বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকার প্রাণপণ প্রয়াস ব্রিটেনের ডাক বিভাগের


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: September 04, 2021 19:02:22 | Updated: September 05, 2021 10:55:05


শিল্পীর রঙ-তুলিতে ১৯৪৮ সালে লন্ডনের প্রধান ডাকঘরের অভ্যন্তরে ব্যস্ততার ছবি

সামাজিক প্রতিশ্রুতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটেনের ডাক বিভাগ। গোটা ব্রিটেনের গ্রামাঞ্চলে জুড়ে ছড়িয়ে আছে শাখা ডাকঘর। কখনো এ সব ডাকঘর গ্রামীণ মানুষের জন্য ব্যাংকের, কখনো বা দোকানের ভূমিকা নেয়। ক্রেতাদের নগদ অর্থ দেওয়ার বা চেকের মাধ্যমে দাম মেটানোর সুযোগ করে দেয়। বছর বছর এ সব ডাকঘরের জন্য সরকারি ভর্তুকি কমছে। এ ভাবেই ২০১২-১৩ সালে এ সব ডাকঘরকে ২১ কোটি পাউন্ড স্টারলিং দেওয়া হলেও পরে কমে তা এসে ঠেকেছে মাত্র পাঁচ কোটি পাউন্ড স্টারলিং-এ। বাজারে প্রতিযোগিতা মাধ্যমে ব্যবসা করে ডাকঘরগুলো যেন টিকে থাকতে পারে সে লক্ষ্য কমানো হচ্ছে ভর্তুকি।

ব্রিটেনের ডাক বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিক রিড বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ডাকঘরগুলোর টিকে থাকার ধারণা গ্রহণ করা হয় ২০১৭ সালে। এ অনুযায়ী আগামী বছরের মধ্যে ডাক বিভাগকে সরকারের ভর্তুকি দেওয়ার যে চল রয়েছে তার সমাপ্তি টানার কথা। রিড মনে করেন, সে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব । তিনি বলেন, এটি বলা অন্যায় হবে না যে, বিশ্বমারি এবং মামলা দুই মিলে এ লক্ষ্য পৌঁছানোকে বাস্তবে কঠিন করে তুলেছে।

তবে এ লক্ষ্য ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক ভাবে লাভবান হওয়া সত্যিই একটি চমকপ্রদ ধারণা। কিন্তু ডাক বিভাগের সামাজিক দায়-দায়িত্ব এবং সামাজিক উদ্দেশ্যের কথা বিচার করেই সরকার ভর্তুকি দেয়।

এ দিকে গোটা দুনিয়া জুড়েই ডাক বিভাগ অভিন্ন কিছু সমস্যায় হাবুডুবু খাচ্ছে। বিশ্ব নগদ লেনদেনহীন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে, ডিজিটাইজেশ তৎপরতা ও বিস্তার প্রতিদিনই বাড়ছে। একই সাথে ইন্টারনেট সর্বব্যাপী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সব মিলে, বিশ্বজুড়েই ডাক বিভাগ একক সমস্যায় পড়ছে।

সাব-পোস্টমাস্টারদের বিরুদ্ধে ডাকবিভাগ কর্তৃপক্ষের আনীত চুরি, জালিয়াতি ও ভুয়া হিসাবরেক্ষণের অভিযোগের বিরুদ্ধে উচচ আদালতে আপিল করে জয়লাভের পর (এপ্রিল, ২০২১) পরিবার ও বন্ধুসহ কয়েকজন সাব-পোস্টমাস্টারের উচ্ছাস

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ঘটেছে একটু অন্যরকম। ডাক বিতরণের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির অংশটি এ থেকে আলাদা করে নেওয়া হয়। জাপান এবং ইতালিসহ বেশির ভাগ দেশের ডাক বিভাগের এখন ডাক বিতরণ ব্যবস্থা বজায় রয়েছে। কখনো কখনো এর সাথে যুক্ত হয়েছে সঞ্চয় ব্যাংক বা বিমাও।

বৈশ্বিক ডাক সেবার সাবেক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী এলমার টোইমি এখন পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। তিনি মনে করেন, বিতরণের ভৌত ব্যবস্থাকে সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার যে পথ ব্রিটেন ধরেছে অন্যান্য দেশ তা অচিরেই অনুসরণ করবে। তিনি একে সঠিক ব্যবস্থা হিসেবেই উল্লেখ করতে চান। পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, এর মধ্য দিয়ে সামাজিক প্রয়োজনকে ডাক বিভাগ বা রাজনীতিবিদের হাত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

সুইডেন এবং জার্মানির মতো অনেক দেশই বিতরণ ব্যবস্থাকে তুলে দিয়েছে খুচরো বাণিজ্যিক সংস্থার হাতে। এ কাজের বিনিময়ে তাদেরকে সামান্য কিছু কমিশন দেওয়া হয়। সুইডেনের রাষ্ট্রীয় মুনাফা অর্জনকারী ডাক ব্যবস্থা পোস্টনর্ড-এর প্রধান নির্বাহী ম্যাথিয়াস ক্রমেল বলেন, দেশটির সব ডাকঘর ২০০১ সালেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর বদলে খুচরা দোকানের সাথে জুড়ে দেওয়া হয় পার্সেলের দোকান। তবে এ সব দোকান ডাকঘরের চেয়ে বেশি সময় ধরে খোলা থাকে আর তাতেই খুশি দেশটির মানুষ।

স্ব-সেবা বা সেলফ সার্ভিসের ব্যবস্থা থাকবে, ব্রিটেনের দুই থেকে তিন হাজার ডাকঘরে এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বসানোর নিয়ে ভাবছেন রিড। এমন কাজ আগে করেছে কানাডা। তবে ব্রিটেনেও একই ব্যবস্থা চালু হলে তাতে চাকরি হারাবে অনেকেই- তাও স্বীকার করেন রিড।

গত ডিসেম্বরে রয়েল মেইলের সাথে ব্রিটেনের ডাক দফতর একটি অ-একচোটিয়া বা নন-এক্সক্লুসিভ চুক্তি করে। এর দৌলতে পার্সেল বিতরণের ব্যবসায় জড়িত অন্যান্য সংস্থার সাথে কাজের পথ খুলে যায়। ব্রিটেনে অ্যামাজনের ২০০ দোকান এবং দোকান সংখ্যার দিকে এরচেয়ে একটু বড় (আন্তর্জাতিক পার্সেল বহনকারী সংস্থা ) ডিপিডির সাথেও কাজ করছে রয়েল মেইল। তবে পার্সেল বিতরণ কাজটি ব্রিটেনে খুবই প্রতিযোগিতামূলক। আর এ চুক্তির বলে ব্রিটেনের মালামাল বিতরণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় সংস্থা রয়েল মেইলের জন্যও অন্যান্য জায়গায় পার্সেলের কাজ করার পথ খোলে।

রয়েল মেইল গোষ্ঠীর সাবেক নির্বাহী নিক পেন্ডলেনটন বলেন, এই অ-একচোটিয়া চুক্তির ফলে ব্রিটেনের ডাক বিভাগের রাজস্ব আয় বাড়বে বলে মনে হয় না।

কেবলমাত্র আদান-প্রদানের ব্যবস্থার সাথে আরো কিছু সেবা তৎপরতা যোগ করলেই ব্রিটেনের ডাক বিভাগের বিকাশ ঘটবে বলেও মনে করেন না বেকার। নেওয়ার কাজের সঙ্গে খরচ জড়িত সে কথাও তুলে ধরেন তিনি। গাড়ি এসে কোনো কিছু নেওয়ার আগে তাকে নিরাপদে রাখার জন্য কর্মী নিয়োগ দিতে হবে এতে কিছু টাকা ব্যয় হয়। তিনি বলেন, সবাই এ ব্যবসা করার চেষ্টা করছে ফলে লাভ কমছে।

এ ছাড়া, ডাক বিভাগ পুরোদস্তুর অর্থ ধার দেওয়ার ব্যবসায় না নেমে কেবল ব্যাংকের খুচরো কাজের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করলে মুনাফা হবে খুবই কম। অন্যদিকে আইনি ঝামেলা পোহাতে হবে বলে তাও বাতিল করে রিড। ব্রিটেনের প্রধান ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট নিয়ে আলোচনাও এ কারণে সমস্যার মুখে পড়বে। এ সংক্রান্ত পুরানো চুক্তির মেয়াদ ২০২৩-এ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ চুক্তি অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ব্যাংকিং সেবার বিনিময়ে ডাক বিভাগ মোটা আয়ের সুযোগ পাবে। তবে সরকার যদি নগদ লেনদেনের আইনি অধিকার দেয়, তবে ডাক বিভাগের হাত শক্তিশালী হবে।

পৃথিবী গোল নয়, সমতল

নিজ ব্যবসাকে আবার চাঙ্গা করার সব উচ্চাভিলাষকে ডুবিয়ে দিয়েছে ডাক বিভাগরে কম্পিউটার কেলেঙ্কারি। ৫৫৫ সহকারী পোস্ট মাস্টারের হাইকোর্টে দায়ের করা মামলার জন্য ডাক বিভাগকে ব্যয় করতে হয় ১০ কোটি পাউন্ড স্টারলিং। শেষ পর্যন্ত পাঁচ কোটি সাড়ে ৭৭ লাখ পাউন্ড স্টারলিং দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে রাজি হয় ডাক বিভাগ।

