Loading...
The Financial Express

বাংলা পঞ্জিকাকথন

| Updated: April 15, 2022 14:20:44


বাংলা পঞ্জিকাকথন

ফিনফিনে কাগজের গোলাপি মলাটের একখানা বই। পাতা উল্টালেই ছাপার কালির গন্ধ। এতে আছে বছরের সমস্ত হিসেব। কী বার, চাঁদের কোন তিথি, কখন সূর্যোদয়, কখন অস্ত থেকে শুরু দিনে কখন শুভ যোগ কখন বা অশুভ, কবে কোন কাজটি মাঙ্গলিক কোনটি নয়, কোন দিনটি কোন রাশির জাতক - জাতিকার কপাল খুলে দেবে - সব কিছুর হদিস এই বই থেকেই।

যৎসামান্য মূল্যে পাতায় পাতায় রোজকার জ্যোতিষ হাতের মুঠোয় । আন্দাজ করা যাচ্ছে নিশ্চয়ই। কথা হচ্ছে পঞ্জিকা বা পাঁজি নিয়ে।

 

ছবি: ক্যানভাস ম্যাগাজিন

পহেলা বৈশাখ মানে নতুন বছরের আসা, সেই সাথে ঘরে তোলা একখানি নতুন পঞ্জিকা। সংস্কৃতি অনুশীলন করা বাঙালির সমাজ জীবনের যেকোনো কাজ চলে যায় পঞ্জিকার দর্শানো পথে। তা সে হোক ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়,পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত। তাই প্রথাবিশ্বাসী বাঙালির ঐখানি ছাড়া যে বছরই শুরু হয় না, আবার শেষও হয় না।

পঞ্জিকার উদ্ভব প্রাচীন জ্যোতিষ চর্চার উত্তরসূরি হিসেবে। ইংরেজিতে যদিও এর সমার্থক হিসেবে এলামন্যাক পাওয়া যায়, কিন্তু বাংলা পঞ্জিকা নেহাতই তার আক্ষরিক অনুবাদ নয়।

বার, তিথি, নক্ষত্র, যোগ ও করণ - এই পাঁচটি বিষয়কে উপজীব্য করে পাঁজি তৈরি হয় বলে, এর আরেকটি নাম পঞ্চাঙ্গ। বাংলা পঞ্জিকা সৌর ও চান্দ্র বর্ষের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। এখানে একটি বার মানে একটি সূর্যোদয় হতে পরবর্তী সূর্যোদয় তথা একটা পুরো দিন।

তিথি চন্দ্রকলায় আধারিত, দুটি পক্ষে বিভক্ত - শুক্ল ও কৃষ্ণ । শুক্লপক্ষের শেষে পূর্ণিমা আর কৃষ্ণপক্ষের শেষে অমাবস্যা। চন্দ্রের গতিপথ ধরে আছে ২৭টি নক্ষত্র, যতকক্ষণ চাঁদ একটি নক্ষত্রের নিকটে থাকে, ততকক্ষণ গোনা হয় নক্ষত্রের সময়। যোগ বলতে বোঝায় একটি নক্ষত্র কখন অন্য নক্ষত্রে মিলবে। একটি তিথির বিশেষ অংশ করণ , এভাবে মোট ১১টি করণ দেখতে পাওয়া যায়।

বঙ্গদেশে নব্য পঞ্জিকা গণনাপদ্ধতির প্রণেতা স্মার্ত রঘুনন্দন। এরপরে নদীয়া রাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে রামচন্দ্র বিদ্যানিধি। কিন্তু ওনাদের পাঁজিগুলি ছিল পুঁথিতে পুঁথিতে খাগের কলমে লেখা।

ছাপার অক্ষরে পঞ্জিকা বের হয় ১৮১৮ সালে শোভাবাজারের মুদ্রণ যন্ত্র হতে। ২০০ বছর ধরে পঞ্জিকা একটু একটু করে আজকের চেহারা পেয়েছে। তবে এই পুরানো পঞ্জিকাগুলির সবচেয়ে সুন্দর অংশ হচ্ছে উৎসব পার্বণ ভিত্তিক লিনোকাট বা কাঠখোদাইয়ের চিত্রাবলী , এখনো অনেক পঞ্জিকাতেই পাতায় পাতায় শোভমান আছে।

