দেশের মানুষ কেমন আছে, তা অভিজাত শ্রেণি বা অভিজাত এলাকার শৌখিনতা, বিলাসিতা বা রঙিন প্রচ্ছদ দেখে পরিমাপ করার উপায় নেই। বরং সাধারণ মানুষের প্রত্যাহিক জীবনাচরণ বলে দেয় এদেশের অধিকাংশ জনগণ কতটা সুখে বা দুঃখে আছে। সন্দেহ নেই বৈচিত্র্যে ঠাসা আমাদের সামাজিক অবস্থার চেহারার বিবর্ণতাকে করোনা পরিস্থিতি আরো মলিন করে দিয়েছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ধারণা অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধি মানেই উন্নয়ন ধরা হতো। আধুনিকালের অর্থনীতিবিদেরা এ ধারণাকে অনেকটা অগ্রাহ্য করেন। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, বরং জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়লেই উন্নয়ন হয়েছে বলে তারা মনে করেন। সাথে মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদারও নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
বিগত কয়েক দশকে আর্থ-সামাজিকভাবে আমাদের দেশে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার ভয়াল ছোবলে যেখানে বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রবৃদ্ধি ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ কমবেশী এগিয়ে চলেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ভবিষ্যতদ্বাণী (২০২০-২১) অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)'র প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংস্থাটির মতে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার কারণে সরকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সুসংহত করেছে, যার ফলস্বরূপ মহামারি থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার পেতে শুরু করেছে।
জীবনযাত্রার মান এখনো দরিদ্র
দৈনন্দিন নিত্যপণ্যের মূল্ বৃদ্ধি ও প্রত্যাহিক ব্যয়ের সাথে দৈনিক আয়ের অসামঞ্জস্য থাকায় জীবনযাত্রার মান কার্যত বাড়ছে না। ঘন ঘন দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং তা না কমা যেন এক অসুস্থ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ মানুষের প্রধান ভোগ্যপণ্য চাল, তেলের দাম গত বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমাজের এক শ্রেণি বাদে অভিভাবকহীন বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমানের নিশ্চয়তা নেই। আর তাই সমাজে বিত্ত-বৈষম্য দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে, যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অন্তরায়।
করোনা-পূর্ববর্তীকালে অন্তত শহরগুলোতে একরকম কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল। তাই মানুষজন প্রতিনিয়ত নগরমুখী ছিল। কিন্তু ঐ কর্মসংস্থান থেকে তারা যে আয় করছিল, তা তাদের মানসম্মত জীবনযাপনে সংগ্রাম করতে হচ্ছিল। আমাদের পরিবেশ ও নগরনীতি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সবকিছুই এর কারণ। নগরদরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয় মূলত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে। কিন্তু সেই সুযোগ খুবই সীমিত।
এডিবি এশিয়ার ৩০টি দেশের প্রবৃদ্ধির যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশ ভারত, চীন ও মালদ্বীপের পরে চতুর্থ অবস্থানে আছে। অন্যদিকে, এশীয়দের সুখ বা ভালো থাকার যে সূচক সংস্থাটি তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০টি দেশের মধ্যে ২৬তম।
প্রবৃদ্ধিতে আমরা এগিয়ে থাকলেও সুখের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে আছি। কোনো দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই দেশের মানুষ যে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে না, তার প্রমাণ এতে মেলে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকায় ভালো থাকার সূচকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে বলা হয় সামাজিক সম্প্রীতির দেশ। তবে প্রকৃত অর্থে কেন আমরা অসুখী, এর কারণ অনুসন্ধানে অর্থনীতির কাঠামোটি বিশ্লেষণ আবশ্যক।
