়, সেই পেকানও একধরনের বাদাম। আরও আছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ চেস্টনাট। আচ্ছা, নারিকেল বা কোকোনাটও যে একপ্রকার বাদাম, সেটা জানতেন কি?

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like