স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের যাত্রা ছিল কঠিন। একাত্তরে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যুদ্ধ-ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। সীমিত সম্পদ নিয়েও বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধির হার একটি আকর্ষনীয় স্তরে পৌঁছেছে। মাথাপিছু আয়ও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বিশ্বের সেরাদের মধ্যে একটি। ১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশটি খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চলেছে। উপর্যুপরি বাংলাদেশ প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আগত ১০ লক্ষ শরণার্থী জনগোষ্ঠির বোঝা কাঁধে নিতে বাধ্য হয়েছে।
রবিবার আইসিসি বাংলাদেশের ভার্চুয়ালী অনুষ্ঠিত বার্ষিক কাউন্সিলে নির্বাহী বোর্ডের প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে আইসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান উপরোক্ত তথ্য উল্লেখ করেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।
বিশ্বব্যাপী কোভিড -১৯ উদ্বেগজনক বৃদ্ধি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সঙ্কটই সৃষ্টি করেনি, লক্ষ লক্ষ প্রাণহানি ঘটিয়েছে। ফলশ্রুতিতে অনেক দেশে মন্দা দেখা দিয়েছে। আইসিসিবি সভাপতি উল্লেখ করেন এটি মহিলা, তরুন, দরিদ্র, অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত ব্যাক্তি এবং যোগাযোগ-নিবিড় খাতে কাজ করা লোকদের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয় এবং সম্পদের বৈষম্যের কারণে সকলেই দেশটির চিত্তাকর্ষক প্রবৃদ্ধি এবং বিকাশ থেকে সমানভাবে উপকৃত হয়নি। আর একটি চ্যালেঞ্জ হ'ল অর্থনৈতিক কার্যক্রম ঢাকা এবং চট্রগ্রামের মত বড় শহরে কেন্দ্রীভূত, যার ফলে গ্রাম-শহরের বিশাল বিভাজন এবং নগর দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হ'ল দেশটি কীভাবে নিশ্চিত করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিকাশের ফল অর্থনৈতিক পিরামিডের তলদেশের লোকদের কাছে পৌঁছাবে, আইসিসিবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সাপ্রতিক এক গবেষণার বরাদ দিয়ে নির্বাহী বোর্ডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে কোভিড -১৯ মহামারীতে বাংলাদেশে ৯৬ শতাংশ মাইক্রো, ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তা (এমএসএমই) তাদের আয় হারিয়েছে। দেশের ৮২শতাংশ এমএসএমই "জাতীয় ছুটির দিনগুলিতে" ব্যবসায়িকভাবে মাঝারি রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং গড়ে ৬৭ শতাংশ ভোক্তা কমেছে। তবে, উপ-অঞ্চলের বেশিরভাগ অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশ মহামারীকে ভালভাবে মোকাবেলা করেছে এবং যেহেতু রপ্তানী আয় বেড়েছে তাই দেশটির ক্রম বর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।
২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতে করোনার নতুন ধরনের মহামারী ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে এবং উদ্বেগজনক সংক্রমণ এবং মৃত্যু ঘটিয়েছে। ভারতীয় এই ভাইরাস বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছে, যুক্তরাজ্যেও ছড়িয়েছে।
দুর্ভাগ্যক্রমে, ভ্যাকসিন উৎ্পাদনকারী দেশগুলি অন্য দেশে ভ্যাকসিন উৎ্পাদন করতে নারাজ। আইসিসি প্যারিস জি-৭ দেশগুলিকে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলিতে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করার জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। জি-৭ নেতারা বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশগুলিতে কয়েক শত মিলিয়ন ডোজ কোভিড -১৯ ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্বের ৭.৯ বিলিয়ন মানুষের বিপরীতে, ভ্যাকসিনের এই সংখ্যা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
কোভিড-১৯ মহামারীটি বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোতে স্কুলসমূহ বিভিন্ন মাত্রায় বন্ধ ছিল। এশিয়া অঞ্চলের এক চতুর্থাংশের স্কুলগুলি ২০০-৩০০ দিনের জন্য এবং অন্য এক পঞ্চমাংশের স্কুলগুলো এক বছর বা তারও বেশি সময় বন্ধ ছিল এবং আছে। কেবলমাত্র কয়েকটি মুখ্য অর্থনীতি বিদ্যালয়গুলি অবিচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চলমান রাখতে বেশিরভাগ অর্থনীতিতে দূরবর্তী শিক্ষার কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীরই কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ নেই। এই সীমাবদ্ধতার কারনে বাড়ীতে থাকাকালীন তাদের শেখার সুযোগ কমে গেছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই ক্ষতি ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা এবং উপার্জনকে যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। একটি এষ্টিমেট অনুসারে স্কুল বন্ধের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে তা গড়ে ১৮০ মার্কিন ডলার বা প্রত্যাশিত বার্ষিক উপার্জন ২.৪ শতাংশ হ্রাস করবে। উন্নয়নশীল এশিয়াতে ভবিষ্যত এই ক্ষতির বর্তমান মূল্য আনুমানিক ১.২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে যা এ অঞ্চলের ২০২০ সালের জিডিপির ৫.৪ শতাংশের সমতুল্য।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াাদী কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলির সমাধান বাংলাদেশের কোভিড -১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে পারে। সংস্কারের অগ্রাধিকারগুলির মধ্যে রয়েছে রপ্তানী বহুমুখীকরণ, আর্থিক খাতকে আরও গভীর করা, নগরায়ণের উন্নতি করা এবং জন প্রশাসনকে শক্তিশালী করা। অবকাঠামোগত ব্যবধানগুলি মোকাবেলা করার ফলে বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং এ অঞ্চল এবং শহরগুলিতে সুযোগের বৈষম্য হ্রাস পাবে।
ব্যাংক আরও পর্যবেক্ষণ করেছে যে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দুর্বলতার সমাধান করলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় অর্থনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারবে। সবুজ বিকাশের দিকে অগ্রসর হলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উন্নয়নের ফলাফল স্থায়ী হবে। সঠিক নীতি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দা থেকে পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে।
আইসিসি বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের উপরোক্ত পর্যবেক্ষণগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।