চলছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২২। ঘুরতে, বই কিনতে কিংবা খেতে এখানে আসছেন নানান রকম মানুষ। মেলায় প্রবেশের অনেকগুলো পথ আছে। সব পথেই রয়েছে মানুষের ভিড়। এর ভেতর রাজু ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ঢোকার রাস্তাটি ক্যাম্পাস বা এর আশপাশের অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন।
এই পথ ধরে মেলায় প্রবেশের সময় কানে ভেসে আসে অদ্ভুত এক সুর। বেহালায় কেউ একজন বাজিয়ে চলেছেন, সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহিদ স্মরণে/ আমার হৃদয় রেখে যেতে চায়, তাদের স্মৃতির চরণে।
এটি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের বিখ্যাত একটি গান। ফজল-এ-খোদার কথায় ও নিজের সুরে গেয়েছিলেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার।
শব্দের উৎস ধরে এগিয়ে আরেকটু কাছে ডানদিক বরাবর যেতেই দেখা মিললো পনিটেইল করে রাখা বাবরি চুল ও ঢোলা সাদা শার্ট-কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তির। ধনুকের মত আকৃতির ‘বাংলা বেহালা' হাতে সুরের ঝংকার তুলেছেন তিনি।
এই বেহালাবাদকের নাম সালাউদ্দিন। বিভিন্নজনকে বেহালার তালিমও দিয়ে থাকেন। তবে এই বেহালা নিজেদের বানানো বাংলা বেহালা, পাশ্চাত্যের ভায়োলিন নয়।
এই গানটি শেষ করে তিনি চলে গেলেন আরেকটি গানে। ষাট দশকের শেষ দিকে বশির আহমেদের গাওয়া ‘আপন পর’ সিনেমার বিখ্যাত গান- ‘যারে যাবি যদি যা।’
তিনি বাজাচ্ছিলেন তন্ময় হয়ে- পিঞ্জর খুলে দিয়েছি, যা কিছু বলার ছিলো ভুলে গিয়েছি/ যারে যাবি যদি যা।
আশেপাশে তখন উৎসাহী মানুষ ও সংবাদকর্মীদের ভিড়। কেউ সুর শুনছেন, কেউ সাথে সাথে গাইছেন; আবার কেউ কেউ বেশ উৎসাহ নিয়ে ভিডিও ধারণ করছেন।

সালাউদ্দিন বরাবর নিভৃতেই থাকা মানুষ। পাদপ্রদীপের আলোয় কখনো সেভাবে আসেননি। এখানেও প্রথমে নিবিড়ভাবে নিজের মত করে বাজিয়ে চলছিলেন। তবে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়লো, তারপর তার সাথে কথা বলতে, বাজনার ভিডিও ধারণ করতে ইতোমধ্যেই এসেছে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।
তবে এতসবের মাঝেও উৎসুক মানুষদের নানারকম প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন তিনি। জানা গেল তারা পুরান ঢাকার চানখাঁরপুলের মানুষ, তবে বর্তমানে থাকেন মিরপুরে। সেখানে নিজের বাড়িও আছে তার।
বেহালার সাথে তার ‘সংসার’ ৪০ বছরের। এটাই তার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান, সাধ ও সাধন। আলাদাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গুরু নেই তার। তার বাবা প্রয়াত মনু মিয়ার কাছেই বাদ্যের হাতেখড়ি। মনু মিয়া এই বাংলা-বেহালা বাজাতেন চমৎকার; লোকগান গাইতেন ভালো। একদম ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে সাথে বিভিন্ন মেলায়, হাটে-বাজারে গান-বাজনা করতেন তিনি। সেটা ষাট দশকের শেষদিক বা সত্তর দশকের শুরুর দিকের কথা।
ষাট-সত্তর দশকে ‘এতটুকু আশা’, ‘আবির্ভাব’, ‘নীল আকাশের নীচে’-র মত সিনেমায় অভিনয় করেছেন মনু মিয়া। ফোক যুবরাজ আবদুল আলীমের গানের সাথেও বাজাতেন তিনি। সে সময় রেডিও-টিভির বড় বড় শিল্পীদের সাথে পরিচয় ছিল তার।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক নারায়ণ ঘোষ মিতার সাথে বিশেষত খুব ভালো সম্পর্ক ছিল মনু মিয়ার। তার সিনেমাতেই মনু মিয়াকে বেশি দেখা গেছে। ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় আব্দুল জব্বারের গাওয়া কালজয়ী গান 'তুমি কি দেখেছ কভু'-তেও উপস্থিত জনতার মাঝে ছিলেন তিনি।
পিতার সাহচর্যে বাদ্যশিক্ষা খুব ভালোভাবেই সম্পন্ন হয় সালাউদ্দিনের। ১৯৮১ সালের দিক থেকে নিজে পরিপূর্ণভাবে শুরু করেন বাংলা-বেহালার সাথে তার সঙ্গীত-সংসার। এরপর নিজে বহু জায়গায় উপস্থাপন করেছেন নিজের বেহালা-প্রতিভা। বিশেষত, ঢাকার কেরানীগঞ্জে তাকে বেশি দেখা যেত। সেখানে রাস্তায় হেঁটে-ঘুরে বাজনা শোনাতেন মানুষকে। অনেক সময় ছোট ছোট বাচ্চারা গান শুনে পেছন পেছন আসতো। তাদের আবার বাজিয়ে শোনাতেন। গান শুনে উপস্থিত লোকজন যে পয়সা বা হাদিয়া দিয়ে যেত, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন।
তবে বইমেলায় তিনি এবারই প্রথম এলেন। আগে কখনো মেলা প্রাঙ্গনে বাজাননি।

প্রথমে ভেবেছিলেন নির্ঝঞ্ঝাট থেকে নিজের মত করে সুর তুলবেন বেহালায়। তবে ক্রমে তাকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ায় এখন নিয়মিতই মিডিয়ার সাথে কথা বলতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই তিনি আশপাশের মানুষের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। একাধিক মিডিয়ায় দিয়েছেন সাক্ষাৎকার। এতে বাদনের নিরবচ্ছিন্নতায় ব্যাঘাত ঘটলেও বইমেলা বা আশপাশের পরিবেশ ভালো লেগেছে বলে জানালেন। সম্ভব হলে সামনে এখানে আসবেন আবারো – এমনটাই জানালেন।
সেখানে উপস্থিত পথচারী বা শ্রোতাদের অনেকেও অনেকরকম প্রশ্ন করছেন তাকে। সেসবে কখনো-সখনো একটু ভ্রুঁ কুঁচকে ফেললেও উত্তর দিয়ে তাদের কৌতুহল মেটাচ্ছেন তিনি।
যেমন একজন শ্রোতার কাছ থেকে প্রশ্ন পেলেন, “আপনি কী কী গান বাজাতে পারেন?”
প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে সালাউদ্দিনের উত্তর, “সবই পারি। একজন প্রকৃত শিল্পী যা শুনছে বা শিখছে, তার সবই বাজাতে পারবে।”
তার সাথে ছিল ঝোলাভর্তি অনেকগুলো বাংলা-বেহালা। প্রতিটার দাম ২০০ টাকা। আর ৫০০ টাকা দামের ভালো মানের বেহালা আছে ২-৩ টি। যারা শিখতে চায় ও সাধনার মাধ্যমে চর্চা চালিয়ে যেতে চায়, এগুলো তাদের জন্য, জানালেন সালাউদ্দিন।

“এই বেহালাগুলো কিনলে কি যে কেউ বাজাতে পারবেন?”- উপস্থিত এক শ্রোতার এমন প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন বললেন, “আমরা যারা বাজাই, শিখে বাজাই। সেটাও এক-দুই দিন না, চল্লিশ বৎসর। যদি কেউ শিখতে পারেন, তাহলে যে কোনো সুর শুনলে সেটা এখানে তুলতে পারবেন। যারা সুর বোঝে তারা যেকোনো সুরই বাজাতে পারবে।”
তিনি আরো যোগ করলেন, “সব সুরই তো শিল্পীর মনে-মগজে ঘোরে। যারা ছোট বা শিশু বয়সে শিখতে শুরু করে, তারা অনেকটা নরম মাটির মতো। তাদের ভালোমতো গড়ে নেয়া যায়। আর এটা শুধু হাতে নিলাম আর বাজালাম, এমন জিনিস না।
“নিজের মন থেকে কেউ যদি চায়, চেষ্টা চালায় যায়; তাহলে সব সুরই ধরা দেবে তার কাছে। তখন নিজের পছন্দমত সুর তারা তুলে আনতে পারবেন এখানে। আর সুর তো কোনোটাই খারাপ না। সব সুরের জন্ম এক জায়গায়- শিল্পীর মনে।”
সালাউদ্দিনের কথায় বোঝা গেল তার কাছে সাধনার চেয়ে বড় আর কিছু নেই। তারপর আবার উৎসাহী মানুষ ও ক্যামেরার সামনে বাজাতে শুরু করলেন তার বাংলা-বেহালা। আর মন্ত্রমুগ্ধের মত মানুষ শুনতে থাকে তার বাদন।
বাতাসে আবারও প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো আবদুল জব্বারের সেই অমর গানের সুর- সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহিদ স্মরণে...
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com