ব্রিটেনের হাইকোর্টের বিচারক পিটার ফ্রেসার ২০১৯ সালে ডাক বিভাগের বিরুদ্ধে কঠোর রায় দেওয়ার পরই সহকারী পোস্টমাস্টারদের টাকা দিতে রাজি হয় ডাক বিভাগ। রায়ে পিটার বলেন, ২০১৭ সালের আগে সফটওয়্যারের গলদেই শাখা ডাকঘরগুলিতে টাকাপয়সার হিসাবে গড়মিল হয়েছে। কম্পিউটার ব্যবস্থায় গলদ আগে মেনে না নিয়ে বরং গা জুয়ারি করেছে ডাক বিভাগ। এ জন্য ডাক বিভাগ কর্তৃপক্ষের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, এটি ২১ শতকে পৃথিবীকে গোল নয়, সমতল মনে করার সমতুল্য একটি ঘটনা।

সফটওয়ার সংকটের খরচ সামাল দিতে গিয়ে ব্রিটেনের ডাক বিভাগের লাখ লাখ পাউন্ড স্টারলিং খসে যেতে পারে। এই সফটওয়্যার সংকটে নগদ অর্থ সংক্রান্ত ক্ষতিতে পড়েছেন কিন্তু মামলায় যাননি অনেক সহকারী পোস্টমাস্টার। তাদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার জন্য ডাক দফতর ১৫ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড পৃথক করে রেখেছে। এদিকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া হিসাবে জানা গেছে, এ খরচ ৩১ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড স্টারলিংয়ে যেয়ে ঠেকতে পারে।

ডাক সংক্রান্ত মন্ত্রী পল স্কুলি চলতি বছরের মার্চে বলেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কর্মসূচিকে সরকার মদদ দেবে কারণ ব্যবসার পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়।

হরাইজন মামলায় খালাস পেয়েছেন ৫৯ সহকারী পোস্টমাস্টার। তাদের প্রত্যেককে এক লাখ পাউন্ড স্টারলিং করে অন্তর্বর্তীকালীন অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ডাক কর্তৃপক্ষ। ৭৩৬ সহকারী পোস্টমাস্টারের অন্যতম আইনজীবী নেইল হাজওয়েল বলেন, সবচেয়ে গুরুতর মামলার জন্য এ অর্থের পরিমাণ পাঁচ লাখ পাউন্ড স্টারলিংয়ে গিয়ে ঠেকতে পারে। আর রিড বলেন, যা ঘটেছে তার জন্য ডাক বিভাগ গভীরভাবে দুঃখিত, ব্যথিত এবং উদ্বিগ্ন।

তবে মামলার ইতিকথা এখানেই শেষ নয়। ১২০জনের বেশি সহকারী পোস্টমাস্টার ডাক বিভাগের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করেন। এ সব মামলায় তাদেরকে শ্রমিক বা স্ব-উদ্যোগে কর্মসংস্থানকারী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার আবেদন জানানো হয়। ডাক বিভাগের কাছে তারা স্ব-বেতন ছুটি, পেনশন এবং অসুস্থকালীন ছুটি পাওয়ার অধিকারী বলে দাবি জানান।

সব মামলারই একটি খরচ আছে। ব্রিটেনের ডাক বিভাগের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খারাপ দিক ভাবতে গেলে বলতে হয়, সরকার যদিও বলছে ব্যবসার কাজে সমর্থন দিয়ে যাবে তারপরও ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ হয়ত ডাক বিভাগের তহবিলে শেষ পর্যন্ত আর থাকবে না।

তবে ব্রিটেনের সমাজে ডাক বিভাগের ভূমিকা নিয়ে অন্তহীন বিতর্ক চলছে। মুনাফার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হবে- এমন বিপরীতমুখী দুই স্রোতে আটকা পড়ে গেছে বিভাগটি।

এদিকে ইংগিত দিয়ে বেইস ব্যবসা বিদ্যালয়ের কাসু বলেন, টাকা আয়ের সব পন্থাই চলে গেছে রয়েল মেইলের কাছে তাই ডাক বিভাগরে ভূমিকা নতুন করে ঠিক করা উচিত।

তিনি বলেন, ডাক বিভাগকে গণ সেবা দেওয়ার সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং তাদের কাছ থেকে মুনাফার আশা আর করবো না? নাকি ডাক বিভাগকে কেবল মুনাফা অর্জনকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হবে? কিন্তু এই দুইয়ের, জনমানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং মুনাফা অর্জন, মাঝামাঝি কোথাও নিজের স্থান করে নিতে চেষ্টা করছে ডাক বিভাগ। তবে সে লক্ষ্যে পৌঁছানো বাস্তবিকই খুবই কঠিন হবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমসের নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like