Loading...

বঙ্গবন্ধুর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন

| Updated: August 15, 2021 16:23:00


বঙ্গবন্ধুর শৈশব, কৈশোর ও যৌবন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কতিপয় বিপথগামী সেনাকর্মকর্তার হাতে নিজ বাসভবনে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রনায়কদের মতো বঙ্গবন্ধুর বাসভবন সৈনিকদের কড়া নজরদারি ও পাহারার মধ্যে থাকতো না। তাই পাঁচ বছরের শিশু যেমন তাঁর বাসায় বিনা বাধায় প্রবেশ করতো, তেমনি ১৫ আগস্টের কালরাতে আততায়ীর দলও সহজেই প্রবেশ করেছিল। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তাঁর বিশাল বক্ষকে তারা বিদীর্ণ করেছিল, যে বুকে তিনি ধারণ করেছিলেন মাতৃভূমি বাংলাদেশ ও তার পতাকা।

মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধুরই নেতৃত্বে অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শনের মাধ্যমে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল; আর চূড়ান্ত পর্যায়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিল বিজয়। বাংলাদেশের জনগণের মতো বিশ্বের অন্য কোনো জাতি স্বাধীনতার জন্য কখনো এত স্বল্প সময়ে রক্তের মাপকাঠিতে এত উচ্চ মূল্য দেয়নি। যে মানুষটি তাঁর অদম্য সাহস, অকুতোভয় বীরত্ব, অটল তিতিক্ষা, অনন্য কর্মস্পৃহা ও সুগভীর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে জাতিকে বিজয় অর্জনে অনুপ্রাণিত করেছিলেন ও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

জনগণের স্বার্থরক্ষায় পরিপূর্ণ অঙ্গীকার ও দৃঢ়তাই ছিল সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবন ও নিয়তির উপর তাঁর বিস্ময়কর ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, যার শুরুটা ছিল স্কুলে, তিনি কারাদণ্ড, বন্দিদশা, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর জনগণের উপর অগাধ আস্থা কয়েক দশক জুড়ে মুক্তির সংগ্রামে তাঁকে টিকিয়ে রেখেছিল, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে এনে দিয়েছিল মহান বিজয়।

তিনি ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইসলাম ধর্ম-প্রচারক হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র.)-এর সফরসঙ্গী হিসেবে বঙ্গদেশে আগমনকারী দরবেশ শেখ আউয়াল-এর অষ্টম বংশধর। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার। মাতার নাম ছিল সায়েরা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মুজিব ছিলেন তৃতীয়, আর দুই ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। তাই বাবা-মা তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’। আর ভাইবোন ও গ্রামবাসীরা ডাকতো ‘মিয়া ভাই’।

মধুমতি নদী বিধৌত টুঙ্গিপাড়া গ্রামের মনোরম প্রকৃতি ও পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে বাঙালি জাতির ভবিষ্যতের ত্রাতা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিলেন। মাত্র দশ বছর বয়সে আশ্রিত মানুষকে নিজ গৃহের চাল প্রদানের মাধ্যমে দরিদ্রদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছিল। পিতার কাছে এ ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “তারা ক্ষুধার্ত, আর আমাদেরতো সবকিছু আছে”।

শৈশবকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রকৃতি-প্রেমিক এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারী। বাইগার নদীর তীরে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি বেড়ে উঠেছেন প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের মাঝে। গাছপালা ও পশুপাখির প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা। ধুলোবালি আর কাদামাটিতে মাখামাখি করে গ্রামের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করা আর নদীতে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করা ছিল নিত্যদিনের কাজ। গ্রামের গাছে গাছে বাবুই বা দোয়েল পাখির বাসা খুঁজে বেড়ানো কিংবা নদীতে মাছরাঙা পাখির মাছ ধরার কৌশল দেখা ছিল তাঁর অন্যতম শখ। তিনি ফুটবল, হকি ও ভলিবল খেলতে ভালোবাসতেন। আর খাবারের মধ্যে ভাত, মাছ ও শাক-সবজি বেশি পছন্দ করতেন।

তাঁর বয়স যখন সাত বছর তখন স্থানীয় গীমাডাঙ্গা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়। এর দু’বছর পর গোপালঞ্জ পাবলিক স্কুলে তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতার বদলিজনিত কারণে মাদারিপুরেও তিনি কিছুদিন লেখাপড়া করেন। কিন্তু বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, যে কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া (চাচাতো বোন) ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে মুজিবের বিয়ে হয়। এরপর ১৯৪২ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল হতে ম্যাট্রিক, কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে ইন্টারমিডিয়েট, এবং একই কলেজ হতে ১৯৪৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্কুলে থাকাকালেই শেখ মুজিবের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়। তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় ১৯৩৯ সালে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্কুলটি পরিদর্শনে আসেন। সে সময় ঐ অঞ্চলের অনুন্নত অবস্থার প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মুজিব ছাত্র বিক্ষোভ সংগঠিত করেন এবং স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। জনশ্রুতি আছে, বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য সে সময় তাঁকে ছয় দিনের জন্য কারাবরণও করতে হয়েছিল।

পরবর্তীতে ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। একই বছর মুজিব গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সচিব নিযুক্ত হওয়ার পাশাপাশি গোপালগঞ্জ ‘মুসলিম সেবক সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ কিশোর বয়স হতেই ছিল। ১৯৪২ সালে কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তির পর তিনি প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। সে সময় তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সংস্পর্শে আসেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অন্য নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু।

রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে তরুণ মুজিব (১৯৪৯)

কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় শেখ মুজিব দার্শনিক কার্ল মার্ক্স, নাট্যকার বার্নার্ড শ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন, যা তাঁর জীবন ও কর্মে প্রভাব ফেলেছে। ১৯৪২ সালে ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগদান করেন। একই বছর তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।

১৯৪৪ সালে মুজিব কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের সম্মেলনে যোগদান করেন এবং কোলকাতাস্থ ফরিদপুরবাসীদের সংগঠন ‘ফরিদপুর জেলা সমিতি-র সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে তিনি ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ তাঁকে ফরিদপুর জেলায় দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব প্রদান করে। ১৯৪৬-৪৭ সালে কোলকাতায় সংঘটিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রতিরোধে মুজিব অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৪৭-এর আগস্টে ভারতভাগের পর বছরের শেষদিকে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। পূর্ববঙ্গে এসে শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তারিখে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায়ও তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই বছর ২ মার্চ ভাষার প্রশ্নে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে মুজিব অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। ১১ মার্চ পরিষদের সাধারণ ধর্মঘট চলাকালে মুজিবকে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভরত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। এরপর জুলাই মাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রচারনা সভা করার সময় তাঁকে গোপালগঞ্জ হতে আবারও গ্রেফতার করা হয়।

১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি ও ধর্মঘটে সমর্থন প্রদান করায় মুজিবকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করায় ১৯ এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ  করা হয়। তিনি জেলে থাকা অবস্থায় একই বছরের ২৩ জুন নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। এর নির্বাচিত কমিটিতে মুজিব যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এখান থেকেই জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়।

. হেলাল উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব বাংলাদেশ কোয়ার্টারলি পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক। hahmed1960@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic