১লা মার্চ ২০২২ জাতীয় বিমা দিবস। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে যে খাতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কিন্তু আলোচনায় তেমন একটা আসে না তার মধ্যে বিমা খাত একটি।
জনগণ কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিমা প্রিমিয়াম গ্রহণের মাধ্যমে এটি একদিকে যেমন তাদের ঝুঁকি নিরসনে ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে এই প্রিমিয়ামগুলো বিভিন্ন লাভজনক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির বিকাশে সাহায্য করে। অথচ এ খাতটি এখনো বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি।
বিমা খাতের অধীনে দুই ধরনের বিমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে - জীবন বিমা এবং সাধারণ বিমা। জীবন বিমা সাধারণত অনিশ্চিত ভবিষ্যতে যে কোনো দুর্ঘটনায় পরিবারকে সুরক্ষা দিতে করা হয়। সাধারণ বিমা করা হয় সম্পত্তিকে বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ঘটনার হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান মাত্র ০.৬০ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ ভাগ মানুষ এখনো বিমা পলিসির বাইরে রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিমা ব্যবসা প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আর যেসব নিয়মনীতি গ্রহণের ফলে তারা বিমা ব্যবসাকে তাদের দেশের জনগণের কাছে পছন্দনীয় করে তুলতে পেরেছে, বাংলাদেশেও সেগুলোর সাথে মিল রেখে নিয়মনীতি প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
এ প্রসঙ্গে মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ফিন্যান্সিয়াল এসোসিয়েট মোঃ ফখরুদ্দিন বলেন, “বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় চাকরি প্রার্থীদের দক্ষতার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী যত বেশি দক্ষ হবে সে প্রতিষ্ঠানটি তত বেশি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে আরো বেশি এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। এক্ষেত্রে কোন পদে চাকরির জন্য কি ধরনের যোগ্যতা লাগবে সেটি আগে থেকে ঠিক করে সে অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে।”
বিমা ব্যবসায় স্বচ্ছতার বিষয়টিকেও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। “আমাদের দেশে বিমা প্রিমিয়ামগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিনিধিরা গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা প্রিমিয়ামগুলো কোম্পানিতে সময়মত জমা দেন না যার ফলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। এ সমস্যা কাটাতে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে প্রিমিয়াম পরিশোধ করার ব্যবস্থা করতে পারে,” বলেন তিনি।
এছাড়া গ্রাহকদের আয়ের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা সংবলিত বিমা পলিসি গ্রহণের সুযোগ থাকলে তা মানুষকে বিমা করতে আরো বেশি আগ্রহী করে তুলতে পারে মনে করেন মোঃ ফখরুদ্দিন।
বর্তমানে যে কোনো প্রতিষ্ঠানে লোকসংখ্যা ১০০ কিংবা এর বেশি হলে সেখানে গোষ্ঠী বিমা করতে জোর দেওয়া হয়েছে। আর এ পদক্ষেপ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে সেটি বিমা ব্যবসার বিকাশে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
বিমা ব্যবসাকে মানুষের কাছে আরো জনপ্রিয় করে তোলার উপায় সম্পর্কে ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এর অ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আ. য. ম. খাকসারুল হক বলেন, “যে কোনো ব্যবসাকে আরো জনপ্রিয় করতে মার্কেটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টেলিভিশন, রেডিও, ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদির মাধ্যমে বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের বিমা পলিসি সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে পারে এক্ষেত্রে। বিভিন্ন সেমিনারের স্পন্সর হিসেবেও এই প্রচারণা চালানো যেতে পারে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “বর্তমানে একচুরিয়াল সাইন্স নামক একটি ডিগ্রি রয়েছে যেখানে ইন্স্যুরেন্স বিষয়ে বিশদভাবে পড়ানো হয়। বাংলাদেশে না থাকলেও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, এবং অস্ট্রেলিয়ার মত উন্নত দেশগুলোতে ডিগ্রিটি প্রদান করা হয়। তাই ইন্স্যুরেন্স খাতে যারা কাজ করতে চায় তারা এ ডিগ্রিটি অর্জনের উপর জোর দিতে পারে।”
প্রায়ই দেখা যায় গ্রাহকরা বিমা দাবি আদায়ে ভোগান্তিতে পড়েন। তাই আইডিআরএ (বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ) কর্তৃক ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা গেলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে কমানো যাবে যা বিমা ব্যবসার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
tanjimhasan001@gmail.com