সূর্য সিদ্ধান্ত ও অদৃক সিদ্ধান্ত মেনে আলাদা পঞ্জিকা হয়, যার কোনোটি প্রথাগত, কোনোটি আধুনিক। পঞ্জিকার বৈজ্ঞানিক সংস্করণ সংযুক্ত হয় ১৯৫২ সালে, যাতে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। তিনিই সঠিক হিসেব করে বলেছেন ইংরেজি ১৪ এপ্রিল হবে পহেলা বৈশাখ, যেটি এখন বাংলাদেশে অনুসৃত।

পঞ্জিকায় তিথি, নক্ষত্র ও যোগের সময়কে দেখতে পাওয়া যায় কয়েকটি স্তম্ভে ভাগ করে। কোনো পঞ্জিকায় তা থাকে প্রাচীন দণ্ডের হিসেবে কিংবা থাকে আধুনিক ঘন্টার হিসেবে। যেমন যদি লেখা হয় দং৫৬/৩২/৩৩ তাহলে বোঝাবে ৫৬ দন্ড ৩২ পল ও ৩৩ বিপল। যদি লেখা হয় ঘ ৩/২৫/৪৫ তাহলে মানে দাঁড়াবে ৩ ঘটিকায় ২৫ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড। 

বলা হয়ে থাকে, পৌষ মাসে আকাশ বেশ পরিষ্কার থাকে, কোনো মেঘের ঝঞ্ঝাট নেই।  সেই সময়ের আকাশ লক্ষ্য করে বছরটি কেমন যাবে তার হিসেব করতে বসেন জ্যোতিষীরা। চাঁদ , নক্ষত্র ও রাশি মন্ডলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে গণনার ছক কাটা হয়। তাদের গণনা মতো পঞ্জিকা ছাপা হয়। ব্যবহার অনুযায়ী সংস্করণে রকমফের দেখা যায় - ডাইরেক্টরি , ফুল , হাফ ও পকেট ।

বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের বিশেষ বিশেষ পঞ্জিকা থাকে, যাতে তারা নিজস্ব পরবগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যেমন পুরান ঢাকার প্যারিদাস রোডের দি তাজ পাবলিশিং হাউস মুসলমান পাঠকদের সুবিধা চিন্তা করে প্রতিবছর  মোহম্মদী পঞ্জিকা প্রকাশ করে।

ঢাকার বাংলাবাজার থেকে প্রতিবছর প্রকাশিত হয় লোকনাথ পঞ্জিকা ও নবযুগ পঞ্জিকা। আর বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সংস্কার সমিতি বের করে সুদর্শন পঞ্জিকা। এই পঞ্জিকাগুলিতে সব ধর্ম সম্প্রদায়ের উৎসব পার্বণ থাকে। পাশাপাশি ভারতীয় পঞ্জিকার দেখাও মেলে যার মধ্যে বেশ বিখ্যাত বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা।

কিন্তু আজকের পঞ্জিকা শুধু আটকে নেই তিথি পরব নিয়ে, এতে এখন শোভা পায় প্রধান ধর্ম সম্প্রচার গুলির উৎসব, বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তি বর্গের জন্ম ও মৃত্যু দিবস, রাষ্ট্রীয় দিবসগুলি।  

পঞ্জিকায় দিন ক্ষনের পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরোয়া টোটকা, ভেষজ চিকিৎসা, কৃষি ব্যবস্থা, গবাদি পশুর যত্ন-আত্তি ও দৈনন্দিন জীবনে দরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের পাত্তা থাকে। তাই শহর থেকে গ্রাম, যেকোনো গৃহস্থের ঘরে আরো কোনো বই না থাক, পঞ্জিকা কিন্তু থাকবেই।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic