Loading...

বাংলা প্রকাশনার ভিন্ন বিপণন মডেল

| Updated: July 19, 2021 18:33:38


কাজী আনোয়ার হোসেন (২০১৬ সালে তোলা ছবি) কাজী আনোয়ার হোসেন (২০১৬ সালে তোলা ছবি)

রহস্য-রোমাঞ্চকে বাংলা সাহিত্যের মূলধারার লেখক-সমালোচকরা ঠিক যেন আমলে নিতে চান না। বিশেষ করে সাহিত্য সমালোচক ও বিশেষজ্ঞরা বেশিরভাগই মনে করেন যে রহস্য সাহিত্য ঠিক সাহিত্য নয় বা উচ্চমানের সাহিত্য নয়, বড়জোর বটতলার সাহিত্য। অথচ বাংলা রহস্য সাহিত্যের শতবর্ষের পথ পরিক্রমা দেখলে বিস্মিত হতে হয় এই ভেবে যে বড় বড় লেখক-সাহিত্যিকরাও রহস্য গল্প ও উপন্যাস লিখতে পিছপা হননি।  ”একালের সেকালের গোয়েন্দা রহস্য” বইয়ের ভূমিকায়  লেখক-গবেষক প্রফুল্ল রায় যথার্থই বলেছেন: “বাংলাভাষায় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গোয়েন্দা গল্প লেখার জন্য কলম ধরেছেন। পরবর্তী প্রজন্মের প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, পাচকড়ি দে থেকে শরদিন্দু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সত্যজিৎ রায়, পরশুরাম, হেমেন্দ্রকুমার রায়, মনোজ বসু, নীহাররঞ্জনগুপ্ত, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নারায়ণ সান্যাল, সমরেশ বসু, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং আরো অনেক বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক এই জাতীয় কাহিনি নিয়ে জনচিত্ত জয় করেছেন। এঁদের পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সৈযদ মুস্তফা সিরাজরা সাহিত্যের এই শাখাটিকে সমৃদ্ধ করেছেন।”

ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় গোয়েন্দা বিভাগের দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় ‘দারোগার দপ্তর’ নামে  যে সিরিজ বই লিখেন, সেটাকেই বাংলা সাহিত্যের প্রথম গোয়েন্দা কাহিনী বিবেচনা করা হয়। এই সিরিজের প্রথম বই বনমালী দাসের হত্যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালে। ২০০-র কিছু বেশি গল্প-কাহিনী নিয়ে দারোগার দপ্তর’ সিরিজের বইগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে কালীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা বাঁকাউল্লাহর দপ্তর’ নামে এক ডজন গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে আরেকটি বই প্রকাশিত হয়। এভাবে গোয়েন্দা-পুলিশের বিভিন্ন উদঘাটিত রহস্য ঘিরেই বাংলা রহস্য সাহিত্য যাত্রা শুরু করে। এসব কাহিনীতে চুরি-ডাকাতি আর খুন-খারাবি প্রাধান্য পেতো।  পরবর্তীকালে এতে যোগ হয় দু:সাহসিক অভিযান। সাহিত্যের আসরে নামতে থাকে একের পর এক বেসরকারি গোয়েন্দা বা প্রাইভেট ডিটেকটিভ। রহস্য সাহিত্য বাণিজ্যিকভাবেও সাফল্য পেয়েছে। বলা যায়, বাণিজ্যিক লাভালাভের বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রকাশকরা এতে বিনিয়োগ করেছেন। লেখকরাও লিখেছেন, পাঠকের কাছে পৌঁছেছেন।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ (২০১৭ সালে) মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে প্রতিবেদন

কিছু মৌলিক লেখার পাশাপাশি বাঙালি লেখকরা বিদেশি কাহিনীর অনুবাদ এবং বিদেশি কাহিনী অবলম্বন করেছেন রহস্য কাহিনীর পাঠক তৃষ্ণা মেটাতে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র শার্লক হোমসের একাধিক গল্প অবলম্বনে বাংলায় গল্প লিখেছেন কেউ কেউ। পাশ্চাত্যের রহস্য সাহিত্যই বাংলাভাষায় রহস্য সাহিত্যকে পথ দেখিয়েছে যা অনেকদিন ধরেই সর্বজন স্বীকৃত।  

২.

