দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার বর্তমান কমিশন ২০২০ সালের মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের ভিত্তিতে প্রায় ১৪ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে ব্যাংক ও কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে বেশি পুঁজি সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছে। আগের কমিশন ২০১৯-২০অর্থবছরে বিভিন্ন কোম্পানিকেচার হাজার ২৫০ কোটি টাকা বন্ডের মাধ্যমে উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজার বিশ্লেষক এবং মধ্যস্থতাকারীগণ বন্ডবাজারের সক্ষমতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের কাছে কথা বলে জানা গেছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে এক ব্যাংকের বন্ড আরেক বন্ড কিনছে। সে ক্ষেত্রে দুর্বল মৌলভিত্তির প্রতিষ্ঠানের বন্ড কিনলে ঝুঁকির আশংকাও থাকে বলে বাজার বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন। তাই তাঁরা বন্ড বাজারে গতি আনতে জনসাধারণের মাধ্যমে এই ঋণপত্র হস্তান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এবং অর্থনীতিবিদ আহ্সান এইচ মনসুর দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে (এফই) বলেন, যতোদিন পর্যন্ত বন্ড সাধাণ বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে হাত বদলের বা লেনদেনে সুযোগ তৈরি না হবে, ততোদিন পর্যন্ত বন্ড বাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সাধিত হবে না।
তিনি আরো বলেন যে গুটিকয়েক নির্ধারিত গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের কাছে বন্ড হস্তান্তরের ধারা থেকে বের হতে না পারলে এ বাজারের সক্ষমতাও তৈরি হবে না।
উল্লেখ্য, বন্ড হলো ঋণপত্র। যারা এই ঋণপত্র কিনে নেয় বা এতে বিনিয়োগ করে তারা নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে মূল টাকা ফেরত পায় আর মেয়াদপূর্তির আগ পর্যন্ত নির্ধারিত হারে সুদআয় পেয়ে থাকে।
দেশে এখন পর্যন্ত স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত আছে দুটি বন্ড। একটি হলো ইসলামী ব্যাংক পারপেচুয়াল বন্ড, আরেকটি হলো আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড অরূপান্তরযোগ্য বন্ড।
এর আগে ২০১০ ও ২০১১ সালে যথাক্রমে এসিআই ও ব্র্যাক ব্যাংকের দুটি রূপান্তরযোগ্য বন্ড তালিকাভুক্ত হয়েছিল যেগুলো মেয়াদান্তে ইকুইটি বা মূলধনে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
তার মানে বন্ডের বিনিয়োগ বলতে বলে প্রাথমিক বাজারেই আটকে আছে এবং তা মূলত প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বা পূর্ব-নির্ধারিত গ্রাহকের কাছে বিক্রির মাধ্যমে। ফলে, বন্ডের খোলা বাজার এখনো তৈরি হয়নি।
বিএসইসির পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যকার সাত বছরে ১১০টি প্রতিষ্ঠান করপোরেট বন্ড ও ডিবেঞ্চার ছেড়েছে যা পূর্ব-নির্ধারিত বিনিয়োগকারী কিনে নিয়েছে। এর মধ্যে ৯৪টি প্রতিষ্ঠান বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছে ৩৭ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর ১৬টি প্রতিষ্ঠান ডিবেঞ্চারের মাধ্যমে তুলেছে এক হাজার ১১৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
আবার ২২১টি ট্রেজারি বিল ও বন্ড তালিকাভুক্ত হলেও এগুলোর কোনো লেনদেন হচ্ছে না। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত নিয়মিত নিলামে অংশ নিয়ে এসব সরকারি বিল ও বন্ড কেনাবেচা করে থাকে। এছাড়া ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও এখন প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে।
অবশ্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কিছু পারপেচুয়াল বা বেময়াদি বন্ড অনুমোদনের সময় স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
বিএসইসি বন্ডের প্রস্তাব অনুমোদনের সময় বলে দেয় কাদের কাছে এগুলো বিক্রি করা যাবে। এখন পর্যন্ত ব্যাংক, আর্থিক ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ আর্থিক সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাই বন্ড কিনে থাকেন। তবে তা কেবলই প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে।
ব্যবসায়িক মূলধন ভিত্তি মজবুত করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুঁজি সংগ্রহে যে সব প্রতিষ্ঠান বন্ড ছেড়েছে তার মধ্যে ব্যাংক সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিএসইসির তথ্যানুসারে ১৬টি ব্যাংক এক বা ততোধিকবার বন্ড ইস্যুও অনুমোদন পেয়েছে। ব্যাংকের বাইরে যেসব কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বন্ড ছাড়ার অনুমোদন পেয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো। এনজিও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সাজিদা ফাউনেডশন এবং ব্র্যাক।