দ্য ইকোনমিস্টের কাছে যে ১২৫টি দেশের তথ্য-উপাত্ত আছে, তাতে দেখা যায়, ৪৩টি দেশে মাথাপিছু জিডিপি ও সুখের সম্পর্ক বিপরীতমুখী। বাংলাদেশও তার অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের ধনবৈষম্যের সাধারণ চিত্র মেলে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসেবে। তাদের আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে, মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। বিপরীতে একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল।
সমাধানে টেকসই উন্নয়ন
আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশের সুরক্ষার কথা বাদ দিয়ে একটি সুন্দর আগামীর অস্তিত্ব অকল্পনীয়। সুপরিকল্পিত ও যথাযথ সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী সংরক্ষণ করে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, প্রকৃতপক্ষে তাই টেকসই উন্নয়ন।
টেকসই উন্নয়ন যেহেতু মানবকেন্দ্রিক, তাই একজন মানুষকে বিবেচনা করতে হবে তার মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় থেকে আমৃত্যু। প্রাচীনকাল থেকে জীবনকাল হিসাব করা হতো গর্ভকালকে ধরে। সুস্থ, সবল জাতি গঠন করতে হলে কোনো মায়ের গর্ভধারণের সময় থেকে বিবেচনা করতে হবে, তিনি পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না। পাশাপাশি শিশু বেড়ে ওঠার পর তার শিক্ষা নিয়ে অঙ্গীকারবদ্ধভাবে কাজ করা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
বাংলাদেশে জন্মলগ্নে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমশ বাড়ছে, যা বর্তমানে ৭১ বছর। গড় আয়ু বেড়ে মানুষের জীবন দীর্ঘায়িত হচ্ছে ঠিক, কিন্তু সমাজের একাংশের জন্য 'কোয়ালিটি লাইফ' বা মানসম্মত জীবন নিশ্চিত হলেও, বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও তা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) পরিচালিত জরিপমতে, কোভিড-১৯-এর ধাক্কায় সাধারণ মানুষের আয় কমে বেড়েছে বেকারত্ব। যাদের আয় কম, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। সংস্থাটির মতে, করোনার কারণে দেশের ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান।
২০১৫ সালে শেষ হওয়া সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি)'র অগ্রগতির ধারা আরো বেগবান করার অভিপ্রায়ে জাতিসংঘের সাধারন পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে গৃহীত হয় ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) । এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল পত্র (২০১০-২০২১) প্রণয়ন করেছে।
২০১৫ সালের বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি-পরবর্তী এজেন্ডা সেসব কাজগুলোকে একীভূত করে যেগুলো প্রকৃতপক্ষে আদর্শস্থানীয় এবং বাস্তব পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে। এর ফলাফল পাওয়া যাবে, যদি কাজগুলো বাস্তবায়িত হয় । তবে, সর্বপ্রকার অর্জন বা প্রাপ্তি নির্ভর করে জাতীয় ও বিশ্বজনীন কর্মকাণ্ডের উপর। কিন্তু প্রায়শই আমরা পরিবেশের অবনতি ও দুর্যোগের জন্য প্রকৃতিকে দায়ী করি।
কিং লিয়ারে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জানিয়েছিলেন, যখন ভাগ্য আমাদের প্রতি প্রসন্ন না হয়, প্রায়ই আমাদের আচরণের আতিশয্যে আমরা আমাদের দুর্যোগের জন্য দোষ চাপিয়ে দিই সূর্য, চন্দ্র এবং নক্ষত্রদের ওপর।
গুটিকয়েক মানুষের সুখের জন্য যে প্রবৃদ্ধি, তাতে অর্থনীতির পরিধি বিস্তৃত হলেও প্রকৃতপক্ষে কাজ হারানো, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, বিদেশফেরত শ্রমিক, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী আর প্রান্তিক কৃষকের দুঃখ ঘোচাতে পারে না। সেজন্যই আমরা সমৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছি কাঙ্ক্ষিত সুখ লাভে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর গৌরবমাখা ক্ষণে সুখ ও সমৃদ্ধির মধ্যকার দ্বন্দ্বের অবসান অন্তত শুরু হোক।
মিনহাজুর রহমান শিহাব বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বনবিদ্যা অনুষদে অধ্যয়নরত। rahmanshihab06@gmail.com