অবশ্য বাংলা রহস্য সাহিত্য বলতে গোয়েন্দা কাহিনী প্রাধান্য পেলেও দু:সাহসিক অভিযান আর খুন-খারাবী-ডাকাতির মিশ্রণ রয়েছে প্রবল। কিন্তু দেশের বাইরে গুপ্তচরগিরির কোনো কিছু ছিল অনুপস্থিত। ১৯৬৬ সালে এই এর অবসান ঘটান কাজী আনোয়ার হোসেন। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক বিশ্বের গুপ্তচরগিরিভিত্তিক রহস্য কাহিনী নিয়ে আসেন তিনি। সৃষ্টি করেন বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্পাই থ্রিলার  ও স্পাই বা গুপ্তচরচরিত্র মাসুদ রানার।

১৯৬৪ সালে কিশোরদের জন্য কুয়াশা নামে রহস্যোপন্যাসের মাধ্যমে একাধারে লেখালিখি ও প্রকাশনা জগতে নামেন। তবে কুয়াশার দুটো বই পড়ে বন্ধু মাহবুব আমিন তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন ইয়ান ফ্লেমিং-য়ের জেমস বন্ড সিরিজের ডক্টর নো। সেটি পড়ার পর স্তম্ভিত হয়ে যান আনোয়ার। উপলব্ধি করেন, বিশ্ব রহস্যরোমঞ্চ সাহিত্য থেকে কতোশত মাইল দূর পড়ে রয়েছে বাংলা রহস্যসাহিত্য! ঠিক করেন যে এরকম একখানা বই লিখবেন। আরো কিছু বিদেশি বই পড়লেন। কাহিনী বিন্যাস করতে মোটরসাইকেলে চেপে দু:সাহসিকের মতোই ঘুরে এলেন চট্টগ্রাম, কাপ্তাই ও রাঙামাটি। প্রায় সাত মাস ধরে লিখলেন ধ্বংস পাহাড়। বাজারে আসার পর বিস্তুর হৈচৈ। বাংলায় স্পাই থ্রিলার! তাতে আবার যৌনতা! পাঠকদের বড় অংশ কিন্তু লুফে নিল। পাঠকের প্রতিক্রিয়া আর নিজের ভেতরের তাগিদের যৌথ ফসল হিসেবে ১০ মাস সময় নিয়ে লিখলেন ভারতনাট্যম (ভরতনাট্যম নয়)। একেবার চ্যালেঞ্জ করে বসলেন বাংলায় প্রচলিত সকল ধরণের রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনীকে। সমাজে আবারও হৈচৈ, নিন্দা-সমালোচনার ঝড় উঠল। কিন্তু পাঠকের কাছ থেকেও চাহিদা বেড়ে গেল। আর তাই একের পর এক লিখতে ও  প্রকাশ করতে শুরু করলেন মাসুদ রানা সিরিজের বই। সবই বিদেশি কাহিনী অবলম্বনে। পাঠককে আনন্দ দেয়াই হলো মুখ্য বিষয়।

৩.

একদিকে লেখা, অন্যদিকে বই প্রকাশ করা। একটা সৃজনশীল, আরেকটা বাণিজ্যিক কাজ। আশ্চর্যভাবে দুটোর এক সমন্বয় করলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। বাংলা পেপারব্যাক প্রকাশনার পথিকৃত হয়ে উঠলেন, তৈরি করলেন বই বিপণনের এক অনন্য মডেল। নগদ কারবারে বিশ্বাসী সেবা প্রকাশনীর বই সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকল -- রেল স্টেশনের বুক স্টলে, হকারের হাতে, ফুটপাথে পত্রিকা বিক্রেতার কাছে। পরিবেশক বা বিক্রেতারা নগদ টাকায় সেবার বই কিনে নিয়ে যেতেন বা তাদের কাছে ডাকযোগ বই পৌঁছে দেয়া হতো টাকা পাওয়ার পর। ডাক বিভাগের ভিপিপি (ভ্যালু পেইড পোস্ট) আর মানি অর্ডার ব্যবস্থাকে বই বিপণণে বেশ সাফল্যের সাথেই কাজে লাগিয়েছে সেবা প্রকাশনী। একটা সময়ে সেবা প্রকাশনীর বই বিপণনে মোবাইল ভ্যানগাড়ির ব্যবহার করা হয়েছিল। পিকআপের মতো গাড়ির গায়ে একপাশে বড় করে মাসুদ রানা, আরেক পাশে কুয়াশা লেখা থাকত। উত্তরবঙ্গে কিছুদিন এর মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালায় সেবা।

সেবা প্রকাশনীর কার্যালয়ের সম্মুখভাগ

গ্রাহক হলে পাঠকের ঠিকানায় ডাকযোগেও পৌঁছে যেতে থাকল সেবার বই। সেবা প্রকাশনী বাংলাদেশি পাঠকের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয় ’৭০-য়ের দশকেই। বাজারে তখন ভারতীয় বাংলা বইয়ের পাইরেটেড সংস্করণ ছড়িয়ে পড়েছে। সস্তায় মিলছে বলে পাঠকও কিনছে দেদারসে। ততোদিনে কিশোর ক্লাসিক, কিশোর থ্রিলার, অনুবাদ আর ওয়েস্টার্ন  সিরিজ যোগ হয়েছে সেবার তালিকায়। রহস্যপত্রিকা  জায়গা করে নিয়েছে পাঠকের কাছে। সেবার বৈচিত্র্যময় অথচ কমদামি প্রকাশনাগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার থেকে পাইরেটেড ভারতীয় বইগুলোকে হটিয়ে দেয়। পাঠক বিশেষত কিশোর-তরুণদের কাছে প্রজাপতি-প্রতীক সম্বলিত সেবার বই হয়ে ওঠে এক মহাআকর্ষণ। সেবার বই মানেই মাসুদ রানা, আর মাসুদ রানা পড়া মানেই ছেলে-পুলে গোল্লায় যাওয়া – অভিভাবকদের ভেতর এই ধারণা ভালভাবেই গেঁড়ে বসেছিল। তাতে রানার বা সেবার বইয়ের কাটতি কমেনি। শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রায় নিয়মিত সেবা প্রকাশনীর বইয়ের বিজ্ঞাপন ছাপা হতো ’৮০ দশকে। বন্ধ হয়ে যাওয়া দৈনিক বাংলাতেও বিজ্ঞাপন দিত সেবা প্রকাশনী। 

সেবার লেখকদের নিয়মিত রয়্যালিটি বা সন্মানী প্রদানের প্রথাও চালু হয় প্রায় শুরু থেকে। পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার ব্যবস্থাও হয়। একটি পেশাদারি প্রকাশনা সংস্থার যা করণীয়, তার সবই সেবা প্রকাশনীর চর্চায় চলে আসে। 

৪.

জীবনের সাতযুগ পূর্ণ করার পর আরো একটি বছর অতিবাহিত করলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আজ সোমবার (১৯ জুলাই, ২০২১) পদার্পণ করলেন ৮৬তম বছরে। এই এক জীবনে তাঁর অর্জনের পাল্লাটা নি:সন্দেহে অনেক ভারী । ত্রুটি-বিচ্যুতি ও নিন্দা-সমালোচনাও কম নেই। মানুষ হিসেবে সেটাইতো স্বাভাবিক। তবে বাংলা রহস্যসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃত ও পুরোধা পাঠকের প্রিয় কাজীদার জন্মদিনে সেসব না হয় উহ্যই থাক। বরং বাঙালি পাঠক তৈরি, সাহিত্যের এক সাবলীল ভাষা রীতি চালু করা, প্রকাশনা শিল্পে বিপণনের নতুন মডেল দাড় করানোর মতো সুকৃতিগুলোর জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাই আমাদের পক্ষ থেকে ।

asjadulk@gmail.com 

Share if you like

Filter By Topic