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্ড অনুমোদন দেয়ার পেছনে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার যুক্তি হচ্ছে এতে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরশীলতা কমবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মন্দ ঋণের ঝুঁকিও কমবে। আর কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সংগ্রহে পুঁজিবাজারমুখী হবে।
বাজার পরিচালনা প্রতিষ্ঠানগুলো ও বাজার বিশ্লেষকগণও তেমনটাই মনে করেন। তবে বাজার পরিচালনা প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীদের কেউ কেউ জানান, দেশে বন্ডের চাহিদা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি।
মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠন বাংলাদেশে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েনের সভাপতি মো. সায়েদুর রহমান জানান, সরকারি গ্যারেন্টিসহ বন্ড ইস্যু করেছিল আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন। তারপরও নির্ধারিত সময়ে সেই বন্ডের সাবস্ক্রিবশন সম্পন্ন হয়নি সাধারণের মধ্যে আগ্রহের ঘাটতির কারণে।
তিনি বলেন, বন্ডকে সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে উপস্থাপনে অপর্যাপ্ত উদ্যোগ এবং প্রচারণার অপ্রতুলতার কারণে বন্ডের প্রতি তাদের আগ্রহ এখনো সে রকমভাবে তৈরী হয়নি।
বন্ড মার্কেটের সক্ষমতা নিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবায়েত উল ইসলাম বলেছেন, এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ বন্ড অনুমোদন দেয়া হয়েছে তার চেয়ে বাজারের সক্ষমতা অনেক বেশি। তিনি জানান, বন্ডে বেশি করে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে তাঁরা কাজ করছেন।
যেসব প্রতিষ্ঠান কর্পোরেট বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রিণ ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স, এমটিবি ক্যাপিটাল, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স এবং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ। ২০২০ সালের জুন থেকে অধ্যাবদী অনুমোদিত উল্লেখযোগ্য বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করেছে গ্রিণ ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স। সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্সও অনেক বন্ডের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করছে।
ট্রাস্টিরা জানায়, ব্যাংকগুলো একে অপরের বন্ড কেনার কারণে তাদের বন্ডের চাঁদা পেতে বা সাবস্ক্রিপশনে এখন পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। তবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বন্ডের সাবস্ক্রিপশন সম্পন্ন করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। কর্পোরেট বন্ডের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটিও উল্লেখ থাকে যে, এটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকৃত অর্থ এবং সুদ ফেরত পেতে ঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইসলাম জানান, কোন বিনিয়োগই ঝুঁকিমুক্ত নয়। তিনি বলেন, ঝুঁকি বা অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ইস্যুয়ার কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে বন্ডধারীর পাওনা পরিশোধের বিধান রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা পারপেচ্যুয়াল বন্ডে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে বন্ডের বার্ষিক সুদ বা কুপনের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ প্রভিশনিংয়ের বিধান আরোপ করেছে। সে ক্ষেত্রে ইস্যুয়ার যদি কোন বছর বন্ডের সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হয় তবে প্রভিশন একাউন্ট থেকে তা পরিশোধ করা হবে।
বন্ডে বৈচিত্র আনতে বিএসইসি বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বন্ডের অনুমোদন দিতে শুরু করেছে। এনজিও প্রতিষ্ঠান সাজিদা ফাউন্ডেশনকে প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি টাকার গ্রিনবন্ড ইস্যু করার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এই টাকা তুলে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশপাশি পরিবেশগত উন্নয়নে ব্যয় করবে।
আবার বেক্সিমকো তিন হাজার কোটি টাকার গ্রিন সুকুক বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এনজিও প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করার অনুমোদন পেয়েছে।
এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) মিউনিসিপাল বন্ড ছেড়ে গুলশানে একটি বিপণী বিতান নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম জানান, মার্কেটের নকশা তৈরিতে বিলম্ব হওয়ায় এখনো বন্ডের প্রসপেক্টাস তৈরি করতে পারেননি। সে কারণেই তাদের বন্ড ছাড়তে বিলম্ব হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী গুলশানের মার্কেট তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে কাওরান বাজারেও বন্ডের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ দিয়ে আরেকটি মার্কেট করার পরিকল্পনার কথা জানান মেয়র আতিক।
mufazzal.fe@gmail.com